প্রীতম বলল, চেয়ারটা টেনে বসো।
বসবার সময় নেই। পাড়াসুদ্ধ মেয়ে-বউ ঝেটিয়ে এসেছে দেখা করতে। সামনে না গেলে কী ভাববে! আমি বরং অচলাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি গিয়ে।
বিলু চলে গেলে প্রীতম ঘুমন্ত লাবুর গায়ে হাত রেখে গভীর চোখে মেয়ের টুলটুলে মুখখানা দেখল। শীতে ঠোঁট দুখানা শুকিয়ে রয়েছে। গাল ফেটেছে। গা থেকে শিশু-শরীরের মাতলা গন্ধ আসছে। পৃথিবীর কোনও সুগন্ধই এর কাছে দাঁড়াতে পারবে না। মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে প্রীত আপনমনে ভাবল, তুমি আমার বড় আপন লাবু, বড় আপন।
কেমন আছেন?
আচমকা অচলার গলার স্বরে একটু চমকে গিয়েছিল প্রীতম। মুখ তুলে হাসল, ভাল। তুমি?
আপনি কিন্তু সত্যিই ভাল আছেন। চেহারা ফিরেছে।
মোটা হয়েছি বলছ?
না, তা নয়। তবে ফ্রেশ দেখাচ্ছে।
হয়তো চেঞ্জের ফল।
অচলা মাথা নেড়ে বলে, শুধু চেঞ্জ নয়।
বোসো।
বিছানায় তো বসবে না অচলা, চেয়ারেও নয়। তাই একটু ইতস্তত করে বিছানার পাশে মেঝেতে হাটু গেড়ে বসে লাবুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, কলকাতায় আমরা রোজ রাতে আপনাকে নিয়ে গল্প করি।
আমাকে ভুলে যাওনি তো?
কী যে বলেন! আপনাকে ভোলা কি অত সহজ?
বিলু কি আমার কথা খুব বলে?
আমরা সবাই বলি।
রাতটা জলপাইগুড়িতেই কাটানোর কথা ছিল। কিন্তু রাত দশটার মধ্যে কাজ শেষ হয়ে গেল, মোটোয়ানির জোংগাটা তখনও মজুদ রয়েছে। দীপনাথ তাই ভাবল, থেকে কী হবে!
জলপাইগুড়ির ঘোষমশাই অবশ্য বললেন, আরে আপনার জন্য গেস্টরুমে বিছানা করিয়ে রেখেছি, খামোখা এই ঠান্ডায় যাবেন কেন?
কিছু হবে না। শিলিগুড়িতে আমার রিলেটিভরা রয়েছে। তাদের তো সময় দিতে পারছি না। তাই বাতটা গিয়ে থাকি।
অনিচ্ছের সঙ্গে ঘোষ রাজি হলেন। অবশ্য বললেন, রাস্তা খুব নিরাপদ নয় কিন্তু। নিউ জলপাইগুড়ির তিন বাত্তির মোড়টা ডেঞ্জারাস।
দেশের সব জায়গাই ডেঞ্জারাস।
তা অবশ্য বটে।
কথা না বাড়িয়ে জোংগায় চেপে বসল দীপনাথ। নেপালি ড্রাইভার বোধহয় ঘরে ফেরার তাড়ায় প্রায় উড়িয়ে নিয়ে এল তাকে।
দার্জিলিং আর জলপাইগুড়ির দুটি অ্যাপয়েন্টমেন্টই খুব গুরুতর ছিল। বোস বলে দিয়েছে, সম্ভব হলে রাত্রেই আমাকে ট্রাংক কল করে জানাবেন কী হল।
জলপাইগুড়ি থেকে টেলিফোন করার সময় হয়নি। রাত পৌনে এগারোটায় দীপনাথ শিলিগুড়ি টেলিফোন এক্সচেঞ্জে হানা দেয়। এখানে পুরনো বন্ধুরা রয়েছে। মোটামুটি সবাই চেনা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোসের বাড়ির লাইন পেয়ে গেল।
বোস সাহেব?
না, উনি এখনও ফেরেননি। আপনি কে বলছেন?
দীপনাথ হাসল। মণিদীপা তার গলা ভালই চেনে। তবে হয়তো বহু দূরের কল হওয়ায় গলাটা অন্যরকম শোনাচ্ছে।
সে একটু চেঁচিয়ে বলল, আমি দীপনাথ চ্যাটার্জি।
যাঃ! গলাটা অন্যরকম লাগছে কেন?
লাগলে কী করব? আমি তো নিজের গলাতেই কথা বলছি।
ঠান্ডা লাগিয়েছেন নাকি?
না। পাগলদের সর্দি হয় না, জানেন তো!
হয় না? যাঃ বাজে কথা। আমি অনেক পাগল দেখেছি, যাদের সর্দি হয়েছে।
তারা জেনুইন পাগল নয়।
আপনিও জেনুইন পাগল নন। সত্যিই আপনি তো! না কি অন্য কেউ নাম ভাঁড়িয়ে ইয়ারকি করছে।
আমিই।
প্রমাণ দিন।
সেই যে আপনার জন্য রতনপুরে মৌমাছির কামড় খেয়েছিল।
ওঃ মাই গড!
তার মানে?
আমিও এইমাত্র ওই ঘটনাটাই ভাবছিলাম।
তা হলে আমি জেনুইন দীপনাথ তো?
ভীষণ জেনুইন।
বোস সাহেব এলে একটা খবর দিতে পারবেন ওঁকে?
না। আমাদের নন কমিউনিকেশন চলছে কাল থেকে!
হঠাৎ আবার কী হল?
হচ্ছে তো রোজই।
তা হলে খবরটা দেওয়ার কী হবে?
খুব জরুরি?
জরুরি না হলে রাত এগারোটায় কেউ ট্রাংক কল করে?
তা হলে মেসেজটা বলুন, আমি লিখে বেয়ারার হাত দিয়ে ওর ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
খবরটা যেন উনি আজই পান।
পাবেন। মণিদীপা কাজের ভার নিলে করে।
আপনি এত রাত পর্যন্ত জেগে আছেন কেন?
মণিদীপার গা জ্বালানো হাসির শব্দটা এল। বলল, বিরহে। আপনি নর্থ বেঙ্গলে যাওয়ার পর থেকেই এই দশা।
আমি নর্থ বেঙ্গলে এসেছি তা কি আপনি জানতেন?
এমনিতে জানতাম না। তবে হৃদয়ে হৃদয়ে কি টেলিপ্যাথি হয় না?
যা একখানা ফাজিল তৈরি হয়েছেন না! এবার লিখুন তো! হাতের কাছে কাগজ-কলম আছে? আছে। বাদি তৈরি। বলুন।
ছি ছি। আচ্ছা লিখুন।
৫৪. টেলিফোন রেখে মণিদীপা
টেলিফোন রেখে মণিদীপা মেসেজটার দিকে তাকাল। কিছুই তেমন বুঝল না। কতকগুলো ব্যবসায়িক সংকেতবার্তা মাত্র। তবু আনমনে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কাগজটা সে ঠিক দেখছে না, অন্য কথা ভাবছে। বেশ কিছুকাল আগে বাগডোগরা এয়ারপোর্টে ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে গিয়ে অনেক টাকা ছড়িয়ে পড়েছিল মেঝেয়। দীপনাথ সেগুলো নিচু হয়ে কুড়িয়ে দিচ্ছে। মাথা নিচু লোকটাকে দেখে সেদিন তার মনে হয়েছিল, লোকটার ব্যাকবোন নেই। আজও তাই মনে হয়। লোকটা পাহাড় ভালবাসে। একদিন বলেছিল খুব উঁচু একটা পাহাড়ে একদিন একা গিয়ে উঠবে। আর ফিরবে না। দীপনাথ এখন সেইসব উঁচু পাহাড়ের খুব কাছাকাছি। যদি না ফেরে?
বেয়ারাকে ডেকে মেসেজটা বোসের শোওয়ার ঘরে পাঠিয়ে দেয় মণিদীপা। বলে দেয়, সাহেব এলে মেসেজটার কথা বোলো।
নিষ্কর্মা বসে থাকতে বা কিছু নিয়ে ভাবতে মণিদীপা ভালবাসেনা। বড্ড একঘেয়ে যাচ্ছে ক’দিন। তেলের দাম আর এক দফা বাড়ল। ফলে গাড়ি নিয়ে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছে বোস। গাড়ির চাবি নিজের স্টিলের আলমারিতে রেখেছে। জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে টাকা রাখছে না। এসব হচ্ছে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। মণিদীপা মার্কেটিং-এ যায় না বহুদিন। গাড়ি চালিয়ে বেড়ায় না প্রায় মাস দুই। ড্রাইভিং ভুলেই গেল বুঝি। কিন্তু এ নিয়ে বোসের সঙ্গে কথা বলতে রুচি হয় না। বললেই ঝগড়া লাগবে। আজকাল তাদের ঝগড়া বড় বেশি কুৎসিত পর্যায়ে চলে যায়। রেগে গেলে মণিদীপার ঝোড়ো মগজ থেকে যেসব কথা বেরোয় তা স্বাভাবিক অবস্থায় সে চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু আশ্চর্য, ঝগড়ার সময় ঠিক কথাগুলো জিভে চলে আসে।
