তোর ওই লাউগাছ থাকবে ভেবেছিস? মালি এসে একটানে উপড়ে ফেলে দেবে। খামোখা খাটছিস।
কথাটা সত্যিই। নিতাই দম ধরতে একটু জিরোয়। বলে, বিড়ি-টিড়ি কিছু আছে? দে না।
তা দেয় মংলু। লোকটা চলে যাচ্ছে। বিড়ি ধরিয়ে দিয়ে বলে, বিয়ে করলি বলে জায়গাটা গেল তোর। দিব্যি ছিলি।
ভৈরবী ছাড়া সাধনভজন হয় শুনেছিস?
মংলু সঠিক বিশ্বাস করে না নিতাইকে। আবার পুরোপুরি অবিশ্বাস করতেও ভয় পায়। ব্যাটার বাণে কাজ হয় না ঠিকই। আবার যদি এক-আধটা লেগে যায়। তাই সে নিতাইয়ের মুখের ওপর তেমন ঠাট্টা-ইয়ারকি করে না। তারও বালবাচ্চা আছে। মংলু বলে, সামন্তর বেটি আবার ভৈরবী হল কবে থেকে?
ভৈরবী কি পেট থেকে পড়ে রে ব্যাটা? বানিয়ে নিতে হয়।
কবে আর বানাবি বাপ? নিজেই জটা কেটে দাড়ি কামিয়ে ভদ্রলোক বনে গেলি!
নিতাই বিড়িতে লম্বা টান মারে। নিমীলিত চোখে লাউগাছটার দিকে চেয়ে থাকে অনেকক্ষণ। বলে, পটাশপুরে এক মহান্ত এসেছে। কপাল থেকে জ্যোতি বেরোয়। সেই জ্যোতিতে হোমের আগুন জ্বালে। বিদ্যেটা শিখে আসতে হবে।
তোরও তো অনেক বিদ্যে শুনি।
দুর! এখনও কত শেখার আছে।—বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, বউদিমণি তা হলে এখানে ক্ষেত করবে!
তাই তো বলল ভূঁইমালিকে।
ক্ষেত জ্বলে যাবে। মংলু অবাক হয়ে বলে, কী করে জানলি?
এখানে পঞ্চমুন্ডির আসন ছিল রে ব্যাটা! বহুত ইলেকট্রিসিটি জমে আছে এখানে। গাছ কি বাঁচে?
তবে লাউগাছটা বাঁচল কী করে?
সে আমি ছিলাম বলে। আমি না থাকলে ভূতেরা তিনধা নাচন নাচতে লাগবে। দেখিস, বলে দিলাম।
মংলু একটু হাসে। অনিশ্চয়তার হাসি।
নিতাই বিড়িটা শেষ করে অন্যদিকে চেয়ে বলে, বাবু জানে?
তা কে বলবে?
বাবু জানতে পারলে রাগ করবে। আমাকে বাবু বড় ভাল চোখে দেখে।
মংলু উদাস মুখে বলে, বাবু রাগ করলেই বা কী? মা যখন বলেছে তখন সেইটেই হাকিমের আইন।
বড়দিদির বিয়েটা পর্যন্ত থাকতে পারলে বেশ হত। বউদিমণি বলেছিল আমাকে ফাইফরমাশ খাটতে এলাহাবাদ নিয়ে যাবে। ভেবেছিলাম, এলাহাবাদ থেকে হিমালয়টা কাছে হয়, একবার ঘুরে আসব। অঘোরীবাবার চরণ দুখানাও দর্শন হয়ে যাবে।
অঘোরীবাবা কে রে?
নাম শুনিসনি? তিন হাজার বছর এক ঠাই বসে সাধনা করে যাচ্ছে। গায়ে পটপট করছে পোকা। জটা মাইলখানেক লম্বা।
বলিস কী?
শুধু কি তাই! সাপের মতো খোলস ছাড়েন একশো বছর পরপর। হিমালয়ে অঘোরীবাবার ঠিকানাটা আমাকে এক সাধু লিখে দিয়ে গিয়েছিল।
মংলু সান্ত্বনা দিয়ে বলে, তা যাবে এলাহাবাদ, তাতে কী?
মুখখানা বেজার করে নিতাই বলে, আর তো যেতে বলছে না।
বলবে, বিয়ের দেরি আছে। সেই ফাল্গুনে।
ফাল্গুনের আর দেরি কী?
এলাহাবাদটা কোনদিকে বল তো!
হিমালয়ের গোড়ায়। সেখানকার জলহাওয়া খুব ভাল শুনেছি। মেলা সাধু আসে।
মংলু ওঠে। বলে, ঘর ভাঙা হয়ে গেলে ডাকিস। বাঁশবাখারিগুলো বাগানের উত্তরদিকে চালার নীচে জমা করে যাস।
তোকে ভাবতে হবে না। যা।
লাউডগাটা ভূঁইমালি এসে উপড়ে ফেলবে। তবু নিতাই সেটাকে ফেলে যেতে পারছে না। আবার উঠে মাচানটা বাঁধতে লেগে যায়। মালিটা মহা খোঁচড় লোক। কিছু বলতে গেলেই খেকিয়ে ওঠে। লাউডগাটার কথা তাকে সাহস করে বলবে কি না ভেবে পায় না নিতাই। বিড়ির একটু তামাক জিভ দিয়ে থুঃ করে ফেলে নিতাই আপনমনে বলে, দূর খ্যাপা! দুনিয়াটাই তো তোর নিজের। এ জায়গা ও জায়গা বাছিস কেন? সব সমান। বাজারের বস্তিও যা, চাটুজ্জেবাড়ির বাগানও তা।
ঝোপড়া ভেঙে জিনিসপত্র চালার নীচে সরিয়ে রেখে নিতাই মস্ত বকুল গাছটার তলায় বসে জিবরাচ্ছিল। হঠাৎ মনে হল, যাওয়ার কথাটা বাবুকে জানানো দরকার।
যেই ভাবা সেই গিয়ে ভাবন-ঘরে উঁকি মারে নিতাই।
ইজিচেয়ারে বসে ইংরিজি একটা খবরের কাগজ কোলে নিয়ে পেনসিল দিয়ে কী যেন কাটাকুটি করছে বাবু। খবরের কাগজের পিছনে একটা সুন্দরমতো মেয়েছেলের ছবি।
বাবু!
উঁ!–শ্রীনাথ কাগজ নামিয়ে বলে, নিতাই নাকি?
আজ্ঞে। একটা কথা বলতে এলাম।
আমিও তোর কথাই ভাবছি। ভিতরে আয়।
নিতাই ভিতরে ঢুকে মেঝের ওপর বসে।
আমার তো ঝাটিপাটি ওঠাতে হল এখান থেকে।
কথাটা না বুঝে শ্রীনাথ বলে, কী বলছিস?
আজ্ঞে চলে যেতে হচ্ছে।
কোথায়?
বস্তিতে ঘর নিয়েছি।
সে কী! আমার যে তোকে ভীষণ দরকার। কাল থেকে প্রেসের চাকরিতে যাব। তুই রোজ আমার সঙ্গে গিয়ে সারাদিন থাকবি, আবার আমার সঙ্গেই ফিরে আসবি।
ঠিক এই সময়ে লাউগাছটার কথা মনে পড়ায় বড় হু-হু করে উঠল বুক। নিতাই ভ্যাক করে কেঁদে ফেলে।
কাঁদছিস কেন?
বউদিমণি তাড়িয়ে দিলেন যে!
তাড়ায় কেন?
বিয়ে করেছি বলে।
বিয়ে করেছিস? কই, বলিসনি তো!
আজ্ঞে লুকিয়ে-চুরিয়ে করেছি। বউদিমণির ভয়ে।
শ্রীনাথ বহুকাল বাদে একটু সত্যিকারের হাসি হাসল, বিয়ে করে বেশ করেছিস। আর একবারও তো করেছিলি। এবারকার বউটা কেমন?
খুব ভাল। অমন মেয়ে হয় না।
ভাল হলেই ভাল। কিন্তু বিয়ে করলি বলেই বউদি তাড়িয়ে দিচ্ছে, এ কেমন কথা?
আজ্ঞে সবাই বলছে বুড়ো বয়সে কচি মেয়ের সর্বনাশ করেছি।
বউটা খুব বাচ্চা নাকি?
বাচ্চা নয়, আঁটো মেয়ে।
তোর বয়স কত?
কত আর হবে! ঠিক বুঝতে পারছি না।
সে যা-ই হোক, কাল থেকে আমার সঙ্গে রোজ কলকাতায় টানা মারতে হবে, কথাটা মনে রাখিস। বরং আজই গিয়ে স্টেশন থেকে একটা মান্থলি করে আয়। টাকা দিচ্ছি।
সে যাব। কিন্তু বউদিকে কথাটা একটু বলে রাখবেন বাবু। নইলে যা চটে আছে আমার ওপর!
