বার বার কান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উচ্চতায় ওঠার জন্য। ঢোক গিলে কানের ছিপি খুলছে সে। ঠান্ডায় ক্রমে সিঁটিয়ে আসছে হাত-পা, চোখে জল আসছে, কান কনকন করছে ব্যথায়। তবু যাত্রাটি খুব উপভোগ করে দীপনাথ। রাস্তাঘাট ফাঁকা, নির্জন। এই শীতে ট্যুরিস্ট নেই বলে রাস্তায় গাড়ি খুব কম। মাঝে মাঝে একটু মেঘলা করে আসে। কুয়াশার মতো মেঘ নেমে আসে রাস্তায়। বাক্যহীন নেপালি ড্রাইভারটি সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে আছে জোংগা গাড়িটির সঙ্গে। অজস্র ঘুণচক্কর পাক খেয়ে খেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে গাড়ি। আরও নির্জনতা, আরও শীত, মহান পর্বতের আরও কাছাকাছি হওয়া। তিনধারিয়ায় একবার, কার্শিয়াঙে আর-একবার চা খেয়ে নিল দীপনাথ আর তার নেপালি ড্রাইভার। দীপনাথ স্বচ্ছন্দে নেপালি ভাষা বলতে পারে। কিন্তু ইচ্ছে করেই সে ড্রাইভারটার সঙ্গে ভাব জমাল না। এই পথটুকু সে নীবব থাকতে চায়।
লাবুর সঙ্গে ভাব জমতে দুপুর হল। ভাব জমার পর অবশ্য লাবুকে আর থামায় কে! কথা আর শেষ হয় না। জানো বাবা!’বলে বারবার প্রীতমের থুতনি ধরে টেনে নিজের দিকে মুখখানা ফিরিয়ে নেয় আর তুচ্ছাতিতুচ্ছ সব গল্প বলে যেতে থাকে।
তুমি আমাকে ভুলে যাওনি তো, লাবু?
তোমাকে? না তো। আমি তো সব সময়ে বাবা বাবা করি, তাই মা বলে–যাঃ, তোকে বাবার কাছে শিলিগুড়িতেই রেখে আসব। আমি বাপ-সোহাগি তো!
তাই নাকি? তবে থাকবে আমার কাছে?
তোমাকে তো সবচেয়ে ভালবাসি বাবা, কিন্তু মাকে ছেড়ে যে থাকতে পারি না।
মা তো অফিসে যায়, তোমার একা লাগে না?
না তো! অচলা মাসি থাকে তো।
আর কে থাকে?
আর কেউ না।
অরুণ মামা মাঝে মাঝে আসে না?
রোজ আসে। আমরা অরুণ মামার গাড়িতে কত বেড়াই। রবিবারে জু, আইসক্রিম, লাঞ্চ।
লাঞ্চ! কোথায় লাঞ্চ করো?
পার্ক স্ট্রিটে।
তোমার অরুণ মামা তো খুব সুন্দর, না লাবু? আমার চেয়ে অনেক সুন্দর।
তুমি একটু রোগা। কিন্তু তুমি খুব সুন্দর।
আর অরুণ মামা?
অরুণ মামাও সুন্দর। আমাকেও সবাই খুব সুন্দর বলে, বাবা। আমি সুন্দর তো! না বাবা!
তুমি? তুমি ভীষণ সুন্দর। এ বাড়িটা তোমার কেমন লাগছে, লাবু?
খুব ভাল। অনেক বড় তো বাড়িটা! কত গাছ!
পাহাড় দেখেছ?
হ্যাঁ, ছোটকাকু ছাদে নিয়ে গিয়ে দেখাল। আমাদের দার্জিলিং নিয়ে যাবে বড়কাকু, জানো বাবা?
দুরে একটা সাদা পাহাড় দেখেছ?
ওটা তো কাঞ্চনজঙ্ঘা। ছোটকাকু কী বলে জানো?
কী বলে?
বলে কাঞ্চনজঙ্ঘাটা নাকি একটা মস্ত বড় আইসক্রিম। সত্যি, বাবা?
আইসক্রিম? না, ঠিক তা নয়। দুপুরে তুমি একটু ঘুমোবে না লাবু?
আজ আমি ঘুমোব না। বড়কাকু একটু বাদে আমাকে মোটরসাইকেলে চড়িয়ে বেড়াতে নিয়ে যাবে।
ও বাবা! যদি পড়ে-উড়ে যাও?
যাঃ! আমি তো সকালবেলায় বড়কাকুর সঙ্গে কতটা ঘুরে এলাম। তিলক ময়দান, নিউ মার্কেট, সেভক মোড়, পুরনো স্টেশন। শিলিগুড়ি খুব সুন্দর, না বাবা?
তোমার ভাল লাগলেই ভাল।
তোমার ভাল লাগে না?
কী করে লাগবে? এখানে যে তুমি থাকো না। একা কি ভাল লাগে?
আমি একটু বড় হলেই এখানে চলে আসব।
তখন মাকে ছেড়ে থাকতে পারবে?
পারব। বিয়ে যখন হবে তখনও তো মা-বাবাকে ছেড়ে থাকতেই হবে। বলো বাবা!
তা তো ঠিকই।
ছোটকাকুটা না ভীষণ বাজে কথা বলে।
কী বলে?
বলে এখানে নাকি কলকাতার চেয়েও উঁচু মনুমেন্ট আছে। আমি বললাম, কোথায় দেখাও। তখন না পাহাড়টা দেখিয়ে বলল, ওই তো আমাদের মনুমেন্ট, আছে তোদর কলকাতায় ওরকম মনুমেন্ট?
বটে!
হ্যাঁ, আর বলে কী জলদাপাড়ায় নাকি কলকাতার চেয়েও অনেক বড় জু আছে! সত্যি বাবা?
জলদাপাড়া একটা জঙ্গল।
তা হলে তো চিড়িয়াখানা হল না, বলো বাবা!
তা বটে।
শোনো না বাবা, আর বলে, কলকাতাটা পচা জায়গা। এখানে নাকি একটা দুধের পুকুর আছে, সেখানে ড়ুব দিলে সব অসুখ সেরে যায়। তোমাকে নাকি সেখানে নিয়ে গিয়ে চান করাবে, আর তুমি ভাল হয়ে যাবে। সত্যি, বাবা?
কে জানে!
চলো না বাবা, দুধের পুকুরটায় চান করে আসবে।
কথা বলতে বলতে একসময়ে লাবু পাশটিতে শুয়ে কখন বেখেয়ালে ঘুমিয়ে পড়ল। লেপটা ওর গায়ে ভাল করে টেনে দিল প্রীতম।
বাড়িটা নির্জন, চুপচাপ। শতম, মরম বা রূপম নিশ্চয়ই বাড়িতে নেই। বাবা অফিসে। মা বোন সবাই ঘুমোচ্ছে এই শীতের দুপুরে। এ সময়ে বিলু একবার আসবে কি?
প্রীতম কাগজপত্র টেনে নিয়ে হিসেব মেলাতে বসল। চোখ কান আনমনে প্রতীক্ষা করছিল বিলুর জন্য।
বিলু অবশ্য এল না। দোষ নেই, ট্রেনে ওর ভাল ঘুম হয়নি। দুপুরে ঘুমোচ্ছে একটু। বিলু এল বিকেল গড়িয়ে। ঘুমিয়ে চোখ-মুখ ফুলিয়েছে।
এসেই বলল, কী ঠান্ডা! আমার বোধহয় সর্দি লেগে গেল।
প্রীতম কোনও জবাব দিল না। তবে কাগজ কলম সরিয়ে বেখে বালিশে হেলান দিয়ে বসল।
বিলু চেয়ার টেনে আনল কাছে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, কখন এসে তোমার কাছে ঘুমিয়ে পড়েছে দেখো!
কলকাতায় কি লাবু আমার কথা বলে?
সারাক্ষণ।
আমাকে মনে রেখেছে তা হলে?
সে তো রেখেছেই, অন্যদেরও ভুলতে দিচ্ছে না।
ভুলতে কেউ চাইছে কি?
গম্ভীর হয়ে বিলু বলল, কে জানে বাবা!
প্রীতম একটু হাসল। বলল, অচলা একবাবও এ ঘরে এল না তো!
বিলু তেমনি থমথমে মুখে বলে, এখানে তো তোমার জন্য ওর কিছু করার নেই। তুমি ডাকলে আসবে।
বিলুর অভিমান-টভিমান নেই। তাই হঠাৎ এই গাম্ভীর্যটা কেন তা প্রীতম ভেবে দেখছিল। গত কয়েক মাসে বিলুর স্বভাবের খুঁটিনাটি দিক অনেকটাই ভুলে গেছে সে। একদিন চোখের আড়ালের বিলুকে কল্পনায় যেরকম ভাবত, আসল বিলু তার চেয়ে অনেক বেশি বর্ণহীন, অনুত্তেজক।
