বিনি, অর্থাৎ কুঠে সামন্তব ডাগর মেয়েটি, এসব কথার অর্থ বোঝে। নিতাই টোপ ফেলছে। ফিক করে হেসে বলে, জটা বড় বিচ্ছিরি ও নিতাইদা, জটা ছাড়া তান্ত্রিক হওয়া যায় না?
নিতাইয়ের মুখ বেজার হয়। জটা ছাড়া তান্ত্রিক হয় কি না তা সে ভাল জানে না। তবে এটা জানে যে জটা ছাড়া ব্যাবসা হয় না। জটা রক্তাম্বর রুদ্রাক্ষ ত্রিশুল, রক্তচক্ষু এসব না হলে মানুষ ভড়কাবে কেন? আর না ভডকালে মাথাই বা নোয়াতে যাবে কেন? তাই সে বলে, তা হয়। তবে কিনা আমার জটার অনেক গুণ। স্বয়ং মা গঙ্গা এই জটার মধ্যে সেঁধিয়ে রয়েছেন। কতবার নিংড়ে গঙ্গাজল বেব করেছি। তা ছাড়া জটার চুল নিয়ে গিয়ে অনেকে কবচ করে! একগাছা চুল দশ পয়সা।
বলো কী?–বলে হাঁ করে থাকে বিনি। আর জটা ছাঁটাবার কথা মুখেও আনে না।
নিতাই মাতব্বরের মতো মাথা নেড়ে বলে, তান্ত্রিকরা যদি পয়সা চায় তবে টাকার বৃষ্টি করে দিতে পারে। তবে কি পয়সাকড়ির কথা আমরা ভাবি না, এই যা।
আমাকে একদিন টাকার বৃষ্টি দেখাবে?
দেখাব। তবে পাঁচজনের সামনে নয়। ভারী গুহ্য সাধনার ব্যাপার তো!
মেয়েটার বিস্মিত মুখের দিকে চেয়েই নিতাই টের পায়, জমছে, খেলা জমছে। কিন্তু জামে লাভ কী? বউদিমণি যদি টের পায় তবে বাড়ি থেকে তাড়াবে। আর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে নিতাইয়ের ঠাই জুটবে কোথায়? সত্যি বটে, তার নামেও বউদি দশ বিঘে জমি কিনেছে, কিন্তু সে জমি কোথায় তা নিতাই জানে না, দলিলটাও চোখে দেখেনি। সে জমির নাগালও সে কোনওদিন পাবে না। তা হলে তার নিজের বলতে রইল কী? বউ নিয়ে উঠবে কোথায়? খাওয়াবেই বা কোন কাঁচকলা?
তোমার বউ কেন পালিয়েছিল গো, নিতাইদা? তুমি তো লোক খারাপ নও! মা বলে, নিতাইবাবার মনটা বড় ভাল।
সেটা আর সে বুঝল কই বলো? মড়ার খুলি দেখে ভয় পেল কিনা! তন্ত্র-সাধনার গুহ্য কথা কি মেয়েরা বোঝে?
বিনি চোখ কপালে তুলে বলে, ওমা! বউ থাকতে তুমি তান্ত্রিক হয়েছিলে নাকি? লোকে তো বলে, বউ পালানোর পর হয়েছ!
নিতাই ধরা পড়েও ঘাবড়ায় না। আঙুল দিয়ে দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে, পুরোপুরি ছিলাম বটে। তবে একটু-আধটু নাড়াচাড়া করতাম।
তোমার সেই বউ খুব সুন্দরী ছিল?
ছিল এক রকম। নাকটা চাপা। তা ছাড়া ভালই।
নাক তো আমারও চাপা।
তোমার? যাঃ। তোমার বলে টিকলো নাক!
এইসব আগড়ুম বাগড়ম বকতে বকতে বেলা চড়ে। নিতাই জানে, বেশিক্ষণ বসলে বিনি খেতে বলবে। সেটা ঠিক হবে না। গরিব মানুষ, একটা বাড়তি লোককে খাওয়াতে এদের যে কত কষ্ট হয়। তা ছাড়া খায়ই বা কী? কচু ঘেঁচু আর পাতা সেদ্ধ, একটু লবণ আর লংকা। তাই নিতাই বসে না। উঠে পড়ে।
বিনি খানিকটা এগিয়ে দিয়ে বলে, আবার এসো। তুমি এলে ভারী ভাল লাগে।
একদিন দুপুরে সামন্তর বাড়ি থেকে ফেরার পথে রঘু স্যাকরা ডেকে বলল, চা খাবি নাকি?
বহুকাল রঘু স্যাকরার সঙ্গে দেখা নেই। একবার খামোখা খুব ঝামেলায় পড়েছিল। সেই থেকে আর ওপথ মাড়ায় না। তবে কেউ ডাকলে না গিয়েও পারে না নিতাই।
রঘুর নতুন বাড়ির দাওয়ায় বসে বলল, খুব টাকা হয়েছে তোমার দেখছি।
রঘুর মুখখানার চেহারা ভাল না। হাসি নেই, গোমড়াপানা। একটা বাটিতে অ্যাসিডে সোনা জ্বাল দিচ্ছে কাঠ-কয়লার আংরায়। গন্ধে কাশি আসে, পেট গুলোয়।
রঘু বাটিটা নামিয়ে রেখে কাছে এসে বসে বলল, খবর-টবর সব শুনেছিস?
কী শুনব?— সন্দেহের চোখে চায় নিতাই।
ও বাড়ির খবর। চাটুজ্জেবাড়ির।
খবর তো কিছু নেই। শুধু বড়দিদিমণির বিয়ে হবে শুনেছি। তা সে এখানেও নয়। এলাহাবাদে।
ও খবর নয়। শ্রীনাথ চাটুজ্জে যে আবার মাইফেলে যাচ্ছে, সে খবর শুনিসনি?
ওঃ। সে তো নতুন কিছু নয়।
শ্রীনাথের ছেলেটা তো খুব উঠেছে দেখছি।
সজলখোকা? সে আবার উঠবে কী?
উঠবে কী?–বলে মুখ ভেঙায় রঘু।–আলিসান চেহারা হয়েছে। ডাকাত-টাকাত হবে বড় হলে। তেমনি হাড়ে-হারামজাদা!
সজলখোকা আবার তোমার কী করল?
দিতুম সেদিনই ঠ্যাং ভেঙে। নেহাত ছেলেমানুষ, তা ছাড়া বাপটাও সামনে রয়েছে। কিছু বলিনি। কিন্তু সাবধান করে দিস। এর পর বাঁদরামি করলে পুঁতে ফেলব।
নিতাই হাসে তড়পানি দেখে। মাথা নেড়ে বলে, ব্যস ব্যস, অত লাফিয়ো না। সবাই কি আর নিতাইখ্যাপা? ঝেড়ে কাশশা তো বাপ, ব্যাপারটা শুনি আগে।
রঘু রক্তচোখে চেয়ে বলে, ইঃ, কে আমার সালিশি এলেন! ওঁকে বলতে হবে!
চা খাওয়াবে বলছিলে যে!
রঘু উঠে গিয়ে বাটিটা আবার নেড়েচেড়ে দেখে। অ্যাসিডটা সাবধানে আর-একটা পাত্রে ঢেলে দিয়ে উঠে আসে। বলে, চা চা করে গলা শুকোচ্ছিস কেন? বলেছি যখন, হবে।
তো কথাটা কী?
কাউকে বলবি না?
কার দিব্যি কাটতে হবে বলো, কাটছি।
মা কালীর।
মা কালীর দিব্যি।
তোর দিব্যির কোনও দাম নেই। তবু বলছি, শ্রীনাথবাবুকে রামলাখনের ঘরে আমি নিজে থেকে নিয়ে যাইনি।
তাই নাকি?
মাইরি।
নিজে থেকে নাওমি, তবে কি বাবু নিজেই গেল?
তাও নয়।
গুহ্য কথাটা কী?
মাসটাক আগে ভটভটিয়া চেপে শ্রীনাথের শালা সরিৎ এ পথ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি নারকোল গাছের গোড়ায় নুন দিচ্ছিলুম। দেখে ভটভটিয়া থামিয়ে নেমে এসে অনেক আগড়ুম বাগড়ম কথা পাড়ল। ছোকরাকে আমার পছন্দ নয়, তবে মস্তান বলে কথা। খাতির রাখতে হয়। শেষমেশ বলে ফেলল, জামাইবাবুর অবস্থা তো জানেন। কেমনতরো পাগলা পাগলা ভাব। ডাক্তার বলেছে, আগের সব অভ্যাস হঠাৎ ছেড়ে দেওয়ায় এরকমটা হয়েছে। তা আবার একটু ফুর্তিটুর্তি করলে সেরে যাবে। চিকিৎসাই একরকম।
