কাঠের চেয়ারে এভাবে কতক্ষণ বসে থাকতে পারে রোগা মানুষ?
এবার চমকাল শ্রীনাথ। তৃষা। তার সর্বাঙ্গে একটা অস্পষ্ট ভয়ের কাঁপুনি বয়ে যেতে থাকে। খুব অল্প অল্প করে বিষ ছড়িয়ে গেছে তার শরীরে। বিলম্বিত বিষ, কিন্তু অমোঘ। তার খাবারে, তার জলে, দুধে, তার ওষুধে পর্যন্ত। প্রতিবার ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে গিয়ে থেমে যায় সে। নিজেকে জিজ্ঞেস করে, খাব? এই বিষ! তার ভিতরে হতাশায় ভেঙে পড়া মানুষ প্রতিবার জবাব দিয়েছে, খাও, খাও, অনেক ভোগ করেছ জীবনে। মরতে তো হবেই। তাই খেয়েছে শ্রীনাথ। শুধু আয়ু নয়, বিষে আক্রান্ত তার আত্মবিশ্বাস, তার যৌনবোধ, তার মস্তিষ্ক, অনুভূতি। তৃষা বিষ চেনে। প্রয়োগের বিধিও জানে চমৎকার। বিষের প্রভাবেই বুঝি আজকাল তৃষা সকালে এলে সাপুড়ের মন্ত্রের মতো কাজ হয়, ফণা নেমে যায় শ্রীনাথের। ফণা নেমে যায়? না কথাটা ঠিক হল না। আজকাল সে আর ফণা তোলে কই?
শ্রীনাথের চাউনিটা খুব ভাল লাগল না তৃষার। চমকানোটাও লক্ষ করল। শ্রীনাথ কোনও দুয়ে কারণে তাকে ভয় পায় তৃষা জানে। তাই সে আজকাল শ্রীনাথের সামনে আসে না। ভাবে, বোমার সেই শক ওকে খানিকটা অস্বাভাবিক করে ফেলেছে। আপনা থেকেই সেরে যাবে। যায়নি যদিও।
দাঁড়াও, মালিটাকে বলি ইজিচেয়ারটা বারান্দায় দিয়ে যাক। বারান্দার ধারে গিয়ে তৃষা ডাকে, শ্রীপতি! এই শ্রীপতি!
খুব সংকোচের সঙ্গে শ্রীনাথ বলে, কিছু কষ্ট হচ্ছে না। বেশ আছি।
তৃষা গম্ভীর মুখটা ফিরিয়ে শ্রীনাথের দিকে চেয়ে বলে, না, ঠিক নেই।
শ্রীনাথ আর কিছু বলল না। শ্রীপতি দৌড়ে এসে ইজিচেয়ার বের করে রোদে পেতে দিল। শ্রীনাথ অস্বস্তির সঙ্গে সেটার ওপর আধশোয়া হল। চিত হয়ে ওপর পানে তাকিয়ে দেখল, তৃষাকে কত বিশাল বড় আর শক্তিময়ী দেখাচ্ছে। মাথাটা বারান্দার প্রায় ছাদে গিয়ে ঠেকেছে। দুই চোখে বুদ্ধির ধার আর ক্রুরতা ঝলমল করছে সকালের রোদে। গায়ের পশমি চাদরটার রং শুকিয়ে যাওয়া রক্তের মতো কালচে লাল, তাতে সবুজ আর হলুদ ফুলের এমব্রয়ডারি। কিন্তু এতেই প্রায় রাজেন্দ্রাণীর মতো দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওর পিছনেই রয়েছে শিকলে বাঁধা পোষা সিংহটা।
আজ বদ্রী তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে।
বদ্রী!–শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, কেন?
ও একটা ভাল জমির খোঁজ পেয়েছে। এক লপ্তে পাঁচ বিঘা।
জমির খোঁজ পেয়েছে। কিন্তু শ্রীনাথ বুঝতে পারে না তাতে তার কী।
তৃষা কোমল গলায় বলে, তুমিই তো ওকে জমির কথা বলেছিলে। বলোনি?
শ্রীনাথের মনে পড়ল। মাথা নাড়ল, যা বলেছিলাম। সে কতকাল আগে।
কতকাল আবার কী! বছরখানেক হবে।
তবু অনেক দিন। এখন জমি দিয়ে আমি কী করব?
তোমাকে কিছু করতে হবে না। তোক রেখে চাষ করাতে চাইলে করাবে।
বিষণ্ণ শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, তা তো আমি চাইনি। আমি ভেবেছিলাম নিজে চাষ করব, সঙ্গে লোকও খাটাব। ভেষজের চাষ তো সোজা নয়। ইচ্ছে ছিল জমির পাশে একটা কাচা ঘর তুলে থাকব।
তৃষা মৃদু স্বরে বলে, যদি তাই চাও তবে এখনও তো হতে পারে।
শ্রীনাথ মাথা নেড়েই যাচ্ছিল। বলল, আর কিছু করার নেই। আমার শরীর বিষে ভরে গেছে। আর বেশি দিন
তৃষা রাগল না। হতাশার একটা শ্বাস ফেলে বলল, আমি শুনেছি, তোমাকে স্লো পয়জন করা হচ্ছে বলে তুমি সন্দেহ করো।
আতঙ্কে প্রায় সাদা হয়ে শ্রীনাথ তুষার দিকে তাকায়। কিন্তু চোখে চোখ রাখতে পারে না। বেশিক্ষণ। আবার মাথা নেড়ে বলে, ঠিক তা নয়। সন্দেহ করার কিছু নেই। তবে কোনও কারণে আমার মধ্যে বিষ ঢুকেছে।
কে তোমাকে বিয দিতে পারে বলো তো! আমি?
শ্রীনাথ মনের দিক থেকে এতটাই দুর্বল যে এত স্পষ্ট কথা সহ্য করতে পারল না। বলল, ওই যে দেশি মদ খেতাম, হয়তো তাই থেকেই..
বলে তাকিয়ে বুঝবার চেষ্টা করল তৃষা কথাটা বিশ্বাস করেছে কি না।
তৃষা মৃদু স্বরেই বলল, তোমার মনের কথা তো জানি না। তবে যদি সন্দেহই থেকে থাকে তবে সেই সন্দেহ নিয়ে তোমাকে এখানে থাকতেও বলি না। বদ্রী যে জমিটার খোঁজ আনবে সেটা কেনো। একটা ছোট বাড়ি তৈরি করে থাকো সেখানেই। কেউ বাধা দেবে না।
এ কথাটাও ভয়ংকর। এক বছর আগে এই প্রস্তাব মাথায় তুলে নিত সে। তৃষার বন্দিত্ব থেকে মুক্তি–সে এক অদ্ভুত সুখচিন্তা ছিল তখন। আজ সে কথা ভাবতেও ভয় করে। একা পাঁচ বিঘা। জমি কোলে করে বসে থাকা। সে যাও বা দু’দিন বাঁচত তাও বাঁচবে না তা হলে। এরা বিষ দেয় বটে কিন্তু তবু ঘিরেও থাকে তাকে। একা থাকার কথা সে এখন ভাবতেও পারে না। একা হলেই সমস্ত পৃথিবীর ভার বুকে চেপে বসবে।
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, না না। থাকগে। এখন ওসব ভাবতে পারছি না। বদ্রীকে বারণ করে দিয়ো।
শ্রীনাথের শ্রীহীন বসে যাওয়া শরীরের দিকে চেয়ে সামলে গেল তৃষা, না হলে তার বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, বিষ তোমাকে কেউ দিচ্ছে না, বিষ তোমার মনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে।
মুখে তৃষা বলল, যা ভাল বুঝবে করবে। আমি তোমার যাতে ভাল হয় তাই চাই।
তৃষার চাদরটায় রোদ পড়েছে। ভয়ংকর সেই শুকনো রক্তের রংটা চোখে বড় লাগে শ্রীনাথের। ভিতরটা চমকে ওঠে বার বার। সে প্রায় অস্ফুট গলায় হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, সেই তারা ধরা পড়েছে?
কারা?
ওই যারা তোমাকে বোমা মেরেছিল!
এ কথায় তৃষার চোখ দুটো ঝলসে ওঠে হঠাৎ। কিন্তু মুখে অন্য কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না। স্বাভাবিক গলায় বলল, এখনও ধরা পড়েনি। তারা ফেরার।
