কী জানি!
মারপিট করিস?
অন্যায় দেখলে। তাছাড়া নয়।
শ্রীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ওসব করিস না। চারদিকে শত্রু। কে কবে শোধ নিতে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তোকেও মেরে ফেলবে।
আমাকে মা অবধি ভয় পায়। জানো?
তোকে?—শ্রীনাথ অবাক, কই তোকে দেখে তো ভয়ের কিছু মনে হয় না।
সজল হাসে, একমাত্র তুমিই আমাকে ভয় পাও না। বরং আমিই তোমাকে ভয় পাই, বাবা।
দূর পাগল! আমাকে ভয়ের কী? কেউ আমাকে ভয় পায় না।
আমি পাই। আমি যে তোমাকে ভীষণ ভালবাসি।
৫৯. ফেয়ারলি প্লেসে ব্ল্যাকারদের সঙ্গে হাতাহাতি
ফেয়ারলি প্লেসে ব্ল্যাকারদের সঙ্গে হাতাহাতি করে, লাইন ম্যানেজ করে এবং বুকিং ক্লার্কদের সঙ্গে বিস্তর অর্থহীন কথা বলে সরিৎ এলাহাবাদের তিনটে সেকেন্ড ক্লাস স্লিপারের টিকিট কেটে ফেলল। ঝাড়া ঘণ্টা চারেকের চেষ্টায়।
বেরিয়ে এসে টিকিটগুলোর দিকে চেয়ে চুকচুক করে একটু আফসোসের শব্দ করল। একেবারে ফালতু গচ্চা। এলাহাবাদ পর্যন্ত অনায়াসে বিনা টিকিটে যাওয়া যেত, খরচ লাগত অর্ধেকের কম। কিন্তু সেজদিকে সে কথা বলাই যায় না।
শেষবেলায় বাড়িতে ফিরে বিজয়ীর মতো হেসে সেজদির হাতে টিকিট দিয়ে বলল, ব্ল্যাকে কাটতে হয়নি। লাইনেই পেয়ে গেলাম।
তৃষা কোনও জবাব দিল না। থমথমে গম্ভীর মুখে টিকিটগুলো নিয়ে ঘরের আলমারিতে রেখে এল। বলল, সজলকে একটু ডেকে দিয়ে যাস তো। বোধহয় পুরনো গোয়ালঘরটায় আছে।
সরিৎ গিয়ে দেখে, মস্ত বালির বস্তায় হাতে ন্যাকড়া জড়িয়ে ঘুরে ঘুরে ঘুসি চালাচ্ছে সজল। মুখ রক্তবর্ণ, সর্বাঙ্গে জবজবে ঘাম।
অবাক সরিৎ বলে, কী করছিস? বক্সিং?
সজল গম্ভীর মুখে বলে, হ্যাঁ।
কে শেখায় তোকে?
কেউ না। নিজে শিখছি।
সরিৎ নিজের কাজকর্ম এবং ভবিষ্যৎ তৈরি করতে ইদানীং এতই ব্যস্ত ছিল যে, সজলকে ভাল করে লক্ষই করেনি। আজ করল। এবং একটু অবাক হল।
তুই কত ফুট লম্বা রে?
পাঁচ নয়।
সজলের উচ্চতা ওরকমই হবে। বেশি ছাড়া কম নয়। তবে আরও লম্বা হবে। অনেক লম্বা। সরিতের নিজের হাইট মাত্র পাঁচ আট। কিন্তু সে আর বাড়বে না। শুধু লম্বাই নয়, সজলের কাঠামোটা আশ্চর্য রকমের মজবুত। কবজি দুখানা চওড়া, হাত দুখানা যেমন লম্বা তেমনি দ্রুতগতিসম্পন্ন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা এবং সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপার হল, সজলের দু’খানা, চোখ।
বহুকাল বাদে হঠাৎ একটা অজানা ভয়ে বুকটা সামান্য কেঁপে উঠল সরিতের। এ ছেলেকে সামলানো মুশকিল হবে। এর ওপর আধিপত্য করা যাবে না কখনও। এসব সরিৎ এক নজরেই বোঝে।
সে তবু মুখে হাসি টেনে এনে বলল, খুব তিনঠ্যাঙা লম্বা হয়েছিস তো!
সজল ঘুসি থামিয়ে ঘরের বেড়ায় গোঁজা একটা টার্কিশ তোয়ালে দিয়ে ঘাম মোছে।
সরিৎ মস্ত বস্তাটায় হালকা দু-একটি ঘুসি মেরেই বুঝতে পারে, এই ভারী কর্কশ বালিতে ধার হয়ে ওঠা বস্তায় একনাগাড়ে ঘুসি মারা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কবজি ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, লিগামেন্ট ছিঁড়তে পারে।
সরিৎ ডান হাতটা বাড়িয়ে বলল, তোর পাঞ্জার কেমন জোর হয়েছে!
সজল একটু হাসল, তারপর হাত বাড়িয়ে সরিতের চেয়ে অন্তত দেড়গুণ বড় থাবায় চেপে ধরল হাতখানা।
সরিৎ বিস্তর মারপিট করে হাড্ডি পাকিয়ে ফেলেছে। তার হাতে ব্যথা লাগে না, তবু হাতখানা ধবে সে বুঝতে পারল, সজলের গায়ে জোর যে তার চেয়ে বেশি তাই নয়, বহু বহুগুণ বেশি। সরিৎ না হয়ে অন্য কেউ হলে সজলের আঙুলের চাপে ককিয়ে উঠত। সরিৎ ককিয়ে উঠল না, কিন্তু আবার এক অজানা ভয়ে খানিকটা বিবর্ণ হয়ে গেল।
সজলের পিঠ চাপড়ে সরিৎ বলে, ভাল তৈরি হয়েছিস। খুব ভাল। তোকে কয়েকটা শক্ত কায়দা শিখিয়ে দেব। কালিম্পং-এর একজন ব্রাউন বেল্টের কাছ থেকে শেখা।
সজল খুব উৎসাহ দেখাল না। উদাস মুখে বলল, দিয়ো।
এখন যা। তোকে সেজদি ডাকছে।
গায়ে গেঞ্জি ছিলই। বেড়ার গা থেকে জামাটা টেনে গায়ে চড়াল সজল। বলল, তুমি এগোও। যাচ্ছি।
চিন্তিত মুখে সরিৎ গিয়ে তার মোপেড চালিয়ে বাজারে গেল। ত্রয়ীতে নতুন মাল এসেছে। দাম ফেলতে হবে।
জামার ওপর হাতকাটা সোয়েটার চাপিয়ে সজল এসে মায়ের ঘরের সামনে দাঁড়ায়।
তৃষা বেরিয়ে আসে।
শেষবেলায় শীতের ম্লান রোদ পড়েছে সজলের মুখে। মুখের ঘাম সবটা মরেনি এখনও।
লম্বা, সারবান চেহারা। চোখের দৃষ্টি এই বয়সেই যথেষ্ট স্থির এবং গভীর। নির্ভুল একজনের ছাপ পড়েছে সজলের চেহারায়। কিন্তু সেই লোকটিকেও দিনকালে এ ছেলে ছাড়িয়ে যাবে। তৃষা কিছুতেই আজকাল ছেলের সামনে সহজ বোধ করে না। কেমন অস্বস্তি হয়।
ডেকেছ?
তৃষা গম্ভীর মুখে বলে, সামনের সপ্তাহে আমরা এলাহাবাদ যাচ্ছি।
আমরা মানে!
আমি, তুই আর সরিৎ।
আমি গিয়ে কী করব? স্কুল কামাই হবে না?
মামি তোকে দেখতে চেয়েছে। আমরা বেশিদিন থাকব না।
সামনেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা।—সজল ঘাড় শক্ত রেখেই জবাব দেয়।
দু-তিন দিনে কিছু হবে না!
বড়দির বিয়ের ব্যাপার, সেখানে আমাকে দিয়ে কী হবে?
কিছু হবে না। কিন্তু আমি তোমাকে একা বাড়িতে রেখে যেতে চাই না।
সজল অবাক হয়ে বলে, একা কেন? মেজদি, ছোড়দি আছে, বাবা আছে।
তাদের থাকা না-থাকা সমান। তুই কবে থেকে মুখে মুখে জবাব দিতে শিখলি?
তুমি বোকার মতো কথা বলছ বলেই জবাব দিচ্ছি।
বোকার মতো!–বলে স্তম্ভিত হয়ে তৃষা চেয়ে থাকে ছেলের দিকে। এত সাহস! এত সাহস এরা কোখেকে পায়?
কিছুক্ষণ তৃষা কথাই বলতে পারল না।
