কারা জানো?
জানি।
বড় দমে গেল শ্রীনাথ। ধরা পড়েনি অথচ তৃষা তাদের জানে। এর একটাই পরিণতি দাঁড়াতে পারে। পুলিশ ধরার আগেই তৃষার লোকেরা তাদের ধরবে। আবার চাদরের রংটার দিকে তাকায় শ্রীনাথ। যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক অভিনয় করার চেষ্টা করতে করতে শ্রীনাথ যা বলতে চায় না, তাই বলে গেল, ছি ছি কী কাণ্ড! বাড়িতে ঢুকে অবলা মেয়েমানুষকে বোমা মারা! বেত মারা উচিত। ধরে চাবকানো দরকার।
বলতে বলতে চোখ বুজে থাকে শ্রীনাথ।
তৃষা বলে, ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। পুলিশ আছে, আইন আছে।
মাথা নেড়ে শ্রীনাথ মনে মনে বলে, তুমিও আছ।
তৃষা নিজের কথার খেই ধরে রেখে বলে, এখন বরং অন্য একটা জরুরি কথা বলে নিই। চিত্রাব জন্য একটি ভাল পাত্র পাওয়া গেছে। এলাহাবাদেরই ছেলে। দিদি আমাদের মত চেয়ে চিঠি দিয়েছে।
কার পাত্র?
চিত্রার–আবার কার?
চিত্রার বিয়ে! চিত্রা! তার বিয়ে দেবে এখনই? বলো কী?
চিত্রার বয়স কত হল খেয়াল আছে?
শ্রীনাথ বেকুবের মতো বলে, কত হবে? তেরো! চৌদ্দ।
তোমার মাথা। আঠারো চলছে।
শ্রীনাথ তবু ব্যাপারটা বুঝতে পারে না, তা হলেও বিয়ের বয়স নয়।
আমার বিয়ে হয়েছিল আরও কম বয়সে। ষোলো ভাল করে পেরোয়নি তখনও। মনে আছে?
শ্রীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার চোখ বোজে।
তৃষা বলে, তবু মানি বিয়ে আরও কদিন পরে দেওয়া যায়। কিন্তু মেয়ের বড় বাড়ন্ত গড়ন। পাত্রটিও ভীষণ ভাল। সুযোগটা ছাড়া উচিত হবে না।
তা বটে।
তোমার মত কী?
আমার মত!–শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, আমার মত কী আবার! চিত্রাকে তো মনেই পড়ে না, সে যে আমার মেয়ে তাই তো ভুলে গেছি।
তবু তো মেয়ে।
তা ঠিক। শ্রীনাথ চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ বলে, বিয়ের আগে ওকে একবার আনাবে? দেখব! ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
তৃষা একটু অবাক হল। কিন্তু সহৃদয় গলায় বলল, দেখবে? তা হলে যাও না, এলাহাবাদ থেকে কদিন ঘুরে এসো। ওরা খুশি হবে।
এ কথায় দপ করে নিভে গেল শ্রীনাথ। ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, না না। আমি কোথায় যাব? আমি পারব না অত দূরে যেতে।
কেন?
আমার ইচ্ছে করে না। ভয় করে। অনেক দূর।
তৃষা দাঁতে ঠোঁট চাপল। শ্রীনাথের ভাঙচুর দূর থেকে সে ভাল করে বোঝেনি। এখন যা দেখল, তা ভয়ংকর। এতটা সে কখনও ভাবেনি।
শ্রীনাথ চোখ বুজে আপন মনে নিঃশব্দে ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়ছিল।
তৃষা সিঁড়ি দিয়ে বারান্দা থেকে নেমে গেল। চলে যেতে যেতে একবার মুখ ফিরিয়ে আস্তে করে বলল, আসছি।
শ্রীনাথ সেকথা শুনতে পেল না, জবাবও দিল না।
তুমি কেন জোরে হাঁটছ না?
আমি অত জোরে পারি না।
পারো। নিশ্চয়ই পারো। ইচ্ছে করে হাঁটছ না।
না। মাথা নাড়ে শ্রীনাথ, পারি না। আমার হাঁফ ধরে যায়।
তুমি কিন্তু বুড়ো হওনি। তোমার অসুখও সেরে গেছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস আপনা থেকেই ঝরে গেল শ্রীনাথের।
সজল বাবার মুখের দিকে তাকাল। আজকাল বাবার মুখের দিকে তাকাতে তাকে বেশি মাথা উঁচু করতে হয় না। তার মাথা শ্রীনাথের কান ছুঁয়েছে। ক’দিনের মধ্যেই মাথায় মাথায় সমান হয়ে যাবে। তারপর শ্রীনাথকে ছাড়িয়ে উঠবে সে।
সজল বলল, রোজ যদি আসন করো তবে সব সেরে যাবে।
যোগাসন?
যোগাসন। বড়কাকা অনেক আসন জানে।
তুইও কি আসন করিস?
করি। আরও কত কী করি। ফ্রি হ্যান্ড, বক্সিং, কুংফু…।
গুন্ডা হবি নাকি?
না, গুন্ডাদের ধরে ধরে ঠ্যাঙাব।
আজকাল গুন্ডাদেরই সম্মান। সবাই তাদের খাতির করে।
সজল এ কথায় হাসল।
মাঠের ধারে রোজই এক গাছতলায় শ্রীনাথকে বসিয়ে রেখে সজল ক্রিকেট খেলে। শ্রীনাথ নড়ে চড়ে না। চুপটি করে বসে আকাশপাতাল ভাবে। খেলা শেষ হলে সজল বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফেরে।
তুমি আবার কবে থেকে অফিসে যাবে, বাবা?
রোজই ভাবি, কাল যাব। আর যাওয়া হয় না। শরীরটা ভাল নেই।
তোমার চাকরি যদি নট হয়ে যায়?
তা যাবে না। ওরা আমাকে খুব ভালবাসে।
প্রকাণ্ড মাঠের মধ্যে নেমে গেল সজল। একটা অশ্বত্থ গাছের তলায় ঘাসের ওপর বসে থাকল শ্রীনাথ। দুর্বল, নির্জীব। তার ব্লাড সুগার ধরা পড়েছে। কিডনি ভাল না। লিভার ভাল না। কিন্তু সেসব তার এই নির্জীবতার কারণ নয়, শ্রীনাথ জানে। তাকে শেষ করে দিচ্ছে বিষ। আস্তে আস্তে শরীর ভরে যাচ্ছে বিষে। রেহাই নেই, পরিত্রাণ নেই।
ফেরার পথে সে বলল, শোন, আজকাল আমাকে কেউ কোনও খবর দেয় না। তুই একটা খবর কিন্তু আমাকে দিস।
কী খবর বাবা?
সেই যারা তোর মাকে বোমা মেরেছিল তারা যদি ধরা পড়ে তা হলে আমাকে জানাস।
সজল অবাক হয়ে বলল, তাদের তো ফাঁসি হয়ে গেছে।
যাঃ!–বলে ধমক দেয় শ্রীনাথ।
সজল হাসে, ধরা পড়লেই ফাঁসি হবে। আর ধরা তো পড়বেই।
সবাই কি ধরা পড়ে?
একজনকে কালিন্দীপুরে দেখেছে সখারামদা।
তারপর?
তাকে ফলো করা হচ্ছে কাল থেকে। আজকালের মধ্যেই অ্যারেস্ট হয়ে যাবে।
তুই জানলি কী করে?
মায়ের কাছে সব খবর আসে। তুমি মারদাঙ্গাকে ভয় পাও, বাবা?
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, মারপিটকে ঠিক ভয় পাই না। ভয় পাই তোদের। পৃথিবীতে আমার কোনও আপনজন নেই, এ কথা ভেবে মরতে বড় কষ্ট হবে।
আমরা আপন নই তোমার?
তোদের সঙ্গে যে আমার মেলে না। আমি খারাপ, তোরাও খারাপ। দু’পক্ষ দু’রকমের খারাপ। মেলে না যে! কী করে আপন হবি?
বাবা, একটা কথা বলবে?
কী বল তো!
তুমি আমার বাবা নও?
৫৭. একদিন বিকেলে দুই বুড়োর দেখা
একদিন বিকেলে দুই বুড়োর দেখা হল গাছতলায়। মহানিমের বড় গাছ। বাগানের দক্ষিণ দিকে একটা পরিষ্কার জায়গায় গাছটা পুঁতেছিল মল্লিনাথ। তখন বন মহোৎসবের খুব ধুম। এখন সেই গাছের তলাটা বাঁধিয়ে দিয়েছে তৃষা। বিকেলের দিকে চমৎকার বসার জায়গা। দক্ষিণ দিকটা ফাঁকা রাখার জন্য ওপাশে অনেকটা জমি কিনে নিয়েছিল মল্লিনাথ। সে জমি তৃষার আমলে আরও বেড়েছে। শীতের সবজির চাষ হয়। এমনিতে ভুইকুমড়ো, না হয় চিচিঙ্গে এমনি কিছু না কিছু সর্বদাই ফলছে। তবে তাতে দৃষ্টির ব্যাঘাত হয় না। গাছতলায় বসলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। উদাস হয়ে বসে থাকা যায় অনেকক্ষণ।
