রঘু চেঁচাচ্ছে, এ কী! এ কী! এসব কী হচ্ছেটা কি? বাবারে! ওফ! হাঁটুটা ভেঙে গেছে। উরে বাবা!
শ্রীনাথ হতবাক, স্তম্ভিত। সজল রঘুকে মারছে! আঁ! সজল রঘুকে মারছে! এত বড় লোকটাকে অতটুকু ছেলে!
রঘুকে বারান্দায় টেনে আনল সজল। তার গায়ের জোর রাগের ঠেলায় এখন তিনগুণ। রঘু টালমাটাল। বারান্দায় এনে স্টাম্পটা আর একবার চালায় সজল। লাগে গোড়ালির কাছ বরাবর।
রঘু উবু হয়ে গোড়ালি চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলে, কেন মারছিস রে বারোভাতারির পুত? কোথাকার পেল্লাদ এলি?
সজল একটা লাথি কষাতেই কাত হয়ে গেল রঘু। মাজা চেপে ধরে উপুড় হয়ে গোঁ গোঁ করতে লাগল।
শ্রীনাথের সংবিৎ এল এতক্ষণে। বেরিয়ে এসে দৃশ্যটা ক্ষণেক দেখেই ভারী রাগ হয়ে গেল। এগিয়ে গিয়ে আচমকা ঠাস করে এক চড় বসাল ছেলের গালে, খুব গুন্ডামি শিখেছিস! আঁ! কে এসব করতে বলেছে তোকে?
সজল বাবার দিকে মুখোমুখি তাকায়। গম্ভীর হয়ে বলে, তুমি এখানে এসেছ কেন?
কেন, এলে কী? কী করবি তোরা?–রুখে উঠে শ্রীনাথ বলে।
সজল এ কথার জবাব দেয় না। বন্ধুরা ফটকের বাইরে থেকে দেখছে। সে ওদের হাতের ইশারায় এগিয়ে যেতে বলে একটু অপেক্ষা করে। তারপর বাবার একটা হাত শক্ত করে ধরে বলে, বাড়ি চলল।
রঘু উঠে বসে মাজা ধরে হাঁফাচ্ছে। বলল, দেখলেন তো, দাদা! দরকারে যেন সত্যি কথাটা বলবেন।
নিঃশব্দে সজল ঘুরে কয়েক পলক রঘু স্যাকরার দিকে চেয়ে থাকে।
সজল ছোকরাটাকে এতদিন ভাল করে লক্ষ করেনি রঘু। আজ চোখের দিকে চেয়ে হিম হয়ে গেল সে। দিনান্তের ফ্যাকাসে আলোয় যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাই যথেষ্ট। এই কলমের চারাটিকে যদি কেউ শিগগির নিকেশ না করে তবে রতনপুরের কপালে কষ্ট আছে। তৃষা তো এর কাছে ছেলেমানুষ।
কিন্তু সজলকে রঘুর দিকে এগোতে দিল না শ্রীনাথ। ধমক দিয়ে বলল, কান ছিড়ে ফেলব বাঁদরামি করলে। তুমি যে এত মাথায় উঠেছ তা আগে জানলে বেতিয়ে লাল করতাম। চলো বাড়ি।
শ্রীনাথ সজলের মধ্যে ভয়ংকর কিছুই দেখতে পায় না, যা রামলাখন দেখছে, রঘু দেখছে। তার কাছে সজল এখনও প্রায় কোলের ছেলে, অবোধ, দুষ্টু। ছেলেকে বকতে বকতে সে ছেলের হাত ধরেই রাস্তায় ওঠে। সজল সাবধানে বাবাকে রেললাইন পার করায়। তারপর রিকশা ডাকে।
সারা রাস্তা সজল একটাও কথা বলল না। শ্রীনাথ একতরফা মাঝে মাঝে রুখে উঠে তাকে বকাবকি করে গেল।
শ্রীনাথকে ভাবন-ঘরে পৌঁছে দিয়ে সজল বলল, আমি মাকে খবর দিতে যাচ্ছি।
শ্রীনাথ মুখ ভেঙিয়ে বলল, যাচ্ছি! যাও না! মাথা কিনে রেখেছে নাকি সবাই আমার?
সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। গন্ধক পোড়ানোর গন্ধে উঠোনের বাতাসটা ভারী। মেজদি শাখে ফু দিল পুবের ঘরে। সজল নিঃশব্দে মায়ের ঘরের দরজায় দাঁড়াল।
প্লাস পাওয়ারের চশমা চোখে দিয়ে তৃষা কিছু কাগজপত্র দেখছে।
মা!
গম্ভীর তৃষা মুখ তুলে বলে, বলো।
বাবা আজ আবার রামলাখনের বস্তিতে গিয়েছিল।
তৃষা তেমন চমকাল না। অবাকও হল না। যেন একটু চিন্তিত মুখে চেয়ে বলল, তোকে কে। বলল?
আমি গিয়ে ধরে আনলাম।
এবার তৃষা অবাক হয়ে তাকায়, তুই গিয়ে ধরে আনলি?
হ্যাঁ। গদাইয়ের কাছে খবর পেয়ে বন্ধুদের নিয়ে গিয়েছিলাম।
তৃষা সত্যিকারের রেগে যায়। থমথমে মুখ করে বলে, ওসব নোংরা জায়গায় যেতে কে তোকে বলেছিল?
বাবা যখন যেতে পারে তখন আমার যেতে দোয কী?
মুখে মুখে কথা বলছিস! খুব সাহস হয়েছে?
সজল চোখ নামিয়ে নেয়। মৃদু স্বরে বলে, আমি তো বাবাকে আনতে গিয়েছিলাম।
ঠিক কাজ করোনি। খবরটা আমাকে দিলে যা ব্যবস্থা করার আমিই করতাম। আর কখনও ওসব জায়গায় যেয়ো না।
বাবার জন্য ব্যবস্থা মা কোনওদিনই করেনি, কিন্তু সে কথা তুলল না সজল। একটু ইতস্তত করে বলল, রঘু স্যাকরা বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল।
তৃষা একটু কি চমকে উঠল? কিন্তু স্বাভাবিক গলাতেই বলল, ঠিক আছে, খোঁজ নিয়ে দেখব। তুমি এখন যাও।
আমি কিন্তু রঘু স্যাকরাকে মেরেছি।
তৃষা এবার বাস্তবিকই চোখে পড়ার মতো চমকে ওঠে, কী বললি?
তুই মেরেছিস? দরজার বাইরে আবছা অন্ধকারে সজলের লম্বাটে এবং চওড়া চেহারার ছায়াটার দিকে তাকিযে হঠাৎ যেন তৃষার শরীর কেঁপে ওঠে শীতে। ভয়েও কি?
৫৮. কুঠে সামন্তর বাড়িটা
কুঠে সামন্তর বাড়িটা এখন রোদে হাওয়ায় হাসছে। বাড়ির দাঁত নেই যে হাসবে। তবু কেন যেন ঠিক তাই মনে হয় নিতাইয়ের। চালে খড়, মাটির দেয়ালগুলোয় নতুন পলেস্তারা, উঠোনের দড়িতে একটা-আধটা শাড়ি কাপড় টাঙানো, বড় সুখের চেহারা বাড়িটার। রান্নাঘর থেকে রোজ ধোয়াও ওঠে।
সকালের দিকটায় প্রায়দিনই নিতাই এসে বাইরে থেকে হাঁক দেয়, কই গো!
কুঠে সামন্তর বউ এ সময়ে বাড়ি থাকে না। ধানকলে যায়। তো তার খোঁজে আসেও না নিতাই। যার খোঁজে আসে সে ভাইবোন সামলে, রান্না চাপিয়ে ভারী ব্যস্ত। তবু একটু হাসিপানা মুখ করে বেরিয়ে এসে বলে, এসো নিতাইদা।
দাদা ডাকটা নিতাই নিজেই শিখিয়েছে। প্রথমটায় কাকা ডাকতে লেগেছিল। সে ডাকটা নিতাই পছন্দ করেনি।
জড়িবুটির পোঁটলা পাশে রেখে নিতাই উঠোনে শীতের রোদে ঠ্যাং মেলে বসে যায়। জটার ঘা শুকোলেও উকুনের উৎপাত বড় হয়েছে। খাবলে মাথা চুলকোতে চুলকোতে নিতাই সব খোঁজ-খবর নেয়, কী রান্না হচ্ছে? কেমন আছে সবাই? তারপর নিতাই নিজের কথা পেড়ে ফেলে, কালও এসেছিল ন-পাড়া থেকে একদল! বলে মন্ত্র দাও। কলা মুলো টাকা চাল ডাল পাহাড়-প্রমাণ এনে ফেলেছে। আমি বলি কী, মন্ত্র দেওয়া কী মুখের কথা! নিলেই হল? দিলেই হল? যাও গিয়ে তিন দিন হবিষ্যি কবো, মন পবিত্র করো, কালীর থানে পুজো চড়াও, তারপর দেখা যাবে। তা কে শোনে কার কথা! পা দু’খানা ঠেসে ধরল।
