লাভ-ক্ষতির হিসেব এখনও শেষ হয়নি। সময় হলেই ব্যালান্স শিট পেয়ে যাবেন।
বোস সাহেব উকিলকে একটা ভিজিটও দিয়েছিল শুনেছি। আপনার পরামর্শে নোটিশটা সার্ভ করেনি। কিন্তু এটা বালির বাঁধ।
দেখা যাক।
আমি কারওর করুণার পাত্রী হয়ে থাকা পছন্দ করি না। সব সময়েই মনে হয়, বোস ইচ্ছে করলেই আমাকে ডিভোর্স করতে পারে, দয়া করে করছে না। একজন আউটসাইডারের মতো এই থাকাটা কি খুব সম্মানজনক?
ধৈর্য ধরুন।
ধৈর্য ধরছি, তার কারণ অন্য। বোসের ফ্ল্যাট থেকে বেরোলে আমার কলকাতায় আর থাকার মতো জায়গা নেই। শুধু সেইজন্যেই–
জানি মণিদীপা।
আপনি জানেন বলেই বোধহয় ডিভোর্সটা আটকেছেন। কিন্তু ও ডিভোর্স না করলেও আমি মামলা আনব। তখন ঠেকাতে পারবেন না।
তারপর কী হবে মণিদীপা?
কিন্তু তার আগে বলুন, আপনি তিন মিনিটের টাইম-লিমিট কতক্ষণ আগে পার হয়েছেন?
অনেকক্ষণ। কিন্তু আমি এক্সচেঞ্জ থেকে কথা বলছি। এ জায়গা আমার চেনা। এমনকী পয়সাও লাগে না।
ও। হ্যাঁ, তারপর কী হবে জিজ্ঞেস করছিলেন। জেনে কী হবে? আমি ডিভোর্স করলেও তো কেউ মালা হাতে বসে থাকবে না। এ দেশের কাওয়ার্ড পুরুষরা ডিভোর্সি মেয়েদের ভয় পায়।
ঠিক তাই মণিদীপা।
কিন্তু আমি তো আর বিয়ে করতে যাচ্ছি না। কাজেই ও প্রশ্ন ওঠে না। আমি চাই কাজ। অনেক, হাজার কাজে ড়ুবে থাকব।
কাজ চাই? সেজন্য দোকান কেন? আপনার বিপ্লব কি শেষ হয়ে গেছে মণিদীপা?
মণিদীপা ভ্রূ কোঁচকায়, কেন শেষ হবে? যে লোকটা বিপ্লবীর জুতোয় পেরেক ঠুকে দেয় সেও বিপ্লবী। আপনি রিভোলিউশন অফ দি প্রোলেতারিয়েত কাকে বলে তাই জানেন না।
আপনি বোধহয় বিপ্লবীদের জন্যই গুন্ডি দিয়ে পান সাজবেন, আর আমি বিপ্লবী ব্র্যান্ডের বিড়ি লাল সুতোয় বেঁধে দেব?
কেন যে আপনি এত অশিক্ষিত!
দীপনাথ গা-জ্বালানো হাসি হাসছিল। দীপনাথের ওপর সে কখনও সত্যিকারের রাগ করেনি। আজ করল। হাসির মাঝখানে রেখে দিল ফোনটা।
বোস সাহেব ফিরল ন’টা নাগাদ। আজকাল সবসময়েই বাসায় ঢোকে গম্ভীর মুখে, ভ্র কোঁচকানো। মণিদীপা তাতে ভয় পায় না বা গুরুত্ব দেয় না। লোকটাকে তার বোঝা হয়ে গেছে। এও জানে তারা দু’জনে কেউ নিজেকে বদলাবে না। যদি না বদলায় তবে মিলও হবে না কোনওদিন।
তবে আজ মণিদীপা আধঘণ্টা বাদে হানা দিল বোসের ঘরে। ততক্ষণে বোস গরম কাপড়ের ড্রেসিং গাউন পরে এক কাপ কালো কফি শেষ করেছে। বাইফোকাল চশমা চোখে কিছু কাগজপত্র দেখছিল লেখাপড়ার টেবিলের কাছে বসে।
মণিদীপা সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলার পাত্রী নয়। ঘরে ঢুকেই বলল, বুনু, তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।
বোস কাগজ সরিয়ে একটু অবাক চোখে মণিদীপাকে দেখে নিয়ে বিরক্ত গলায় বলে, আই নো। তোমার কথা মানেই টাকা। আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়।
অপমানটা খুব ঝাঁঝালো হয়ে মণিদীপার সর্বাঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল বটে, কিন্তু তবু সে আজ মাথা ঠান্ডা রাখতে পারল। আর-একটা চান্স ওকে দেবে সে।
মণিদীপা মাথা নেড়ে বলে, টাকার কথা তোলাটা নিশ্চয়ই দোষের নয়।
দোষের হত যদি যথেষ্ট টাকা তুমি না পেতে।
আমি যথেষ্ট পাই না। তার চেয়েও বড় কথা, টাকার ব্যাপারে আমার কোনও স্বাধীনতা নেই।
স্বাধীনতা দেব এমন শর্ত ছিল না।
তা হলে আমাকে বউ সাজিয়ে রেখেছ কেন?
চলে যাও। দরজা সবসময়েই খোলা।
আমি যেতেই চাই। কিন্তু যাওয়ার জন্যও আমার কিছু থোক টাকার দরকার। আমাকেও বাঁচতে হবে তো।
সেটা কোর্টে ঠিক হবে।
তুমি কি ডিভোর্স স্যুট আনছ?
না। পাবলিসিটি আমি পছন্দ করি না। তবে তুমি মামলা করতে পারো। আমি লড়ব না।
আমি কেন মামলা করতে যাব? তোমার আমার মিল নেই, ছাড়াছাড়ি দরকার, সেটা কি কাছারির মুখ দিয়ে বলাতে হবে? কাছারিতে গিয়ে তো আমরা বিয়ে করিনি।
তা হলে আপসে সেপারেশন চাও?
চাই।
আর সেজন্যই টাকাটা তোমাকে দিতে হবে।
তাও নয়। তুমি মিন বলে অন্যরকম অর্থ করছ। চলে যাওয়ার প্রি-কন্ডিশন হিসাবে আমি টাকাটা চাইনি। আই ওয়ান্ট টু স্টার্ট সামথিং ইমিডিয়েটলি। পরে আমি ব্যাংকের লোন পেয়ে যাব। তোমার টাকা তখন শোধ করে দেব।
তুমি কী স্টার্ট করতে যাচ্ছ আগে সেটা আমার জানা দরকার।
এখনও ঠিক করতে পারিনি। আই ওয়ান্ট টু ওপেন এ শপ।
শপ? মুদিখানা নাকি?
তোমার কালচার বেশি দূর ওঠে না, তাই যা খুশি ভাবতে পারো।
ভদ্রঘরের মেয়েরা কি দোকানদারি করে? কখনও শুনিনি।
করে এবং খুব ভাল ঘরের মেয়ে-বউও করে। আমার বন্ধু অঞ্জু কত বড় টেলারিং করেছে! ওর বর তোমার চেয়ে অনেক উঁচু পোস্টে কাজ করে।
অঞ্জু? সেটা কে?
ইউ নো হার ওয়েল। ন্যাকামি কোরো না।
বোস নিজেই নাকটাকে দুআঙুলে চেপে ধরে একটু ভাবল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, আই নো। বোধহয় বালিগঞ্জে ওর একটা ফ্যাশনের দোকান আছে, অ্যান্ড শি ইজ এ কাটথ্রোট।
তোমার অ্যাসেসমেন্ট তোমার নিজস্ব। তবে আমিও ওরকম কিছু করতে চাই।
আমি তোমাকে টাকা দিয়ে বিশ্বাস করতে পারি না। অঞ্জু যা পেরেছে তুমি তা না পারতেও পারো।
তবু তুমি তোমার টাকা ফেরত পাবে। আমি ধার হিসেবে কাগজপত্রে সই করে টাকা নেব। ইভন আই অ্যাম রেডি টু পে ইন্টারেস্ট।
বোস হাসল। খুবই শেয়ালমুখো হাসি, যা আসলে হাসি নয়। বলল, তুমি চলে গেলেও তো আমার লাভ হবে না! আইনত আমি বিবাহিতই থেকে যাচ্ছি।
তুমি কি আবার বিয়ে করতে চাও বুনু?
চাইলে দোষ কী?
আর একটা মেয়ের সর্বনাশ হবে। ঠিক আছে আমি মিউচুয়াল করে নিতে রাজি। কেস তো ইন ক্যামেরাও করা যায়।
