তাই বটে!–চোখ কপালে তোলে নিতাই।
বললে কিন্তু কেটে ফেলব, নিতাই।
কালীর দিব্যি করেছি। নিশ্চিন্তে বলো।
কথা এটুকুই। বলল, জামাইবাবুকে মাঝে মাঝে ডেকে নিয়ে যাবেন। তবে কেউ যেন টের না পায়।
তুমি রাজি হলে?
রাজি না হয়ে উপায়? রামে মারে, রাবণেও মারে যে!
বউদি যদি জানতে পারে?
সে কথাও তুললাম। চোখ টিপে বলল, ডাক্তারের পরামর্শ তো, মেজদি কিছু মনে করবে না। তখনই বুঝলুম, চাটুজ্জেগিন্নির সায় আছে।
সরিৎ তোমাকে কিছু দিল-টিল?
না। কী দেবে?
কিছুই না?
জুতো খাবি কিন্তু, নিতাই।
নিতাই হেসে বলল, সাধু সেজো না। কদিন আগে একজোড়া বালা ভেঙে রতনচুড় করতে দেয়নি বউদি তোমাকে?
সে কি ঘুষ?
তা নয় তো কী? ও বাড়ির গয়না করে কলকাতার স্যাকরারা। তোমার মতো হাভাতে সোনার বেনেকে কে পোঁছে হে?
যা, তা হলে চা পাবি না।
তা হলে কথাটাও গোপন থাকবে না।
মা কালীর দিব্যি কাটলি যে!
তুমিও তো চা খাওয়াবে বলে ডেকেছিলে। রেখেছ সে কথা?
চা হবে রে বাপ, কথাটা ওভাবে ধরিসনি।
মাল ছাড়ো, কথা যেভাবে ধরতে বলবে সেভাবেই ধরব।
ধরাধরির কিছু নেই। শ্রীনাথবাবু এখন আবার একটু ফুর্তি করার জন্য আঁকুপাঁকু। বেচারার জন্য কষ্টও হয়। কিন্তু এ কালান্তক ছেলেটার জন্য ভয় পাই। সেদিন রামলাখনের ঘরে ঢুকে লঙ্কাকাণ্ড করে এসেছে। ওকে একটু বুঝিয়ে বলবি যে, দোষটা আমার নয়।
দোষটা কার ঘাড়ে চাপান দেব তা হলে?
ডাক্তারের ঘাড়ে। বলবি ডাক্তার বলেছে।
ও ছেলে অত সহজে ভুলবার নয়।
তবে ভবি ভুলবে কীসে?
সে ভার আমার। আমাকে একটা ঘর করার জায়গা দেবে? তোমার তো মেলা জায়গা, আধকাঠা পেলেও আমার হয়।
দূর শালা! ভাগ।
আচ্ছা, এখন তো চা খাওয়াও।–বলে নিতাই জুত করে বসে।
সজলের বন্ধুদের বলা আছে। তারা চারদিকে নজর রাখে। পাহারা দেয় সজল নিজেও। ইস্কুল থেকে ফিরেই সে আসে ভাবন-ঘরে, ঢুকে বাবাকে দেখে। যখন বিকেলে খেলতে যায় তখন তার হয়ে বাবাকে পাহারা দেয় খ্যাপা নিতাই বা নতুন মালি। সজল সবাইকে বলে রেখেছে, রঘু স্যাকরাকে কাছেপিঠে ঘোরাঘুরি করতে দেখলেই যেন তাকে খবর দেওয়া হয়।
সন্ধের পর বাড়ির মাস্টারমশাই চলে গেলে সে নিজেই বাবার কাছে চলে আসে। শ্রীনাথও তাকে দেখলে খুশি হয়।
আয়। মাস্টারমশাই চলে গেছেন?
হ্যাঁ।
বোস, কাছে এসে বোস। যা শীত।
এক লেপের তলায় গায়ে গায়ে বাপ-ব্যাটায় বসে গুটিসুটি হয়ে। সজল এখন মাথায় মাথায় শ্রীনাথের সমান লম্বা। শ্রীনাথের চেয়ে তার স্বাস্থ্য ভাল এবং গায়ের জোর অনেক বেশি। খুব হঠাৎ করেই সজলটা এমন ধাঁ বেড়ে উঠল। এই বেড়ে ওঠাটাকে খুব উপভোগ করে শ্রীনাথ। সে গাছপালার বেড়ে ওঠা লক্ষ করেছে। এমন সতেজ সহজ বাড়ন খুব সুলক্ষণ। গাছপালাকে কখনও একটু ঘঁটকাট করতে হয়। তাতে বাড় আরও ভাল, কিন্তু মানুষের ঘঁটকাট কীভাবে হবে তা তো সে জানে না।
সজলের বাড়ন্ত শরীরে নিজের শরীরের তাপ সঞ্চার করে দিতে দিতে শ্রীনাথ বলে, আজকাল আমি কেমনধারা হয়ে গেছি যেন। বোধহয় বেশিদিন বাঁচব না। তুই আমাকে দেখিস।
সজল গম্ভীর গলায় বলে, আর কখনও যাওনি তো, বাবা?
রামলাখনের ওখানে? দূর বোকা।
আমি কিন্তু চারদিকে পাহারা রেখেছি।
পাহারা!–বলে অবাক হয় শ্রীনাথ, সে কী রে! পাহারা কেন?
রঘু স্যাকরা যদি তোমাকে নিয়ে যায়।
শ্রীনাথ চুপ করে থাকে। তারপর অনেকক্ষণ বাদে আস্তে আস্তে বলে, রঘুর দোষ কী? নিমিত্ত মাত্র। আমিও তো ভাল নই। নইলে সে ডাকল আর আমিও কেন চলে গেলাম।
সজল মৃদু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলে, তুমি খুব ভাল বাবা।
দু’জনে আর-একটু নিবিড় হয়ে বসে। শ্রীনাথ একটু আবেগের ধরা গলায় বলে, ভালই তো ছিলাম একসময়ে। তারপর সব গণ্ডগোল হয়ে গেল। কাচা পয়সা, নিশ্চিন্তের জীবন এসব ভাল নয়। তুই একটু দুঃখে থাকিস, টানাটানিতে থাকিস, ভাল থাকবি।
সজল হঠাৎ লেপটা গা থেকে সরিয়ে চিতাবাঘের মতো দ্রুত গিয়ে এক ঝটকায় পশ্চিমের জানালাটা খুলে বলল, কে?
ভয়ার্ত গলায় জবাব এল, আমি।
সজল তেমনি বাঘের মতো গিয়ে দরজার হুড়কো খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সজলখোকা, আমি নিতাই।
কী চাও?
একটা কথা।
চালাকি কোরো না। স্পাইগিরি করছিলে?
চালাকি নয় গো।
কে তোমাকে লাগিয়েছে কথা শোনার জন্য?
মাইরি কেউ না।
সজল হঠাৎ বিকট স্বরে চেঁচিয়ে বলে, আমার বাবার ওপরে যে স্পাইং করবে তার টুটি ছিড়ে ফেলে দেব।
নিতাই ভড়কে গিয়ে বলে, কথাটা শোনোই না। অত চেঁচালে যে লোক জুটে যাবে। সজল অবশ্য কথাটা নিতাইকে উদ্দেশ করে আর কাউকে শোনাচ্ছিল। কেননা তার ক্রুদ্ধ চোখ ভিতরবাড়ির দিকে। চোখটা ফিরিয়ে অন্ধকারে কালো চাদরে মুড়ি দেওয়া নিতাইয়ের দিকে চেয়ে বলল, মিথ্যে কথা বলবে না তো!
না। তোমাকে মিথ্যে বলে কি মার খেয়ে মরব?
কী কথা?
রঘু স্যাকরার দোষ নেই। তোমার মামা তাকে লাগিয়েছিল বাবুকে রামলাখনের আড্ডায় নিয়ে যেতে। আমার নাম কোরো না কিন্তু। বলে গেলাম, এবার পালাই।
সজল খুব অবাক হল না। কিন্তু একা অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাগে বিদ্বেষে পাগল হয়ে দাঁতে দাঁত পিষতে লাগল।
ভিতর থেকে শ্রীনাথ ডাকল, সজল, আয়। কে রে?
ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে সজল বলে, নিতাই।
আবার বাপ-ব্যাটায় কাছ ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে।
শ্রীনাথ বলে, তুই কি খুব ডাকাবুকো? দুষ্টু?
সজল হাসে। বলে, না। তবে আমাকে সবাই ভয় খায়।
তোকে? তুই তো একটুখানি ছেলে, তোকে ভয় পায় কেন?
