কয়েকদিন জ্বরে ভুগে উঠে সজল এখন ভারী রোগা আর দুর্বল। বেলায় ঘুম থেকে উঠে একটা ব্যাপার জড়িয়ে উঠোনের রোদে এসে গুটি গুটি বসেছে। তুষার জলচৌকি থেকে অল্প দূরে।
তৃষা এক পলক তাকিয়ে বলল, পায়ে চটি নেই কেন?
ভুলে গেছি।
যাও পরে এসো।
সজল উঠল না। দুর্বল ঘাড়ের নলিতে মাথাটা খাড়া রাখতে না পেরে কাত করে মায়ের দিকে চেয়ে বলে, একটু খেজুর রস খাব মা?
না। সারারাত হিম পড়ে রস এখন বরফ হয়ে আছে। জাল দিলে গুড় খেয়ো। বেশি নয়, কৃমি হবে।
সজল চুপ করে মায়ের দিকে চেয়ে থাকে।
তৃষা একবার ছেলের দিকে চেয়ে বৃন্দাকে ডেকে ওর চটিজোড়া দিয়ে যেতে বলে।
সজল উদাস চোখে আকাশের দিকে চেয়ে ছিল। হঠাৎ বলল, বাবা কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি মা?
তৃষা সব জানে। তার অজান্তে কিছুই ঘটে না। গভীর রাতে খ্যাপা নিতাই তার জানালায় টোকা দিয়ে খবরটা দিয়ে গেছে, শেষ গাড়ি চলে গেল মা। বাবু কিন্তু ফেরেনি আজ।
খবরটা শুনে তৃষা কিছুক্ষণ জেগে ছিল। বলতে নেই, শ্রীনাথের জন্য তার খুব একটা দুশ্চিন্তা হচ্ছিল না। তার সন্দেহ শ্রীনাথ আজকাল বাইরে ফুর্তি করার স্বাদ পেয়েছে। তৃষার খুব ভুল হয়েছিল শ্রীনাথের সঙ্গে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খুলে। প্রথম থেকে শ্রীনাথ দু হাতে টাকা তুলত। তৃষা সাবধান হয়েছে এখন? জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের টাকা যতদূর সম্ভব টেনে নিয়ে ডাকঘরে রেখেছে। কিছু টাকা তার বন্ধকির ব্যাবসাতে চলে এসেছে। তবু যা টেনে নিয়েছে শ্রীনাথ তাও ফ্যালনা নয়। বদ্রীর মারফত জমিজমা কেনার চেষ্টা করছে, এ খবর মদন ঠিকাদারের কাছে শুনেছে তৃষা। শ্রীনাথের কথা খুবই ঘেন্নার সঙ্গে ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুমিয়েছে তৃষা, সকালে আর ব্যাপারটা মনে ছিল না। ছেলের দিকে চেয়ে বলল, তোমার বাবা কাজে আটকে পড়েছে তাই আসেনি।
সজল এ কথায় জবাব দিল না, আর জানতেও চাইল না কিছু। কিন্তু তৃষা জানে এই বয়সের ছেলেমেয়েরা মুখে যতই না বোঝার ভাব দেখাক, ভিতরে ভিতরে অনেক কিছু বোঝে।
পাশদোলানি চালে তৃষার হাঁসের পাল লাইন ধরে ধপধপে ফর্সা উঠোন পেরিয়ে পুকুরের দিকে যাচ্ছে। তার মধ্যেই একটা হাঁস টপ করে দুলদুলে একটা ডিম প্রসব করে ফেলল মাটিতে, আর সঙ্গে সঙ্গে আর-একটা হাঁস কপ কপ করে সেটা খেয়ে নিল। দৃশ্যটা গম্ভীর চোখে দেখল তৃষা। নন্দর কাছে ডিম বাবদ আড়াইশো টাকার মতো পাওনা। তাগাদার ভয়ে তিন-চারদিন হল সে আর এ তল্লাট মাড়ায় না। তিন-চার দিনের ডিম ডাঁই হয়ে জমে আছে। বেশিদিন জমা থাকলে দু’-চারটে করে পচতে শুরু করবে। আজকালের মধ্যেই নতুন লোক না দেখলে নয়, নন্দ অবশ্য পালাতে পারবে না। টাকা তাকে দিতেই হবে, নইলে যে ঘোর বিপদ তা সে জানে। তৃষারা যখন প্রথমে এখানে আসে তখন কাঙাল ভিখিরি প্রার্থীদের খুব আনাগোনা ছিল। কাছাখোলা বাস্তববুদ্ধিহীন এবং লোকচরিত্র সম্পর্কে অজ্ঞ মল্লিনাথ তাদের দু’হাতে বিলোত। তৃষা হাল ধরার পর সব বন্ধ হয়। বিনা কাজে ফালতু একটি পয়সাও সে কাউকে দিত না। ভিখিরি-টিখিরি এলে সে বলত, কাজ দিচ্ছি, করলে পয়সা পাবে, ভাত পাবে। নইলে রাস্তা দেখো। তৃষার পাল্লায় পড়ে কিছু কিছু নিষ্কর্মা মাগুনে লোক এখন শুধরেছে। তৃষা তাদের খাঁটিয়ে পয়সা দেয়। নন্দ তাদেরই একজন। তুষার টাকা মেরে দেওয়ার মতো অকৃতজ্ঞ হলেও সে হতে পারে কিন্তু প্রাণের ভয়েই সে তা করবে না। সুতরাং তৃষার দুশ্চিন্তা নেই।
তার পায়ের কাছে সজলের মাথার ছায়াটা পড়ে ছিল এতক্ষণ। হঠাৎ তৃষা চেয়ে দেখে, সজল নেই। কোথাও উঠে গেছে। হয়তো বাপের খোঁজ করতেই গেল। অবশ্য বাপের জন্য এক পয়সার টান নেই ওর। থাকবে কেন? তৃষা তো জানে, শ্রীনাথ ওকে কী চোখে দেখে। সজলও সেই বিষ মনোভাব টের পায়। শুধু শ্রীনাথ নয়, মল্লিনাথ ও তৃষার সম্পর্ক নিয়ে আরও অনেকেরই অন্যরকম ধারণা আছে। তৃষা সেসব ধারণা ভেঙে দেওয়ার কোনও চেষ্টাই করেনি। নিন্দের হাওয়াকে রুখতে নেই। চুপ করে থাকলে তা একদিন আপনিই কেটে যায়। গেছেও অনেকটা।
চারদিকে তাকিয়ে দেখলে এই সাদা রোদে যে নিরুদ্বেগ সম্পন্ন গৃহস্থালির দৃশ্যটা দেখা যায় তার সবটা অত সরল গল্প নয়। তৃষা তার মেধা, বোধ, কূটবুদ্ধি, দেহ ও মনকে যতদূর সম্ভব নিংড়ে এ শাখা-প্রশাখাময় ছায়াঘন সংসারবৃক্ষটিতে সার ও সেচ জুগিয়েছে। উদ্যমহীন, আচ্ছা ও অবসরপ্রিয়, হতদরিদ্র শ্রীনাথের ঘর করতে গিয়েই সে টের পেত, সতীত্ব বা এককেন্দ্রিক জীবন কত না অর্থহীন। কতই না হাস্যকর শব্দ ভালবাসা। রাজার আমলের টাকার মতোই তা অচল। তাই মল্লিনাথের। সংস্পর্শে এসে সে যখন দারিদ্র্য মোচনের পথ দেখল তখন কোনও মানসিক বাধাই তাকে আটকে রাখেনি। লোকে বলে, অবৈধ সম্পর্ক। কিন্তু তাই কি? তৃষা কোনও পুরুষকেই ভালবাসে না বটে, কিন্তু তবু তার যেটুকু স্নেহ এখনও বুকের তলানিতে পড়ে আছে তার যোগ্য পুরুষ সারাজীবনে ওই একজনকেই পেয়েছিল তৃষা। সে মল্লিনাথ। ওই একজনকেই তার তেমন পরপুরুষ বলে মনে হয়নি কোনওদিন। বরং ওই একজনের প্রতি মানসিক বিশ্বস্ততাই তাকে খানিকটা সতীত্ব বা ওই ধরনের কিছু দিয়েছে। শরীরের কোনও বোধই কোনওদিন ছিল না তৃষার। কিন্তু আজও সে দেখতে শুনতে অতীব লোভনীয় এক যুবতী। হয়তো তরুণী নয়, কিন্তু জোয়ারি যুবতী। লম্বা মজবুত চেহারা তার। শরীরের হাড় বেশ চওড়া এবং শক্ত। যথেষ্ট পুরুষালি ভাব রয়েছে তার চেহারায় এবং চালচলনে। চোখের দৃষ্টিতে মেয়েমানুষি লজ্জা বা কমনীয়তা নেই। এতগুলো ছেলেমেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তার। বুকের আকার প্রকারে কোনও শ্লথ ভাব নেই, মাতৃত্বের আর্ত স্নেহশীলা নম্রভাবও নেই তার মধ্যে। এখনও সে হেঁটে গেলে মনে হয়, এই মেয়েটি কোনও পার্থিব সম্পর্কে আবদ্ধ নয়। এ একা।
