যায়। তবু আমার ইচ্ছে কেসটা তুমি ফাইল করো।
তবে টাকা দেবে?
ভেবে দেখব।
মণিদীপা অত্যন্ত গভীর বুক-খালি-করা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, চ্যাটার্জি শিলিগুড়ি থেকে ফোন করেছিল।
কবে আসছে!
কাল। তবে কাল তোমার সঙ্গে দেখা হবে না।
জানি। তুমি যাও।
আর একটা কথা বুনু, চ্যাটার্জি আমার টাকার অসুবিধের কথা সবই জানে। তুমি যে আমাকে রেশনে রেখেছ তা ও জানল কী করে? তুমি বলেছ?
আমি!—বলে যেন একটু অবাক হয় বোস। তারপর সত্যিকারের একটু হাসে, ইন ফ্যাক্ট তোমাকে টাকার ব্যাপারে কন্ট্রোল করার কথা ওই আমাকে প্রথম বলে। হি ইজ এ রিয়্যাল ফ্রেন্ড। ব্যাংকরাপটুসি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
দীপবাবু?
অবাক হওয়ার কিছু নেই। তুমি যখন আমাকে ফকির বানানোর মহান ব্রত নিয়েছিলে তখন আমার অবস্থা পাগলের মতো। অত টাকা আয় করেও কিছুই থাকে না। দীপনাথ ঠিক সেই সময়ে ইন্টারফেয়ার করে। আই অ্যাম গ্রেটফুল টু হিম।
মণিদীপা হাত মুঠো করে রাগে কাঁপতে কাঁপতে অন্ধের মতো, আচ্ছন্ন মাথায় নিজের ঘরে ফিরে এল।
তার কান্না আসে না সহজে। আজ এল। আসলে কান্না নয়। অসহায় দুর্দম রাগ তার ভিতরটাকে বিদীর্ণ করে দিল বুঝি। বালিশে মুখ চেপে ধরে নিজের শ্বাসরোধ করতে করতে হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে লাগল মণিদীপা।
৫৬. তৃষা তার ঘরের উত্তরের জানালা দিয়ে দেখছিল
তৃষা তার ঘরের উত্তরের জানালা দিয়ে দেখছিল। একটা ঝাপানো ফুলগাছের ইকড়িমিকড়ি চিকের মতো আড়াল করেছে জানালাটাকে। আর এবারকার হাড় কাঁপানো শীতের উত্তুরে হাওয়া এসে ডালপালায় হি-হি কাঁপুনি তুলছে মাঝে মাঝে। জানালাটা বন্ধ করতেই এসেছে তৃষা। বাইরে পাল্লার দিকে হাত বাড়িয়ে থেমে গেছে। দেখছে।
দেখছে একটা ভাঙাচোরা বুড়িয়ে যাওয়া মানুষের কাঠামো ভাবন-ঘরের বারান্দায় বসে আছে। কাঠের চেয়ারে। সকালের অঢেল রোদ আর অবারিত শীত হাওয়ায় রোগা মুর্তিটা নড়ছে কি? পড়ে যাবে না তো! লোকটা ঠিক বসেও নেই। যেন কেউ বসিয়ে রেখে গেছে। গলা পর্যন্ত একটা কুটকুটে মোটা লোহি আলোয়ান। মাথা ঢাকা মাফলারে। ভাঙচুরগুলো বুঝতে তবু কষ্ট হয় না। এতদূর থেকে শুধু অল্প খোলা মুখটুকুর দিকে চাইলেই বোঝা যায়। তৃষাকে তো ভাল করে দেখতে হচ্ছে না এখন। তার তো সবটুকুই দেখা। পা তুলে কাঠের চেয়ারে বসে চেয়ে আছে অনড়, অটল। কাঠের চেয়ার! তৃষা একটু ভ্রু কোঁচকায়। কাউকে বললেই তো ইজিচেয়ারটা টেনে বের করে দিত বারান্দায়।
বউমা! বউমা!—উঠোন থেকে দীননাথ ডাকছেন।
তৃষা জানালাটা বন্ধ করে উঠোনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
দীননাথ রোদে দেওয়া একরাশ লেপ-তোশকের পাশে লাঠি হাতে উবু হয়ে বসে আছেন! তৃষাকে দেখে বললেন, কাউকে পাহারায় রাখখানি, বজ্জাত কাক চড়ুই সব ননাংরা করে দেবে যে লেপ-তোশক।
করবে না। উঠোন দিয়ে তো আমরা অনবরত যাতায়াত করছি।
তবু সাবধান হওয়া ভাল। সকালবেলাটায় খবরের কাগজটা কোথায় যায় বলো তো! এই সময়টুকুতেই আমি যা একটু চোখে দেখতে পাই। ওরা সেই বেলা গড়িয়ে গেলে চাইতে চাইতে তবে দেয়। তখন বড় অক্ষর ছাড়া কিছু পড়তে পারি না।
খবরের কাগজ তো কেউ পড়ে না বাবা। দেখছি কোথায় আছে। বোধহয় আমার ঘরেই। দেখো গে। পেলে পাঠিয়ে দাও। রোদে বসে বসে পড়ি আর তোমার বিছানা পাহারা দিই।
নিজের ঘরে তৃষা স্টোভে চা বসিয়েছিল। সারাদিনে কয়েকবার সে নিজের হাতে তৈরি চা খায়। রান্নার ঠাকুর হুকুমমতো করে দেয় বটে, কিন্তু তৃষার রুচিমতো হয় না। ঘরে এসে তৃষা জল নামাল। অত্যন্ত দামি সুগন্ধী চা-পাতা ভিজিয়ে চা ঘঁাকল। খেল। কিন্তু সারাক্ষণ জোড়া কোঁচকানো রইল তার। চায়ের তেমন স্বাদ পেল না।
খবরের কাগজটা মেঝেয় পড়ে ছিল। বারান্দার জানালার ধারে। সে নিজে কদাচিৎ খবরের কাগজ পড়ে। চা শেষ করে খবরের কাগজটা শ্বশুরকে পৌঁছে দিয়ে সে উঠোনের বেড়ার আগল ঠেলে বেরিয়ে এল।
ঝাঁটপাট দেওয়া পরিষ্কার রাস্তার ওপর আবার দুটো-একটা করে পাতা খসে পড়ছে। কিন্তু পোড়া পাতা আর ছাই উড়ে এসেছে নিতাইয়ের ঝোপড়ার দিক থেকে। রোজ সন্ধেবেলা সে আগুন পোহায়।
বাগানের দিকে মুখ করে বসে আছে শ্রীনাথ। চোখ ড়ুবে আছে বাগানে। এবার মেদিনীপুরের একটা লোক বাগান করছে। কাজ জানে। সারা বাগান জুড়ে রঙের বান ডাকিয়ে দিয়েছে। এই একটা জিনিস শ্রীনাথ বোঝে। গাছপালা। যে লোকটা বাগান করেছে সে যে গুণী তাতে সন্দেহ নেই। আজকাল শুধু এই লোকটার সঙ্গে শ্রীনাথ যা একটু কথাবার্তা বলে। কথা বলে ভারী আরাম পায়।
লোকটা পপি ফুলের বেড উসকে দিচ্ছে এখন। জল দিয়ে আসবে। সিঁড়িতে বসে দু’দণ্ড জিরোবে। কথা হবে! শ্রীনাথ কাঙালের মতো চেয়ে আছে।
ভাওয়ালের কবি গোবিন্দ দাস লিখেছিলেন, ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মরলে তোমরা আমার চিতায় দিবে মঠ…। শ্রীনাথ মরলে বঙ্গবাসী অবশ্য মঠ দেবে না। তবু শ্রীনাথের বড় ইচ্ছে, তাকে যেখানে পোড়ানো হবে সেখানে যেন ছোট্ট করে ঘিরে নিয়ে কয়েকটা গাছ লাগানো হয়। মৃত্যুর পর তার মতো পাপী লোকের আত্মার তো গতি হবে না। তার আত্মা থাকবে মাটির খুব কাছাকাছি নিম্নস্তরে। তখন ওই নিজের ভস্মীভূত দেহের রেণুমাখা গাছপালার মধ্যে সে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে। কাউকে ভয় দেখাবে না, কিছু চাইবে না সে।
ইজিচেয়ারটা কাউকে বের করে দিতে বলোনি কেন?
কথাটা খুব ভাল শুনতে পেল না শ্রীনাথ। বাগানের মধ্যে ড়ুবে ছিল। শুধু আস্তে মুখটা ঘুরিয়ে বলল, উঃ!
