সজল অভ্যাসবশে একটু ভয় পেল। মা সম্পর্কে এখনও তার ভয়টা পুরোপুরি যায়নি। শক্ত কাঠামোর গম্ভীর ও আদরহীন তার এই মা তো গায়ের জোরে সবাইটে ঢিট করে রাখেনি। আর-একটু কিছু আছে। সেই রহস্যময় অজানা একটু কিছুকেই পেরোনো যায় না।
সজল চোখ নামিয়ে বলে, এখন আমি যেতে পারব না। তুমি মেজদি বা ছোড়দিকে নিয়ে যাও।
তৃষা কিছু বলল না। নিঃশব্দে ঘরে চলে গেল। ঘরের ঠিক মাঝখানে আবহাওয়ায় কিছুক্ষণ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। রাগ হয় না, পরাজয়ের গ্লানিও বোধ করে না। শুধু এক শূন্যতা এসে তার ভিতরটাকে ফাঁকা বোধবুদ্ধিহীন করে দেয় কিছুক্ষণের জন্য।
সজল নিজের ঘরে গিয়ে জামা-প্যান্ট পালটায়। একটু চিন্তিত, উদ্বিগ্ন।
আগে সে মায়ের কাছে থাকত। তারপর জায়গা হল দুই দিদির ঘরে। সম্প্রতি তার একটা আলাদা ঘর হয়েছে। এ ঘরে সে একা থাকে। ভূতের ভয় পেত আগে। এখন পায় না। আজকাল খুব কম জিনিসকেই ভয় পায় সজল।
চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে সে এলাহাবাদ যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবল। বেড়াতে যাওয়া খারাপ নয়, কিন্তু এখন তার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হয় সে চলে গেলে বাবার বিপদ হবে।
পায়ে চটি গলিয়ে সজল ঘর থেকে বেরিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ভাবন-ঘরে এসে ঢোকে।
বাবা!
শ্রীনাথ বাগানের ধারের রাস্তায় বেড়াবে বলে গলায় কম্ফর্টার জড়িয়ে তৈরি হচ্ছিল। বলল, কী রে?
মা এলাহাবাদ যাচ্ছে।
জানি। চিত্রার বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে।
আমাকেও নিয়ে যেতে চাইছে।
শ্রীনাথ ভালমানুষের মতো বলে, যা না। ঘুরে আয়।
আমি বলেছি যাব না। সামনে পরীক্ষা।
ও। তাও তো বটে। তবে তোকে নিয়ে যেতে চায় কেন?
কী জানি। মার ধারণা, এ বাড়িতে একা থাকলে আমি বদমাইশি করব।
শ্রীনাথ মুখ বিকৃত করে বলে, বাজে কথা।
মা খুব রাগ করেছে। তুমি মাকে একটু বুঝিয়ে বলবে?
কী বলব বল তো?
বোলো, আমি চলে গেলে তোমার অসুবিধে হবে।
তাতেও তো তোর মা রেগে যাবে।
সে আমি জানি না। তুমি যেমন করেই হোক যাওয়ার ব্যাপারটা কাটিয়ে দাও।
শ্রীনাথ চিন্তিত মুখে চেয়ে থেকে বলে, আমার কথার কি কোনও দাম আছে ওর কাছে? তবু বলে দেখব।
তুমি বললেই হবে।
খুবই গম্ভীর মুখে সরিৎকে নিয়ে পরের সপ্তাহে এলাহাবাদ রওনা হয়ে গেল তৃষা। তিনদিনের নাম করে গেল, সাতদিনও এল না বা চিঠি দিল না।
তুষার খবরের জন্য এ বাড়ির কেউই উদ্বিগ্ন নয়। শুধু বুড়ো দীননাথ মাঝে মাঝে ডাক-খোঁজ করেন, ওরে বউমার পৌঁছন সংবাদ এল? ডাকঘরে একটু খোঁজ নে না তারা। এরা তো কত চিঠি হারিয়ে ফেলে, বিলি করে না।
প্রায় রোজই মঞ্জু আর স্বপ্নার সঙ্গে সজলের ঝগড়া হয় আজকাল। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। বাগানে প্রায়ই গোরু ঢোকে। বাড়ির গোরু দুয়ে দুধ অনেক কম হয়, গ্রাহকরা রাগারাগি করে। হাঁস মুরগিদের ডিমও কম পড়ছে আজকাল। উঠোনে শুকনো পাতা পড়ে থাকে। তৃষার ঘরের দাওয়ার নীচে বসে ইস্পাত রাতবিরেতে কেঁদে ওঠে প্রায়ই।
এই তক্কে একদিন মালাবদল সেরে নিশুতিরাতে চুপিচুপি বিনিকে এনে ঝোপড়ায় তুলে ফেলল খ্যাপা নিতাই।
পরদিন তাকে নিয়ে হইচই পড়ে গেল বাজারে। জটা নেই, টেরিকাটা মাথা। দাড়ি কামানো। প্রথমটায় লোকে চিনতেই পারেনি। গম্ভীর মুখে বাজার করছিল। একজন দু’জন করে চিনে ফেলতেই ভিড়ে ভিড়াক্কার।
নিতাই ভিড় ভালবাসে। তাকে নিয়ে লোকে হইচই করুক তাও চায়।
সে ভিড়ের দিকে হাত তুলে বরাভয় দেখিয়ে টিউবওয়েলের মাথায় উঠে দাঁড়াল। গলা ঝেড়ে বলল, ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের পরিচিত নিত্যানন্দ মহারাজ এখনও নিত্যানন্দ মহারাজই আছেন। তন্ত্রসাধনা অতি গুহ্য সাধনা। এর স্বরূপ কেউ জানে না। গতকাল গুরুদেব স্বপ্নে আদেশ করলেন, ওরে নিতাই, অনেককাল ব্রহ্মচর্য হল। এবার একটু গেরস্থ হ। গৃহস্থ না হলে সংসারটাকে টের পাবি কী করে? তোর তো পনেরো আনাই হয়ে আছে, এইটে হলেই ষোলা আনা হয়…
শুনে লোকে হাততালি দিল।
পনেরো দিনের মাথায় এলাহাবাদ থেকে কাশী আর লক্ষৌ ঘুরে তৃষা ফিরে এল। নিতাই ঝোপড়ার দরজা আর দিনমানে খুললই না সেদিন।
তৃষা ফিরে আসার পরই গোরুর দুধ বেড়ে যায়, হাঁস-মুরগিরা উচিত মতো ডিম পাড়ে, উঠোন ঝকঝক করে, মঞ্জু স্বপ্না আর সজলের ঝগড়া মিটে যায়।
তবে তৃষার মুখ একটা কাঠের মুখের মতো গম্ভীর থাকে। সহজ হয় না, স্বাভাবিক হয় না।
পরদিন সকালে শ্রীনাথের ঘরে এসে তৃষা বলল, ছেলে আমার পছন্দ হয়েছে। মত দেব?
পছন্দ হলে মত দেবে না কেন?
তোমার মতও তো আছে!
আমার মত বলে কিছু নেই।
কিন্তু তুমি মেয়ের বাবা, চিঠিটাও তো তোমাকেই লিখতে হবে।
আমি আজকাল লিখতে পারি না। হাত কাঁপে। তুমি লিখে দাও বয়ানটা, আমি সই করে দিচ্ছি।
ছেলেটা কেমন তা জানতে চাইলে না?
তোমার যখন পছন্দ হয়েছে তখন ভালই হবে। সংসারের এসব ব্যাপার তুমি আমার চেয়ে অনেক ভাল বোঝে।
তৃষা চলে আসে। ঝোপড়ার বেড়ার ফাঁক দিয়ে দুই জোড়া ভিতু চোখ লক্ষ করছিল তৃষাকে। এখনও টের পায়নি। বিনি যে এ ঘরে আছে তা কারও জানা খবর নয়। ধরা পড়লে কী হবে তাও ভেবে ঠিক করতে পারছে না দুজনে।
তৃষাকে কেউ কিছু বলেওনি। তবু আনমনে ভিতরবাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে তৃষা একবার আলতো দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ঝোপড়ার দিকে। তাকিয়েই ভ্রু কোঁচকাল। ঝোপড়ার উঠোনটা নিকোনো, ঘাস চাচা! একটা নতুন গামছা ঝুলছে দড়িতে।
ঘরে এসে সে মংলুকে ডেকে বলে, খ্যাপা নিতাইকে ধরে আন তো। আর দেখে আসবি ওর ঘরে কেউ আছে কি না।
