তোকে বস্তিতে যেতে হবে না। ঝোপড়াতেই থাক। আমি তোর বউদিকে বলে দিচ্ছি।
ঝোপড়া ভাঙা হয়ে গেছে। মালি সেখানে চাষ দেবে।
শ্রীনাথ অবাক হল। বলল, তুই না দাদার আমলের লোক!
আজ্ঞে। এই বাড়ি ঘর সব আমার চোখের ওপর হয়েছে।
শ্রীনাথ একটু চিন্তিত হয়। একটু ভেবে বলে, ঝোপড়া ভেঙেছিস তো কী আছে! ভাবন-ঘরের পিছনদিকে ছাড়া জমি আছে। চালাঘরে বিস্তর টিন আর খুঁটি আছে। একটা ঘর বেঁধে নিগে যা।
কিন্তু বউদি?
বউদিকে আমি বলছি।
তৃষার কথা কোনওদিন ওলটায় না। যা বলে তাই হয়। কিন্তু আজ যখন গিয়ে শ্রীনাথ তাকে বলল, খ্যাপা নিতাইটাকে আমার বড় দরকার। কাল থেকে রোজ আমার সঙ্গে কলকাতায় যাবে। তখন তৃষা না করল না।
রঘু স্যাকরা বসে ছিল তৃষার ঘরে। তাকে বিয়ের গয়নার বরাত দিচ্ছিল তৃষা। শ্রীনাথের কথা মন দিয়ে শুনে বলল, ঠিক আছে, ওকে নতুন করে ঘর তুলে নিতে বলো গে।
৬১. কোনও মহিলা যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চায়
কোনও মহিলা যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চায় তবে তাতে বাধা দেওয়ার কী আছে?—বোস সাহেব খুব ক্লান্ত চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করে।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, মিসেস বোসকে আপনিও চেনেন, আমিও খানিকটা চিনি। প্রপার গাইডেন্স না থাকলে উনি সব টাকা-পয়সা নষ্ট করে ফেলবেন। ব্যাবসা বা দোকান চালানোর জন্য যে মন দরকার তা ওঁর নেই।
গাইডেন্স ও নেবে না।
আমাকে উনি পার্টনার করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু এখন ও আপনার নামটাও সহ্য করতে পারছে না।
কেন বলুন তো!
ও জানে ওর চারশো টাকা অ্যালাউন্স আপনি ঠিক করে দিয়েছেন এবং ও যাতে সব টাকা ওড়াতে না পারে তার জন্য আপনিই নানারকম প্রিকশন নেওয়ার অ্যাডভাইস আমাকে দিয়েছেন।
কথাগুলো ওঁকে বলে ভাল করেননি।
বোস ক্লান্ত স্বরে বলে, আই অ্যাম টায়ার্ড অফ হার। আর কত অভিনয় করা যায় বলুন তো!
অভিনয় না করতে চাইলে কোর্টে যেতে হয়। সেটাও কি ভাল?
আমি এখন কোর্টে যেতে রাজি।
গেলে আপনি সহজেই ডিভোর্স পেয়ে যাবেন। কারণ মিসেস নোম মামলা লড়বেন না। কিন্তু তারপরে ওঁর অবস্থাটা কী দাঁড়াবে ভেবেছেন? ওঁর বাপের বাড়ির অবস্থাটা ভাল নয়, আত্মসম্মানবোধ বেশি বলে উনি নিজেও সেখানে যাবেন না। যতদূর খোঁজ রাখি ওঁকে আশ্রয় দেওয়ার মতো কেউ নেই।.চাকরি যে চট করে পাবেন তারও নিশ্চয়তা নেই।
সেইজন্যই ওর দোকানের স্কিমটা আমি সাপোর্ট করছি।
দীপনাথ ম্লান হেসে বলে, উনি তিন মাসও দোকান চালাতে পারবেন না।
আচমকাই বোস সাহেব বলে, লেট হার ম্যারি এগেন। আবার বিয়ে করুক। সেই স্কাউন্ড্রেলটাকেই করুক, কী নাম যেন, স্নিগ্ধদেব না কি!
দীপনাথ থমথমে মুখে বলে, স্নিগ্ধদেব ম্যারেড ম্যান। তাছাড়া একটা বেশ বড়সড় স্কলারশিপ নিয়ে উনি এখন আমেরিকায়।
আমি তো এতসব জানিও না।
আমি জানি। স্নিগ্ধদেব বোধহয় এসব সমস্যায় জড়াতে চাইত না। বিয়ের কথা বলছেন? এ দেশে এখনও ডিভোর্সি মেয়েদের অত সহজে বিয়ে হয় না।
ফাইন্ড এ ওয়ে, চ্যাটার্জি। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডিচ হার। কিন্তু ওকে আটকে রাখা মানে আমার নিজেরও আটকে থাকা। ইউ নো মাই প্রবলেমস।
দীপনাথ স্থির চোখে বোস সাহেবকে দেখছিল। উত্তরবাংলা থেকে ফিরে আসার কিছু পর থেকেই সে বোস সাহেবকে অত্যন্ত ক্লান্ত ও অধৈর্য দেখছে।
দীপনাথ মৃদু স্বরে বলে, আচ্ছা, আমি ভেবে দেখছি। দু’-একদিন সময় দিন।
বোস সাহেব জবাব দিল না।
দীপনাথ বোসের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের টেবিলে ফিরে এল। অন্য তিনজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের জন্য আলাদা তিনটে প্লাইউডের খুপরি তৈরি হয়েছে। শুধু দীপনাথই খুপরিতে যেতে রাজি হয়নি। তাই সে এখনও মস্ত হলঘরটার একপাশে খোলামেলা জায়গায় বসে।
টেবিলের কোণটার দিকে ভ্রুকুটি করে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে দীপনাথ। উত্তরবাংলা থেকে ফিরে এসে বার দুই মণিদীপার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার চেষ্টা করেছে। মণিদীপা কথা বলেইনি। ক্রুদ্ধ অপমানকর গলায় বলেছে, আই হেট টু টক উইথ ইউ। অথচ মণিদীপার সঙ্গে এখন কথা বলার দরকার। বোকা মেয়েটা জানেও না, বা জানলেও বোঝে না যে, তার বিপদ ঘনিয়ে আসছে। দীপনাথ বাইরে থেকে কতদিন বালির বাঁধ দিয়ে রাখবে?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপনাথ কাজে মন দেয়। কিন্তু আবার আনমনা হয়ে যায়। নিজের ভেতরকার এক পাপবোধ তাকে বড় অস্থির করছে, কুঁকড়ে দিচ্ছে, কাজে মন দিতে দিচ্ছে না। মণিদীপাকে কি সে-ই নষ্ট করেনি? স্নিগ্ধদেব হয়তো মণিদীপার নেতা ছিল, প্রেমিক ছিল না কিছুতেই। কিন্তু দীপনাথ জানে, মণিদীপাকে যদি সত্যিকারের বিভ্রান্ত কেউ করে থাকে তবে সেই ব্যক্তি সে নিজেই। এখন সে মণিদীপার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও লাভ নেই। তাতে ভাঙা সংসার জোড়া লাগবে না। দীপনাথ নিজেও দুর্বল। বড় দুর্বল। মণিদীপার কথা সে খুব কম সময়েই না ভাবে! এখনও এক তীব্র অদ্ভুত আনন্দ রয়েছে মণিদীপাকে মনে করার মধ্যে।
থাকতে না পেরে দীপনাথ, বোস সাহেবদের বাড়িতে রিং করল। বাবুর্চি ফোন ধরে জানাল, মেমসাহেব বাড়ি নেই। লাঞ্চেও ফিরবে না বলে গেছে।
একা বেরিয়েছে?
না, একজন দালাল এসেছিল।
দালাল কিসের?
মনে হয় বাড়ির দালাল। মেমসাহেব একটা দোকানঘর খুঁজছে।
দীপনাথ ফোন রেখে দেয়।
বিকেল পর্যন্ত অনেক ফোন এল। অনেক কাজ করল দীপনাথ। কিন্তু মন কান সবই উৎকণ্ঠ রয়েছে অন্যদিকে।
বেলা চারটে নাগাদ ফোন বাজতেই তুলে মেয়েলি গলায় ‘হ্যালো’ শুনে সে প্রায় চেঁচিয়ে বলল, মণিদীপা?
