চিনতে পারছেন?
রঘু স্যাকরা না!
যাক বাবা বাঁচালেন। লোকে বলে শ্রীনাথ চাটুজ্জেকে ওষুধ করে মাথা বিগড়ে দেওয়া হয়েছে। তাই ভয়ে ভয়ে ছিলাম।
কথাটা কী?
কথা আবার কী? এভাবে ফুর্তিবাজ মানুষ বাঁচে কখনও? চেহারায় তো সাতবুডোর ছাপ ফেলে দিয়েছেন।
শরীরটা ভাল নেই।
দিব্যি আছে। একটু চাঙ্গা হওয়া দরকার শুধু। দেখবেন তেড়েফুঁড়ে স্বাস্থ্য এসে যাবে। কোষ্ঠ পরিষ্কার হবে। চোখে জ্যোতি বাড়বে।
দুর!
আপনার মুখে দুর শুনলে বল মা তারা দাঁড়াই কোথা! চলুন না একটু চেখে আসবেন। ভাল না লাগলে মাথার দিব্যি দিয়েছে কে!
শ্রীনাথ রঘু স্যাকরার দিকে অর্থহীন চোখে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার ভিতরে মদ খেয়ে ফুর্তি করার কোনও উৎসাহই নেই। তবু মনে হল, এই নেতিয়ে পড়ার হাত থেকে রেহাই মিলতেও পারে।
শ্রীনাথ ধুতির কেঁচাটা ভাল করে এঁটে হাঁচোর-পাঁচোর করে বাঁশের বেড়াটা ডিঙিয়ে গেল।
ষষ্ঠীতলায় ম্যাচ খেলে এক দঙ্গল ছেলে চৌমাথা দিয়ে ফিরছে। হাতে হাতে ক্রিকেটের সরঞ্জাম। ছ’জনের হাতে ছ’টা স্টাম্প, দু’জনের কাঁধে ব্যাট, একজন বলটা লুফছে। ছ’জনের হাতে ছ’টা প্যাড, তাই দিয়ে মাঝে মাঝে পেটাপেটি করছে নিজেদের মধ্যে আপসে। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে সবাই। মাঝ বরাবর সকলের চেয়ে একমাথা উঁচু এবং দু’গুণ স্বাস্থ্যবান সজল। চোখে-মুখে আত্মপ্রত্যয় এবং গাম্ভীর্য। চাউনিতে কোনওরকম ভয়ের ছায়া নেই। দঙ্গল থেকে তাকে চোখের পলকে আলাদা করে চেনা যায়।
চৌমাথার বটতলায় গদাই নামে রোগা চেহারার একটা ছেলে বসে ছিল। দঙ্গলটাকে দেখেই সে দৌড়ে গেল।
সজল! সজল! তোর বাবাকে একটু আগে রঘু স্যাকরা নিয়ে গেল।
মুহূর্তে দঙ্গলটা ঘিরে ধরে গদাইকে, কোথায় নিয়ে গেল? কেন নিয়ে গেল?
গদাই উঁচু স্বরেই বলে, আমি ফলো করেছিলাম। স্টেশনের ওপাশে রামলাখনের বস্তিতে গিয়ে ঢুকল। রঘু স্যাকরা সজলের বাবার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ঢুকল।
সজলের মুখে ভ্রুকুটি। মুখ থমথম করছে। বাবার যে মাথাটার ঠিক নেই ইদানীং তা সে একটু-আধটু টের পায়। তবু বাবা অনেক ভাল হয়ে গেছে এখন। মদ খায় না, রাত করে ফেরে না। বাবার সঙ্গে তার এখন খুব ভাল সম্পর্ক।
চারদিকে দঙ্গলটায় ফিসফাঁস চলছে। সকলের চোখ সজলের দিকে। লিডার যা বলবে তাই হবে।
সজল হাত বাড়িয়ে একটা ছেলের হাত থেকে একটা স্টাম্প নিয়ে নিল। বলল, শালা রঘু স্যাকরা আবার আমার বাবাকে খারাপ করছে। দেখাচ্ছি শালাকে।
প্রশ্ন উঠল, রামলাখন যদি লাঠি নিয়ে বেরোয়?
সজল গম্ভীরভাবে বলে, ক’টা লাঠি আছে ওর? আমরা এতগুলো আছি কী করতে?
চল!
আর কেউ কথা বলে না। সজলের পিছু পিছু নিঃশব্দে সবাই এগোয়। একটু ভয় পাচ্ছে তারা। একটু দ্বিধা আছে। তবে সজল আছে সামনে। একটা মজাও তো হবে। রামলাখনের ঝোপড়ায় মদ বিক্রি হয়, মেয়েমানুষের নাচ হয়, তারা শুনেছে। জায়গাটা একবার দেখাও হবে। সজলের পাগলা বাপটা কী করে তাও দেখা যাবে।
স্টেশন পেরিয়ে খালটার ধারে নেমে একটু এগিয়ে দঙ্গলটা থেমে গেল।
সজল মুখ ফিরিয়ে বলল, বাইরে থাকিস। আসছি।
লক্ষ্মীছাড়া চেহারার একটা বাচ্চা মেয়ে এক পাল হাঁস তাড়িয়ে নিয়ে উঠোনে ঢুকছিল। সজল তার পিছু পিছু ভিতরে পা দিল। কোথায় অনেকগুলো মুরগি ডাকছে কু কু করে। উঠোনের তিনদিকে তিনখানা মাটির ঘর। সব ক’টার চালেই লাউ ফলে আছে। উঠোনের এক কোণে গোটা দুই কাদামাখা মস্ত শুয়োর প্রাণপণে চিল্লাছে। চারদিকে বদ্ধ বাতাসে বিশ্রী পচা কটু একটা গন্ধ।
এক পলক চেয়েই কোন ঘরটায় বাবা আছে তা আন্দাজ করে নিল সজল। কোনও দ্বিধা এল না, বুক কাপল না, ভয় করল না, বরং অসহ্য রাগ আক্রোশে জ্বলতে জ্বলতে সে এক লাফে বারান্দায়। উঠে নিচু দরজাটা দিয়ে ভিতরে ঢুকল।
ভিতরের দৃশ্যটা প্রথমে ভুতুড়ে বলে মনে হয়। নিবু নিবু টেমির আলোয় কিছুই দেখা যায় না। আবছা ছায়া-ছায়া জনা তিন-চার লোক বসে আছে চ্যাটাইতে।
সজল বোমাফাটানো গলায় গর্জন করল, বাবা!
লোকগুলো চমকে চায়। গেলাস থেকে মদ চলকে পড়ে।
কে রে বাবা ডাকে!—–কে যেন মোদো গলায় বলে।
একদম কাছেই চ্যাটাইয়ের ওপর বসে থাকা কুঁজো মানুষটা মুখ তুলে চেয়ে থাকে।
বাবা!–আবার গর্জন করে সজল।
কুঁজো লোকটা অবাক হয়ে বলে, সজল! এই তো আমি এখানে! আয়, কী চাস?
সজল হাতের স্টাম্পটা এত জোরে চেপে ধরে যে গাঁটগুলো ব্যথা করে ওঠে। সে হামাগুড়ি দিয়ে নিচু হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকায়, কে তোমাকে এখানে এনেছে?
কেউ না। চল যাই।–বলে ওঠার চেষ্টা করে শ্রীনাথ। হাতের গেলাসটা সামনের লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, এটা তুমিই মেরে দাও রঘু। আমার ছেলে এসে গেছে, আমি উঠি।
লোকটা খুব ছোট চোখে সজলকে নজর করছিল। ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করছে।
ওই লোকটা তোমাকে এনেছে, বাবা! রঘু স্যাকরা না?
আমাকে! আমাকে নিয়তি এনেছে। ও নিমিত্ত মাত্র।
কিন্তু তত্ত্বকথা শোনার মতো মেজাজ নেই সজলের। হামাগুড়ি দেওয়া অবস্থাতেই সে হাত বাড়িয়ে লোকটার র্যাপার গলার কাছে মুঠো করে ধরে এক হ্যাঁচকা টানে খাড়া দাড় করাল। পরমুহূর্তেই ফটাস করে তার হাতের স্টাম্পটা লোকটার হাঁটু ভেঙে দিল প্রায়।
বাইরে এসো শালা, এসো বাইরে! দেখাচ্ছি।
রামলাখন অদূরেই দাঁড়িয়ে। স্থির চোখে দেখছে। কিন্তু খদ্দেরকে বাঁচাতে সে এক পা-ও এগোল, একটি শব্দও করল না। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা-বলে সে বিপজ্জনক মানুষকে চিনতে পারে আজকাল। শ্রীনাথবাবুর এই ছেলেটা যদিও বাচ্চা কিন্তু এর চেহারাই বলে দিচ্ছে যে, এ একদম খুনি। রেগে গেলে দুনিয়া ওলট-পালট করে দিতে পারে।
