বলেই পরমুহূর্তে আবার কী একটু ভেবে বলল, থাক এখন। বিকেলের দিকে ডেকে আনলেই হবে।
মংলু হাসিমুখে বলে, আজ্ঞে নিতাই জটা হেঁটে ফেলেছে। দাড়িও চেঁচেছে।
তৃষা কাঠমুখেই বলল, ও। আচ্ছা যা। সজলকে বলিস, যেন স্কুলে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যায়।
প্লাস পাওয়ারের চশমা চোখে পাত্রপক্ষকে দেওয়ার চিঠিটা মুসাবিদা করতে বসল তুষা। খুব বেশিকিছু লেখার নেই। তা হলেও অনেকটা সময় নিয়ে সে নির্ভুল করল চিঠিটাকে।
মা!
তৃষা তাকায়। দরজায় সেই মানুষটার ছায়া। সারাজীবনে যে একটি মাত্র মানুষকে ভালবাসতে পেরেছিল তৃষা। কিন্তু তার এই ছায়াকে সে কেন ভালবাসার চেয়েও ভয় পায় বেশি?
মা আর ছেলে মুখোমুখি তাকিয়ে থাকে। দুজনেই আজ যেন স্পষ্ট বুঝতে পারে, আমরা পরস্পরের শত্রু।
৬০. সাতসকালে কে যেন
সাতসকালে কে যেন ‘শ্রীনাথবাবু! শ্রীনাথবাবু!’ বলে ডাকাডাকি লাগিয়েছে। এ সময়টায় শ্রীনাথের ভারী একটা আমেজের ঘুম হয়। আবোঘুম আর আধো-জাগরণের মধ্যে সে ভারী একটা আয়েসি ব্যাপার। বিরক্ত হয়ে উঠে দরজা খুলে দেখে, প্রেসের আর এক প্রুফরিডার মানিক গুপ্ত। বহুকাল দেখা নেই।
কীরে? কী ব্যাপার? আয় ভিতরে এসে বোস।
জিভ কেটে মানিক বলে, বসব কী? স্বয়ং বদুবাবু বাইরে গাড়িতে বসে আছেন। ঘরদোর একটু সামলে নিন। আপনার খবর করতে এসেছেন।
বলিস কী? বদুবাবু!—বলে শ্রীনাথ ভারী ব্যস্ত হয়ে লোকজন ডাকাডাকি করতে লাগল।
হাঁকডাকে বৃন্দা আর নতুন একটা কাজের লোক দৌড়ে এসে ঘরদোর সারতে লাগে। শ্রীনাথ কোনওক্রমে মুখ ধুয়ে কাপড় পালটে নেয়। তারপর ফটকের বাইরে দাঁড় করানো পুরনো প্রকাণ্ড হাডসন গাড়িটার কাছে এগিয়ে যায়।
আজ্ঞে, আপনি আসবেন ভাবতেই পারিনি।
বদুবাবুর বয়স শ্রীনাথের মতোই হবে। ফর্সা, গোলগাল বনেদি চেহারা। বাবা কষ্ট করে কারবার তৈরি করেছিল। এরাও ব্যাবসা জানে। প্রেস ছাড়াও অন্যান্য কারবার আছে। প্রচুর পয়সা।
বদুবাবুর পরনে পাঞ্জাবি আর ধুতি। কাঁধে শাল। মুখটা ব্যক্তিত্বময়, গম্ভীর। একটু হেসে বলে, আপনি সেই যে অসুখের খবর দিলেন, তারপর আর দেখা নেই। বাবার আমলের লোক, কী হল কী হল ভাবতে ভাবতে চলে এলাম।
আসুন, আসুন, বড় ভাগ্য।
বদুবাবুর সঙ্গে মানিক আর ড্রাইভার ছাড়াও বাড়ির চাকর এসেছে। সে একটা মাঝারি ঝুড়ি নামাল সামনের সিট থেকে। ফল-টল আছে, অনুমান করে শ্রীনাথ।
ভাবন-ঘর অল্প সময়ের মধ্যে ফিটফাট হয়ে গেছে। এমনকী টেবিলে ফ্লাওয়ার-ভাস-এ টাটকা ফুলও হাজির।
বদুবাবু চেয়ারে বসে বললেন, কী হয়েছিল বলুন তো!
স্ট্রোক মতো।
এখন কেমন আছেন?
এখন ভালই।
চেহারা কিছু খারাপ দেখাচ্ছে না।
শ্রীনাথ একটু হেঁ হেঁ করল।
বদুবাবুর হাতে হীরের আংটি, মুক্তোর আংটি, পান্নার আংটি। গলায় সোনার চেনে গৃহবিগ্রহের লকেট। মৃদু একটু সুবাস ছড়াচ্ছে গা থেকে। শ্রীনাথ বিগলিত হৃদয়ে অবাক চোখে কেবল দেখল আর দেখল। স্বয়ং বদুবাবু তার বাড়িতে! বিশ্বাস হওয়ার কথা?
বদুবাবু বলে, শরীর যখন তেমন কিছু খারাপ নয় তখন কাল থেকে প্রেসে আসতে থাকুন না কেন! কাজটাজ তেমন কিছু করতে হবে না। সুপারভাইজ করবেন একটু।
ঘাড় চুলকে শ্রীনাথ বলে, শরীরের জন্য নয়। মনটাই কেমন হয়ে গেছে। দূরে যেতে ভয় ভয় করে।
বদুবাবু উদাস মুখে বলে, ভয় তো আমারও। বাবা মরে যাওয়ার পর থেকেই কেমন একটা মরণের ভয় এসে ধরেছে। কেবল ভয় পাই, এই বুঝি কে কোথায় মরে গেল, আর বুঝি তার সঙ্গে ইহজন্মে পরজন্মে আর দেখা হল না। মনটা খুব দুর্বল হয়ে আছে সেই থেকে। গত দু’দিন কেবল আপনার কথাই মনে হচ্ছে। শ্রীনাথবাবু বেঁচে আছেন তো! তাই আজ ছুটে এসেছি।
দেখি একটু ভেবে।
ভাববার কিছু নেই। আপনার এখনও পঞ্চাশ পেরোয়নি, বুড়োও হননি। এই বয়সে অত ঘাবড়াবার কী আছে? চলে আসুন, বাদবাকি যে কদিন বাঁচি সবাই মিলেমিশে থাকি।
শ্রীনাথ এ কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তৃষা খবর পেয়ে ভিতরবাড়ি থেকে প্রচুর খাবার চা পাঠিয়েছে। বদুবাবু বসে বসে অনেকটা খেল। চায়ে চুমুক দিতে বলল, এ জায়গাটা বেশ ভাল।
বদুবাবু উঠল। শ্রীনাথ গাড়িতে তুলে দিয়ে এল তাকে। তারপর ঘরে এসে ভাবতে বসল। এখান থেকে কলকাতা আগে হাতের নাগালে মনে হত। আজকাল মনে হয়, কলকাতা বুঝি সাত সমুদুরের পার। কী করে অতদূরে রোজ যাবে শ্রীনাথ?
বউদিমণি নোটিশ দিয়েছে, এ বাড়িতে আর থাকা চলবে না। নিতাই বাজারের দিকে বস্তিতে সস্তায় একখানা ঘর পেয়ে গেছে। তার নিজের এলেমে নয়। বউ পাঁচ বাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজ করবে। তার রোজগারেই এই ঘর নেওয়া।
আজ নিতাই সকালে উঠেই ঝোপড়াটা ভাঙছিল। একটু আগে তার তল্পিতল্পা মাথায় করে বউ বস্তিতে রওনা হয়ে গেছে। ফাঁকা নড়বড়ে ঘরখানা ভাঙতে তেমন কষ্ট নেই। তবে চালের ওপর একটা সতেজ লাউডগা। সেটার জন্যই যা কষ্ট। কুশি কুশি লাউ ফলেছে মেলা।
বাঁশের খুঁটিগুলোর গোড়া নড়বড়ে, বেড়ার বাঁধন পচে গেছে কবে। চালে খড় পচে গোবর। পোকামাকড় বিস্তর বাসা করেছিল। নিতাইয়ের সঙ্গে সেগুলোরও আশ্রয় গেল।
লাউডগা সমেত চালের খড়গুলো নামিয়ে নিতাই ঘাম মোছে। গাছটা যদি বাঁচে এই আশায় বাঁশ-বাখারি দিয়ে চটপট একটা মাচান খাড়া করতে লেগে যায় সে। মংলু এসে তাড়া দেয়, হল তো? একটু বাদেই ছুঁইমালি এসে এ জায়গা চৌরস করবে। হাত চালা।
দাঁড়া তো। মাচানটা বেঁধে দিই আগে।
