শ্রীনাথ বসতে এসে দেখল জায়গাটায় আর একজন বসে। তার বাবা দীননাথ।
দীননাথের সঙ্গে শ্রীনাথের বহুকাল দেখা নেই। তাই দীননাথ হাঁ করে ছেলেকে দেখলেন অনেকক্ষণ। এই কি তার মেজো ছেলে শ্রীনাথ? হরি হে! গাল তোবড়ানো, মাথার শেষ ক’গাছি চুল শনের নুড়ি, চোখ ঘোলাটে। এটা কি শ্রীনাথ, সত্যি?
বাবা। ভাল আছেন তো?
ভালই। কিন্তু তোমাকে তো ভাল দেখছি না। কী হয়েছে? সবাই বলে বটে তোমার অসুখ করেছে। কিন্তু কী অসুখ বলে না।
স্ট্রোক মত হয়েছিল একটু। সেরে গেছে।
সাবধানে থেকো। তোমার স্ট্রোক হওয়ার বয়স তো নয়!
ঠিক স্ট্রোক নয়। জানি না। ডাক্তাররা কিছু স্পষ্ট করে বলে না।
বলবে কী! জানেইনা। আজকালকার ডাক্তাররা সব পেনিসিলিন চিনেছে। যাই হোক দেয় ঠুকে। মরলে মরল, বাঁচলে বাঁচল। দু’মাসের বাচ্চা থেকে আশির বুড়ো অবধি সবাইকে এক ওষুধ। বোসো, ভাল করে পা তুলে বোসো। চাদরে হাঁটু ঢেকে নাও, যা মশা এদিকটায়!
শীতকালে একটু মশা হয়।
বুলুর বাড়িতে মশা ছিল না। শীতটা কলকাতায় এত চেপে পড়েও না। এই দুটো মাস ওর কাছে থেকে আসতে পারলে ভাল হত। কতকাল আসে না ছেলেটা।
শ্রীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, বাবা, আমাকে একটু শাসন করবেন তো মাঝে মাঝে।
শাসন!–বলে দীননাথ হাঁ করে শ্রীনাথের দিকে চেয়ে থাকেন, শাসন করব! বলো কী!
কেন, সেই যে ছেলেবেলায় যেমন করতেন!
সে তখন ছোট ছিলে করেছি। এখন আবার শাসনের কথা ওঠে কীসে?
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, ঠিক শাসন নয় বটে। মানে কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় তা তো বুঝতাম না তখন। আপনি বা মা বলে দিতেন। আমার এখন আবার তেমনি ইচ্ছে করে। কোনটা ধর্ম কোনটা অধর্ম সব একজন কেউ এসে চিনিয়ে দিক।
তোমার কথাবার্তা ভারী উল্টোপাল্টা লাগছে। এসব তো এখন তুমি নিজেই বুঝে নেবে।
বুঝতে পারছি না বলেই বলছি। আমাকে সৎ পরামর্শ দেওয়ার কেউ নেই। অথচ আয়ুও তো ফুরিয়ে এল।
বলো কী? এর মধ্যে আয়ু ফুরোনোর কী হল?
বাঃ! আমাকে স্লো পয়জন করা হচ্ছে না?
পাগল হয়েছ! বউমাকে ডেকে সব কথা খুলে বলো। উনি বুঝবেন। আমি এসব বুঝতে পারছি না।
শুনুন! সজল আমার ছেলে। ছেলে তো?
সজল তোমার ছেলে নয় তো কার?
শ্রীনাথ ওপর-নীচে জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলে, আমারই। কিন্তু লোকে নানা কথা বলে মাথা ঘুলিয়ে দেয়।
লোকে মাথা ঘুলিয়ে দেবে কেন? কারা তারা?
আছে চারদিকে। আপনি শুধু বলুন, সজল আমার ছেলে?
তোমার ছেলেই তো!
সজলকে আমিও সেই কথা বলেছি। রোজ বলি। তুই আমার ছেলে।
ওসব কথা ভেবো না। মরার কথাও নয়। বুড়ো বয়সে আর-একটা পুত্রশোক আমার সহ্য হবে না। তুমি আজকাল চাকরিতে যাচ্ছ না?
আনমনে শ্রীনাথ কপিক্ষেতের ওপরে স্থির থম-ধরা বাতাসে ধোঁয়ার একটা ভাসন্ত স্তরের দিকে চেয়ে ছিল। চোখ না ফিরিয়েই বলল, আপনার বউমা বলছে আমাকে দূরে এক জায়গায় পাঠাবে। সেখানে চাষবাস দেখব। একা থাকব।
তুমিও তাই চাও নাকি?
আগে চাইতাম। আজকাল দূরে যেতে ভয় করে।
চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছ?
না। তবে ছাড়তে তো সময় লাগবে না।
এ বাজারে চাকরি দুষ্প্রাপ্য। ভেবেচিন্তে ছেড়ো।
চাকরিটা কোনও প্রবলেম নয়।
এবার দীননাথ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, প্রবলেম যে কী তাই তো মাথায় ঢোকে না। আমাদের আমলে জীবন ছিল সরল। সব বোঝা যেত। তোমাদের আমলে যত পাচঘোচ।
শ্রীনাথের চাদরে একটা কাক নোংরা ফেলেছে। সে ওপর দিকে চেয়ে বিশাল গাছটা দেখছিল। দাদা মল্লিনাথ এ গাছটা উপড়ে এনেছিল তায়েব নামে একটা লোকের উঠোন থেকে। তায়েব মল্লিনাথের মুরগি চুরি করেছিল, তারই পালটি। মল্লিনাথও পাগল কম ছিল না। বারো-চোদ্দোজন জোয়ান ধরাধরি করে শেকড়ছেড়া গাছটা এনে গর্ত খুঁড়ে দাড় করিয়ে দিল এখানে। বাঁচার কথা ছিল না, কিন্তু বেঁচে গেছে। এই গাছটা দিয়েই সেবার মল্লিনাথের বন মহোৎসব শুরু। তারপর বিস্তর গাছগাছালি লাগিয়েছিল। কিন্তু এই গাছটাকেই ভালবাসত সবচেয়ে বেশি। একটা মস্ত পাথর এনে ফেলেছিল তলায়। সেটার ওপর মাঝে মাঝে ঝুম হয়ে বসে থাকত এসে। বলত, এ হচ্ছে বিবেকানন্দ রক-এর মতো মল্লিনাথ রক। এখানে বসেই আমার একদিন রিয়ালাইজেশন হবে।
মহানিমের শুকনো পাতা একটি-দুটি খসে পড়ছে। ভারী সুন্দর তাদের পড়া। বাতাসে ঘুরপাক খায়, কখনও খাড়া হয়, কখনও আড় হয়। একটু ডাইনে বাঁয়ে হেলাদোলা করে। তারপর প্রজাপতির মতো অহংকার নিয়ে ঘাসের ওপর বা শানে বা শ্রীনাথের র্যাপারে আলগোছে বসে। বেশ লাগে দেখতে।
দীননাথ বললেন, আহ্নিকের সময় হল, উঠি।
হুঁ।–বলে শ্রীনাথ।
দীননাথ উঠলেন। উঠতে উঠতে বললেন, বুলু তোমার ছোট ভাই। তার এত বড় মিসহ্যাপ হয়ে গেল, তোমরা কেউ গেলে না!
মিসহ্যাপ? কিসের মিসহ্যাপ?
বউমার যে মরা বাচ্চা হল।
বেঁচেছে। জ্যান্ত হলে কষ্ট পেত। বড় কষ্ট বেঁচে থাকায়।
কী যে বলো সব, ঠিক নেই।
দীননাথ চলে যান।
চুপ করে বসে থাকে শ্রীনাথ। তার ডান দিকে বাড়ির ছাদের ওপর থেকে সূর্য পাটে বসে। ছায়া ঘনায়। শীত সাপের মতো শরীর বেয়ে উঠে আসে।
দুরে বেড়ার ওধারে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ। এবার গলা খাঁকারি দিল। শ্রীনাথ তাকাল না।
একটু বাদে চাপা ডাক এল, শ্রীনাথবাবু! ও শ্রীনাথদা!
কে?— ম্লান স্বরে শ্রীনাথ জিজ্ঞেস করে।
শুনুন না! এই বেড়ার ধারে আসুন একটু।
শ্রীনাথ চটিতে পা গলিয়ে ওঠে। ক্ষেতের জমি ডিঙিয়ে এগিয়ে যায়।
