রোজ ভাবে, এবার চলে যাব। আজ বা কাল। কিন্তু যাই-যাই করলেও মণিদীপার যাওয়ার জায়গা নেই। বাপের বাড়ির কথা সে ভাবতেই পারে না। নির্যাতিত এবং অবসরপ্রাপ্ত রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তার বাবা খুব সামান্য একটা ভাতা পায় পার্টি থেকে। বাড়িতে দু’খানা ঘর ভরতি তার ভাইবোন। একবেলা খাবার জুটলে অন্য বেলা জুটতে চায় না। এক দাদা মোটামুটি ভাল চাকরি করে। সংসারের হাঁ-মুখ দেখে সে মানে মানে নিজের বউ বাচ্চা নিয়ে অন্য জায়গায় সরে পড়েছে।
ছিল স্নিগ্ধদেব। সব জুড়ে ছিল তার। বিশ্বাস ছিল, সব আশ্রয় ছিন্ন হলে স্নিগ্ধদেব এগিয়ে আসবে ঠিক। বুদ্ধিমান ও সাহসী স্নিগ্ধদেবের অনেক গুণ। তবে সবচেয়ে বড় ছিল তার হৃদয়। ভারী নরম সুন্দর মানুষ।
দাঁতে দাঁত ঘষছিল মণিদীপা, অথচ চোখ ফেটে যাচ্ছে জলের তোড়ে। রাগ, একমাত্র পাগলা রাগটাকে খুঁচিয়ে তুললে তবেই এই ভাবাবেগের বৃথা কান্নাকে আটকানো যাবে।
দীপা!
ডাক শুনে মণিদীপা জানালার কাছ থেকে মুখটা সামান্য ফেরাল। তার চুলের গুছি মুখটাকে আড়াল করেছে। বুনু তার চোখের জল দেখতে পাবে না। মুখে কিছু বলল না সে।
চ্যাটার্জি আর কিছু বলেনি?
বুনো থেকে বুনু। এই নামে বিয়ের পর বেশ কিছুদিন স্বামীকে ডেকেছে মণিদীপা। তখন বন্য বরাহের মতোই প্রেম নিবেদন করত বুনু। মণিদীপা বোসের লম্বা থলথলে অপদার্থ চেহারা আর চরিত্রহীন মুখের দিকে চেয়ে বলল, না।
যদি কাল আবার ফোন করে—
কাল আমি বাড়ি থাকব না।—ঝেঁঝে ওঠে মণিদীপা।
ওঃ, দেন ইটস্ অলরাইট।
বোস চলে গেলে মণিদীপা খাবার ঘরে এল। বোস আজকাল প্রায়ই রাতে বাড়িতে কিছু খায়। তাই টেবিলে সাজিয়ে গুছিয়ে খাবার দেওয়া নেই। ঢাকনা খুলে মণিদীপা চিংড়ির ঝোল আর ভাত নিজেই নিয়ে একা বসে খেল, ছড়াল। পাতের দিকে তাকিয়ে তার একটু ভয় হল, এই ভাতের অভাবে সে কখনও কষ্ট পাবে না তো!
এর চেয়ে চাকরি করলে কি সুখী হওয়া যেত? বোধহয় না। মণিদীপা ওই বাঁধা দশটা-পাঁচটার কাজ করতে পারত না কিছুতেই। তবে?
তবে নিয়ে ভাবতে ভাবতে শোওয়ার ঘরে এল সে। নিজস্ব কাঠের আলমারি খুলে শাড়ি ব্লাউজ উলেন টেনে হিঁচড়ে ফেলতে লাগল মেঝেয়। কোথাও কোনও খাঁজে কোণে যদি কিছু টাকা খুঁজে পাওয়া যায়।
পেল কিছু। সব মিলিয়ে পঞ্চাশ টাকাও নয়। এতে কী হবে?
আই মাস্ট সেল সামথিং। আই মাস্ট সেল।—বলে দাঁত দাঁত পিষে বিয়েতে বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া ট্রাংকটা খুলল সে। ট্রাংকটা এ বাড়ির পক্ষে খুবই বেমানান। তার রং গোলাপি এবং ডালায় একটু রঙিন নকশা। তবে মজবুত বলে মণিদীপা এর মধ্যে গয়না রাখে।
গয়না বলতে বাপের বাড়ি থেকে কিছুই প্রায় পায়নি সে। তার ওপর সোনার গয়নায় একটা ঘেন্না ছিল বলে তো বিয়ের পরও তেমন কিছু করায়নি। গয়না একে সেকেলে, তার ওপর গয়না রাখার অর্থ সোনা হোর্ডিং। আজ গয়নার কাঠের বাক্সটা বের করে সে কিন্তু হতাশ হল। দুটো বাউটি, চারগাছা চুড়ি, একটা পাতলা হালকা নেকলেস। বিয়েতে একছড়া হার দিয়েছিল শাশুড়ি, তাতে কিছু সোনা আছে। তবু সব মিলিয়ে সাত-আট ভরির বেশি নয়।
গয়নার ওপর এক বিন্দু মায়া নেই মণিদীপার। তবু আজ বাক্সটা খুলে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। চেয়ে দেখল, এই তার শেষ সম্বল।
বোসের সঙ্গে আপস করতে হবে নাকি? ঘেন্না করে যে! চলে যাবে? কিন্তু কোথায়?
এই কোথায় প্রশ্নটা আজকাল বিশাল হয়ে ডানা মেলে পথ আটকায়।
বুনুর কাছে বোধহয় আর টাকা চাওয়া যায় না। যায়? মাসের প্রথমে বুনু আজকাল তাকে চারশো টাকা হাতখরচা দেয়। তার বেশি দেওয়ার উপায় নেই, বলে দিয়েছে। চাইলে হয়তো দেবে, কিন্তু অপমান করবে। এখন একটুও অপমান সইতে পারবে না সে।
দীপনাথ বাগডোগরায় নিচু হয়ে টাকা কুড়োচ্ছে—দৃশ্যটা আবার দেখতে পেল সে। দীপনাথের সেই হাজার টাকার ঋণ আজও শশাধ করতে পারেনি বুনু। তা নিয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথাও কম হয়নি। অধস্তন কর্মচারী এবং প্রায় তার দয়ায় মানুষ একজন লোকের কাছে অধমর্ণ থাকাটা বুনুর কাছে এক বিরাট প্রেস্টিজের প্রশ্ন।
মণিদীপা গয়নার বাক্স বালিশের পাশে নিয়ে এল।
সকালে উঠে খানিকটা ভাবল সে, গয়না বেচতে লোকে কোথায় যায়? একবার বাপের বাড়িতে গেলে হয়। তার মা গয়না, ঘটি বাটি বেচে অভ্যস্ত, ঠিক গাইড করতে পারবে। কিন্তু সেইসঙ্গে প্রশ্ন উঠবে, মেয়ে কেন গয়না বেচছে?
থাক, অন্য কিছু ভাবাই ভাল।
এই সংসারে তার তেমন কোনও ইনভলভমেন্ট নেই। সে রাধে না, ঘর গোছায় না, আয়-ব্যয়ের হিসেব দেখে না, বোস সাহেবের প্রতিও তার কোনও ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব নেই। যেমন তার প্রতি নেই বোস সাহেবেরও। বোস সকালে চা খায়, দাড়ি কামায়, স্নান করে ব্রেকফাস্ট খেয়ে অফিসে চলে যায়। তার মধ্যে মণিদীপার ভুমিকা কী-ই বা হতে পারে। কোনও কাজের জন্য অনুমতিরও দরকার নেই তার। তবু আজ সকালে সে বুনুর ওপর নজর রাখল। গয়না বিক্রির ব্যাপারটা ওর টের পাওয়া উচিত নয়। টের কোনওদিন যে পাবে না তাও জানে মণিদীপা। গয়নার খোঁজই ও রাখে না। তবু নতুন ধরনের এই কাজটা করতে গিয়ে বুনুর কথাই বারবার ভাবছে সে।
বোস অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল মণিদীপা। বাস-ট্রামে এখনও ভিড়, এখনও ট্যাক্সি সুলভ নয়।
বেরোল এগারোটা নাগাদ।
কোথায় গয়না বিক্রি হয় তা জানে না। ট্যাক্সি নিয়ে তাই সে এল অঞ্জুর কাছে।
