বহুকাল দেখা নেই। দেখা হতে যে অঞ্জু খুব খুশি হল তাও নয়। অঞ্জু এখন খুবই ব্যস্ত মানুষ। বসন্ত রায় রোডে নিজেদের বাড়ির একতলায় প্রথমে একটা মেয়েদের বিউটি পার্লার খুলেছিল। সেটা তেমন চলছিল না। এখন সে দোকান তুলে দিয়ে মেয়েদের দর্জির দোকান দিয়েছে। রমরম করে চলছে।
আজও কাউন্টারে কঁচি হাতে দাঁড়িয়ে চশমা চোখে খুব মন দিয়ে কী কাটছিল একটা সবুজ সিল্কের কাপড় থেকে। ব্লাউজ বা জিনসের মাপ কিংবা ডেলিভারি নিতে কম করেও এই দুপুরে সাত-আট জন ছুঁড়ি থেকে বুড়ি অপেক্ষা করছে। তিনজন কর্মী মহিলা হিমশিম।
অঞ্জু ফর্সা মোটাসোটা এবং বেশ সুন্দরী। ব্যস্ত অঞ্জু প্রথমটায় প্রায় চিনতেই পারল না। ভ্রু কুঁচকে একটু তাকিয়ে থেকে অনেকটা সময়ের ফাঁক দিয়ে বলল, ওঃ তুমি! কী খবর?
একদম ড্যাম্প গলা, উত্তাপ নেই। চোখ নামিয়ে কাজ করতে করতে বলল, কাটার পালিয়েছে, বুঝলে! যা দেমাক না আজকাল কাটারদের! এত মাইনে দিই তবু হুটহাট কিছু না বলে-কয়ে ঠিক পালিয়ে যাবে। রাইভ্যাল কনসার্নরা ভাগিয়ে নেয়।
তুমি তো আগে দর্জির কাজ জানতে না অঞ্জু!
ঠিকই তো। কবে শেখার সময় হল বলো! ভেবেছিলাম মাইনে করা লোক দিয়েই ব্যাবসা চলে যাবে। কিন্তু ভাল কাটারদের রাখা যে কী ঝামেলা! অর্ডারের তূপ জমে আছে, তার টিকির দেখা নেই। বহুকাল নাকাল হয়ে শেষে নিজেই শিখেছি প্রাণের দায়ে। এখন কারও পরোয়া করি না।
অঞ্জু ব্যস্ত, বিরক্ত, ক্লান্তও বোধহয়। কী করবে মণিদীপা ভেবে পাচ্ছিল না। বসারও জায়গা নেই। টুল বেঞ্চ সব ভর্তি। অঞ্জু ব্যাবসা করে, সুতরাং বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন, আর তাই তার কাছে আসা। একটু পরামর্শ দিতে পারত অঞ্জু। কোথায় গেলে গয়না বিক্রি করতে গিয়ে ঠকতে হবে না, তা বলে দিতে পারত।
বসবে? না কি অন দি ওয়ে?—অঞ্জু জিজ্ঞেস করে।
একটু দরকার ছিল।
আমার কাছে?
হু। কিন্তু তুমি তো ব্যস্ত।
ভীষণ। এ জন্মে আর বিশ্রাম নেই।
খুব রোজগার হচ্ছে তো?
হচ্ছে। খরচও আছে।
আহাঃ কী ই বা খরচ! দোকানের তো ভাড়া লাগে না।
ভাড়াটাই যা বাদ। ট্যাক্স আছে, মাইনে আছে, মেনটেনেন্স আছে। কর্তা তো কিছু দেখবে না। কেবল বলে দোকান তুলে দাও।
বলে বলুক। তুমি তুলে দিয়ো না। এই বেশ রমরমে একটা দোকানঘরে সারাদিন কাটাতে মজা আছে। বার করে না।
সেটাও ঠিক। কাজেরও আনন্দ আছে। আই ফিল ইম্পর্ট্যান্ট ড়ুয়িং সামথিং ফর আদারস অ্যান্ড ক্রিমেটিং অলসো। আমি একটা সামার ড্রেস ডিজাইন বের করছি, জানো? নিউ মার্কেটের কানহাইয়ালাল কন্ট্রাক্ট করে গেছে।
অনেক টাকার কন্ট্রাক্ট?
টাকাই তো সব নয়। দেয়ার ইজ অলসো এ প্লেজার। তবে কানহাইয়ালাল টাকাও ভালই দিচ্ছে।
তোমার হাজব্যান্ড কি এখন ম্যাকনিলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর?
না, দু’নম্বরে আছে। হয়ে যাবে শিগগিরই।
জানো তো, নকশালরা একসময়ে ঠিক করেছিল হাজব্যান্ড আর ওয়াইফদের একসঙ্গে রোজগার করা বন্ধ করে দেবে?
দেওয়ার রোম্যান্টিক ভ্যাগাবন্ডস। আমার হাজব্যান্ড মাসে দশ হাজার টাকা মাইনে পায় বলেই কি আমার কিছু করার নেই? শোনো কথা! আমিও তো মানুষ।
কথা থামিয়ে চারদিকে চেয়ে দেখছিল মণিদীপা। ভিতরে কাচের আলমারিতে বহু রকমের ড্রেস মেটিরিয়ালস সংগ্রহ করে রেখেছে অঞ্জু। কম করেও ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকার জিনিস। দু-দুটো এয়ারকুলার লাগানো। অবশ্য এখন শীতকাল বলে এগুলো চলছে না। কিন্তু সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘এয়ার কন্ডিশনড’। এতে কাজ দেয়, ইজ্জত বাড়ে।
বসবে?—অঞ্জু জিজ্ঞেস করে।
এখানে তো বসার জায়গা নেই।
ভিতরে এসো না! বলে নিজেই গিয়ে কাউন্টারের একপাশে পাটা উঠিয়ে ধরল, এসো।
ভিতরে গোটা চারেক গদিওলা উঁচু টুল। তার একটায় উঠে বসল মণিদীপা।
অঞ্জু বলল, একটু বোসো। হাতের কাজটা মেশিনে দিয়ে নিই।
তুমি কাজ করো না। আমি অপেক্ষা করছি। তাড়া নেই।
তোমার হাজব্যান্ডের কী খবর? গোয়িং আপ অ্যান্ড আপ?
হি ইজ অ্যামবিশাস।
পুরুষমানুষ মাত্রই জেলাস। মিসেসরা কিছু একটা করলেই তাদের গায়ে জ্বর আসে। অথচ নিজেরা! এক নম্বরের কেরিয়ারিস্ট।
তোমার হাজব্যান্ড একদম কো-অপারেট করেন না বুঝি?
না, তা করে। এমনকী ওর অফিসের বিগ বসদের মিসেসরা তো এখান থেকেই সব কিছু বানিয়ে নেয়। ও-ই ইন্ট্রোডিউস করে দিয়েছে। এমনিতে হি ইজ প্রাউড অফ মি। কিন্তু কেবল ন্যাগ করবে, আমার বাচ্চারা তাদের মাকে পাচ্ছে না, হাইসহোল্ড ঠিক মতো চলছে না এটসেটরা। সবচেয়ে বড় কথা হি ওয়ান্টস টু ডোমিনেট মি। আমার একটা সেপারেট পার্সোনালিটি গড়ে উঠুক এটা ও চায় না।
আর ইউ আনহ্যাপি?
অঞ্জু মন দিয়ে একটা সূক্ষ্ম কাটার কাজ সারতে গিয়ে সময় নিল। কিন্তু প্রশ্নটা কানে গেছে ঠিকই। কাপড়টা সরিয়ে রেখে কপাল থেকে চুল সরিয়ে ক্লান্ত মুখে একটু হেসে বলল, আনহ্যাপি কি না তা ভেবে দেখারও সময় পাই না। তবে ও আমাকে অপছন্দ করে না তো, আই অলসো অ্যাডোর হিম।
মণি, উই আর নট আনহ্যাপি।
এই দোকান থেকে তোমার নিশ্চয়ই অনেক রোজগার হয় অঞ্জু!
তৃপ্তমুখে অঞ্জু বলে, হয়।
কত বলো তো!
ইনকাম ট্যাক্সে বলে দেবে না তো! ভালই হয়। এ ফিউ থাউজ্যান্ডস পার, মান্থ।
ফিউ থাউজ্যান্ডস!—মণিদীপা অবাক চোখে চেয়ে থাকে।
আমি লাকি।
তুমি খুব পরিশ্রমীও।
কাজ করতে আমি ভালবাসি।
আমিও বাসি। কিন্তু কী করব ঠিক বুঝতে পারি না।
