অঞ্জু পাশের টুলে বসে বলে, আমি বলি, ড়ু সামথিং। আজকালকার পুরুষরা জানো তো, ভীষণ অবিশ্বাসী। আজ তোমার কাছে ফেথফুল আছে, কালই হয়তো থাকবে না। চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস, বোঝোই তো! তাই মেয়েদের একটা ফুটিং থাকা ভাল। তাতে অন্তত হাজব্যান্ডরা বুঝবে যে, বেশি ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করে লাভ হবে না। ইন ফ্যাক্ট আমার কর্তাটি একসময়ে আমার ওপর খুব হম্বিতম্বি করত। আজকাল সমঝে চলে। ভয়ও পায়।
আমি তোমার মতো লাকি নই, অঞ্জু।
দোকানের কর্মী একটি এসে নিচু গলায় কী পরামর্শ করে গেল। আর-একজনের ব্লাউজের মাপ খাতায় লিখে নিতে হল। টুকটাক এসব কাজ সেরে চশমাটা খুলে একটা টুকরো কাপড়ে মুছতে মুছতে অঞ্জু বলে, তোমার একটা পলিটিক্যাল লাইন ছিল না?
ছিল। এখন নেই।
বেঁচেছ। হায়ার পলিটিকসে পয়সা আছে, শৌখিন পলিটিকসে কিছু নেই। বরং ঘরের পয়সা বেরিয়ে যায়। তাছাড়া টেনশন, ফ্রাষ্ট্রেশন অ্যান্ড আদার হ্যাজার্ডস। তোমার বাবার কথাই ভেবে দেখো। লোয়ার পলিটিকস একদম নন-প্রোডাকটিভ। ড়ু সামথিং প্রোডাকটিভ। আর্ন মানি। লাইফ উইল বি ভেরি এনজয়েবল।
অঞ্জু, আই অ্যাম ইন মানি ট্রাবল!
কেন, তোমার হাজব্যান্ড?
ওর সন্দেহ আমি এক্সট্রাভ্যাগেন্ট। আজকাল টাকা কন্ট্রোল করছে। মাসে মাসে মাত্র চারশো টাকা হাতখরচ দিচ্ছে।
চারশো!–বলে প্রায় নাক সিঁটকোল অঞ্জ।
তুমিই বলো আমার এখন কী করা উচিত।
আর্ন মানি, আর্ন মানি!—অঞ্জু ছড়া কাটার মতো করে বলে।
মণিদীপার চোখ জ্বালা করে। বুকের ভিতরটাও জ্বলছে রাগে আর আকাঙক্ষায়! অঞ্জুর এত রবরবা, এত স্বাধীনতা, এত টাকা তার ভিতরে বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে, টালমাটাল করে দেয়।
অঞ্জু মৃদু স্বরে বলল, আগে তুমি খুব গরিবদের জন্য ভাবতে। আমি বলি কী, ভাবো তাতে ক্ষতি নেই। এমনকী গরিবদের জন্য কিছু করাও ভাল, আমিও তো রেগুলার কিছু দানধ্যান করি। রামকৃষ্ণ মিশন, একটা অনাথ আশ্রম আর একটা ব্লাইন্ড স্কুলে টাকা দিই। গরিবদের জন্য ফিল করা ভাল, কিন্তু গরিব হওয়া ভাল নয়। পভার্টি আমার দু চোখের বিষ।
মণিদীপা নিঃশব্দে মাথা নেড়ে কথাটা সমর্থন করে। সে জানে, এটা খুব সত্যি। নইলে স্নিগ্ধদেব এত কিছু করে, এত দূর এগিয়ে, হাজার জনার চোখে বিপ্লবের কাজল পরিয়ে দিয়ে অবশেষে নিজেই কেন সরে পড়ে মার্কিন মুলুকে? আজ মণিদীপা তাই নেতৃত্বহীন, অস্থির, দ্বিধাগ্রস্থ।
অঞ্জু একটা সিনথেটিক কাপড় টেনে নিয়ে পটু হাতে দাগ দিয়ে দিয়ে কাটবার তোড়জোড় করছে।
মণিদীপা মৃদু স্বরে বলে, শোনো অঞ্জু, আমার খুব টাকার দরকার। আমি একটা হার বিক্রি করব।
বিক্রি করবে?—যেন এতটা বিশ্বাস করতে পারছে না এমনভাবে তাকায় অঞ্জু।
মণিদীপা একটু লজ্জা পায়, অহংকারেও লাগে। সে তাড়াতাড়ি বলল, অর্নামেন্টস তো পরি না। ঘরে রেখে কী লাভ বলো? প্রিমিটিভনেস।
সে তো ঠিকই। তবে সোনা একবার বিক্রি করলে আর কিন্তু কিনতে পারবে না। সোনার যা বাজার!
জানি। তবু করব। তোমার জানাশোনা স্যাকরা আছে?
আমি বহুকাল ওসব করাইনি। গয়না যা ছিল সব ব্যাংকের ভল্টে। তবে ভবানীপুরে অনেক দোকান আছে পুরনো গয়না কেনে।
তারা তো ঠকাবে।
চিন্তিত মুখে অঞ্জু বলে, অসম্ভব নয়। কিন্তু আমি যে কাউকে চিনি না।
প্রসঙ্গটা আর টানার মানে হয় না বলে মণিদীপা টানল না। কিছুক্ষণ অন্য কথাবার্তা বলে উঠে পড়ল। কিন্তু বুকে তীব্র দহন। মাথা ফেটে যাচ্ছে রাগে, ঈর্ষায়।
৫৫. সাড়ে তিন ভরি আছে
সাড়ে তিন ভরি আছে। পান বাদ যাবে।
পান বাদ দেবেন কেন? হারটা তো সুন্দর। একটু পালিশ করলে নতুন বলে বিক্রি হয়ে যাবে।– মণিদীপা বুদ্ধি খাঁটিয়ে বলল।
দোকানি গম্ভীর মুখে বলে, আমি শুধু সোনার দাম দিতে পারি।
মণিদীপার কিছু করার ছিল না। বলল, তাই দিন।
টাকা নিয়ে উঠল এবং ট্যাক্সি ধরল।
বাসায় ফিরে টাকার গোছটার দিকে চেয়ে মুখ বাঁকা করে সে। এ টাকা দিয়ে কিছুই শুরু করা যায় না। আরও টাকার দরকার। অনেক টাকা।
টাকাটা অনিবার্যভাবে মার্কেটিং-এ যাওয়ার জন্য তাকে ঠেলছিল। কষ্টে লোভ সামলৈ নেয় মণিদীপা। অঞ্জর মতো এন্টারপ্রাইজিং একটা কিছু করতে হবে। অনেক টাকার দরকার।
কাগজ কলম নিয়ে সারাদিন ডাইনিং টেবিলে বসে অনেক হিসেব-নিকেশ করল। দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, ডেকোরেশন, ট্যাক্স। তবে অঞ্জুর মতো টেলারিং শপ না রেস্টুরেন্ট না হ্যান্ডিক্র্যাফটস তা ঠিক করতে পারল না। কিন্তু কিছু একটা করতে হবে।
রাত আটটা নাগাদ যখন টেলিফোন বাজল তখনও মণিদীপার হুশ নেই। স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখে সে একটা ঝকঝকে দোকানঘর দেখতে পাচ্ছে। ভারী ব্যস্ত দোকান, ভীষণ জনপ্রিয়। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার বিক্রি।
সেই ঘোরের মধ্যেই গিয়ে টেলিফোন ধরল।
বোস সাহেব আছেন?
গলাটা শুনে আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল মণিদীপার। বুকে বড় জ্বালা, বড় ক্ষোভ হতাশা।
এখনও ফেরেনি। কোথা থেকে ফোন করা হচ্ছে?
শিলিগুড়ি। কালকের ফ্লাইটে যাচ্ছি। কিন্তু পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে, কাল আর বোস সাহেবের সঙ্গে দেখা হবে না, বলে দেবেন কাইন্ডলি।
বলব। আপনার সঙ্গে আমারও একটু দরকার ছিল যে! কবে দেখা হতে পারে বলবেন?
কাল নয়। পরশু চেষ্টা করব। কেন?
একটা কাজ হাতে নিয়েছি। এক্সপার্ট ওপিনিয়ন চাই।
আমি কোনও ব্যাপারেই এক্সপার্ট নই।
