তৃষা বাস্তবিকই তাই। এত সুন্দর লোভনীয় চেহারা থাকা সত্ত্বেও তৃষার দেহের কোনও চাহিদা নেই। কোনওদিনই তার যৌন মিলনের কোনও আকাঙ্ক্ষা ছিল না। বিয়ের পর সে অত্যন্ত নিরুত্তাপভাবে এবং খানিকটা বিরক্তির সঙ্গে দৈহিক মিলনটা মেনে নিয়েছিল মাত্র। তবে কোনওদিনই নিজে সাগ্রহে অংশ নেয়নি। কোনওদিন ওতে কোনও তৃপ্তিও বোধ করেনি সে। এ যেন স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রতিদিন ব্যায়াম করার মতোই একটি কর্তব্য কাজ। কিন্তু মেয়েমানুষের শরীরের যে বিপুল চাহিদা জগতে বিদ্যমান সে সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল টনটনে। তাই কাম সম্পর্কে অতি শীতল মনোভাব সত্ত্বেও এই দেহ সে কাজে লাগিয়েছে কখনও-সখনও। তেমনি মনোভাব নিয়েই সে মল্লিনাথকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। দেহের শীতলতার জন্যই সে দেহের সতীত্ব সম্পর্কে উদাসীন। মল্লিনাথকে সে তাই বাধা দেয়নি। এমনকী দেহ দিয়ে মল্লিনাথকে খুব বেশি কিছু দেওয়া হয়েছে বলে কখনও ভাবেওনি সে। উপরন্তু তাই সে অবিবাহিত মল্লিনাথকে দিয়েছিল স্নেহ, সেবা ও সঙ্গ। শেষ জীবনটা মল্লিনাথ তার দয়ায় উদ্ভাসিত আনন্দে কাটিয়ে গেছে। মল্লিনাথের বিষয়-সম্পত্তি ভোগ করতে তাই কোনও সংকোচ নেই তৃষার। সে জানে মল্লিনাথের আপনার জন বলতে ছিল একমাত্র সে-ই। লোভী শকুনরা হেঁ মারতে চেয়েছিল বটে, কিন্তু তৃষার অধিকার অনেক বেশি গভীর।
তাই চারদিকে চেয়ে সংসারের সম্পন্ন দৃশ্যগুলি দেখে তৃষা নিশ্চিন্ত থাকে না, তৃপ্তি বোধ করে। গল্পটা তো অত সরল নয়। কিন্তু লড়াইটা সে খুব উপভোগ করে।
মুরগির ঘর থেকে লক্ষ্মণ ঝিমুনি রোগে ধরা তিনটে লেগহর্ন মুরগি বের করে এনে বলল, এ তিনটের হয়ে গেছে মা, আরও গোটা পাঁচেক কাল-পরশুই যাবে।
তৃষা নিরাসক্ত গলায় বলে, পাঠশালার মাঠে গর্ত খোড় গে। আমি যাচ্ছি।
লক্ষ্মণ মুরগি তিনটের পা বেঁধে তৃষার অদূরে উঠোনে ফেলে রেখে শাবল নিয়ে চলে যায়। তৃষা আবার তার হিসেবের খাতায় ঝুঁকে পড়ে। মুরগিগুলো নড়ে না, শুধু বসে বসে ঝিমোয়।
হিসেব শেষ করে উঠে পড়ে তৃষা। কাজের অন্ত নেই। কাজ ছাড়া থাকতে ভালবাসে না সে। খাতাটা ঘরে রেখে আসতে না আসতেই লক্ষ্মণ এসে পড়ে।
গর্ত হয়ে গেছে, মা। চলুন।
পাঠশালা বলতে আসলে এখন কিছুই নেই। মল্লিনাথ ভাল ভেবে তার জমির মধ্যেই পাঠশালা খুলতে জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছিল। বাঁশের বেড়া আর টিনের চালওলা খানকয়েক ঘরও উঠেছিল এবং জনা বিশ-চল্লিশ পড়ুয়া আর তিন-চারজন মাস্টারমশাইকে নিয়ে একটা পাঠশালা চালুও হয়েছিল। তবে পাঠশালার জমি কতটা হবে তা চিহ্নিত করে রাখেনি মল্লিনাথ, লিখিত কোনও দলিলও ছিল না। তৃষা সাকসেসন পাওয়ার পর পাঠশালার জমি নিয়ে দাঙ্গা লাগার উপক্রম। মাস্টারমশাই বা ছাত্ররা নয়, কোমর বেঁধে বাগড়া দিতে এল স্থানীয় লোকজন। তাদের পান্ডা ছিল অল্পবয়সী এক ছোকরা রাজনৈতিক নেতা। তার তেজ দেখবার মতো। ছোকরা আলটিমেটাম দিয়ে বলল, তিন বিঘে জমি ছেড়ে দিতে হবে। নইলে ও জমি আপনি কোনও কাজে লাগাতে পারবেন না। আদালতের রায় পেলেও না। গণ্ডগোল আরও গাঢ় হয়ে উঠল ক’দিনের মধ্যেই। সমস্ত এলাকার লোক তুষার বিরুদ্ধে। এমনকী পাঠশালার পাশ দিয়ে বাড়ির লোকের যাতায়াতের পথ। একদিন কাঁটাতারের ব্যারিকেড তুলে বন্ধ করে দিল বিরুদ্ধপক্ষ। পুলিশের কাছে গিয়ে কোনও লাভ হয়নি।
এখন এই সকালের রোদে জারুল আর শিমুলের দীর্ঘ ছায়া, লম্বা ঘাসের জমির স্নিগ্ধ শ্যামল গালিচা, ইস্কুল ঘরের নিস্তব্ধতা যে শান্তির ইঙ্গিত দেয় গল্পটা অত সরল নয় মোটেই। দুঃসহ মানসিক জ্বালা, রাগ, বিদ্বেষ, অসহায় অপমান কতদিন ধরে নীরবে সহ্য করতে হয়েছিল তাকে। সে তবু গো। ছাড়েনি, হাল ছাড়েনি, প্রতিপক্ষের কোনও দাবিই মেনে নেয়নি। শুধু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে মনে মনে স্থির করল, ছোকরা রাজনৈতিক নেতাটিকে হাত করতে পারলেই বোধহয় হবে। সেটাও একটা দুরন্ত ঝুঁকি বটে। জল এত দূর গড়িয়েছিল যে, একজনকে হাত করলেই সেটা মিটবে এমনটা মনে হচ্ছিল না। তবু ঝুঁকি নিয়েছিল তৃষা।
মদন ঠিকাদারই ছিল একমাত্র নিরপেক্ষ লোক। ঝুট ঝামেলায় নেই, আপনমনে কাজ করে, টাকা কামায়, গম্ভীর, শান্ত, নিরুদ্বেগ মানুষ। হয়তো তৃষাদের প্রতি তার খানিকটা অপ্রকাশ্য সহানুভূতি ছিল। তাকে দিয়েই একদিন ছোকরা নেতা শুভঙ্করকে নেমন্তন্ন করাল তৃষা। পোলাও, মুরগি, পাকা মাছ দিয়ে এলাহি খাওয়া। ছোকরা নির্লজ্জের মতো এল এবং খেল। যাওয়ার সময় যে পাঁচশো টাকা একটা ন্যাকড়ার থলিতে ভরে হাতে দিল তৃষা, তাও নিল নির্বিবাদে, যেন পাওনা টাকা। হাসিমুখে চলেও গেল। তৃষার মন বলল, চালে ভুল হল না তো? ভুলই হয়েছিল। কারণ গণ্ডগোল মিটল না। কোনও ফয়সালা হল না। সেই ছোকরা সামনা-সামনি আর তড়পাত না বটে, কিন্তু আড়াল থেকে উস্কানি দিত। আবার সে নেমন্তন্ন খেতে এল এবং যাওয়ার সময় বেশ স্পষ্ট গলাতেই বলল, হাজারখানেক দিন। পার্টিফান্ডের জন্য চাইছি। এবার কথা দিচ্ছি, মিটে যাবে।
দাঁতে দাঁত চেপে তাও দিয়েছিল তৃষা। ফলে সামনাসামনি লড়াই বন্ধ হয়ে গেল বটে, কিন্তু জমির গণ্ডগোল মিটল না। শুভঙ্কর অত্যন্ত উগ্র এবং ঘোড়েল। এখানকার সব লোক, মায় পুলিশ পর্যন্ত তাকে ভয় খায়। মাঝে মাঝেই সে আসত এবং নির্লজ্জের মতো টাকা নিত। দিতেও হত তৃষাকে। তবে তৃষা প্রতিটি দেওয়া পয়সার হিসেব রাখত। সুযোগ পেলে সুদে-আসলে উসুল করবে বলে। যারা খুব দাপের সঙ্গে চলে তারা অন্যায় করলেও লোকে কিছু বলতে সাহস পায় না। শুভঙ্কর যা করত অত্যন্ত তেজ ও জোরের সঙ্গে করত। কারও পরোয়া করত না। বেশ বড়সড় অনুকারীদের। একটা দল ছিল তার। এ জায়গা শাসন করত তারাই। আশ্চর্যের বিষয়, তুষার কাছ থেকে শুভঙ্কর। যে টাকা নিত তা ঠিকঠাক তার পার্টি ফান্ডেই জমা দিত। এক পয়সাও এদিক ওদিক করত না। চুল থেকে পা পর্যন্ত সে ছিল রাজনীতির মানুষ। তার ব্যক্তিগত কোনও দুর্বলতা আছে কি না তা অনেক খুঁজেছে তৃষা। আর কিছু না হোক কাঁচা বয়সের ছেলেদের মেয়েমানুষ সম্পর্কে কৌতূহল তো থাকেই।
