দামি পুলওভারের ঋণ বোধহয় ভুলতে পরছে না সে। প্রীতম বলে, না, কী আর করবি? শুধু এই হিসেবপত্রের কাজে আমাকে একটু হেলপ করিস।
নভেম্বরের শেষ দিকে জমজমাট শীতের এক ভোরবেলা হঠাৎ বাড়িতে খুব হইচই। একটা চেনা গলার স্বর অনেক কুয়াশা আর দূরত্ব অতিক্রম করে এসে হানা দিল। কাঁপা বুকে উঠে বসেছিল প্রীতম।
দরজা ঠেলে ঘরে এল দীপনাথ।
বাঃ, তুই তো দারুণ ইমপ্রুভ করেছিস!–বলে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার বাইরে চেয়ে ডাকল, বিলু! বিলু! দেখে যা তোর কর্তার চেহারা। চিনতে পারবি না।
৫৩. বিলু কোনওদিনই খুব সুন্দরী ছিল না
বিলু কোনওদিনই খুব সুন্দরী ছিল না, তবে সাদামাটা চেহারার মধ্যেও কারও কারও যেমন একএকটা অদ্ভুত আকর্ষণ থাকে, বিলুরও তাই! হয়তো সেই আকর্ষণটা নেহাতই একটা গজদন্তে বা চোখের পাতার একটা কালো আঁচিলের মতো তুচ্ছ জিনিসকে নিয়ে তৈরি হয়। বিলুরও সেইরকম একটা কিছু আছে, কিন্তু সেটা যে কী তা আজও স্পষ্ট করে ধরতে পারেনি প্রীতম।
বিলু যখন ঘরে এল তখন সেই পুরনো আকর্ষণটা আজ বঁড়শির মতো কণ্ঠায আটকে টানছিল তাকে। টানছিল বিলুর দিকেই। কয়েক পলক বিলুর দিকে চেয়েই চোখ সরিয়ে নিল প্রীতম। কলকে ফুলের গাছটার দিকে চেয়ে রইল। বুকে একটু অস্বস্তি।
ঘরে ঢুকেই বিলু বলল, মেয়ে লজ্জায় আসতে চাইছে না তোমার কাছে। তুমি ডাকো।
থাক, লজ্জা ভাঙলে আসবে।
বিলু বিছানায় এসে বসল। দীপনাথ সামনেই চেয়ারে বসা। প্রীতম চোখ বুজে বলল, ছুটি পেলে তা হলে?
বিলুকেই বলা, একটু কুণ্ঠার সঙ্গে বিলু বলে, অনেক কষ্টে, অরুণের বাবা নিজে ইনিশিয়েটিভ নিয়ে গ্রান্ট করিয়েছেন। চাকরি তো পাকা নয়, বছরও পোরেনি, এখনই ছুটি কি পাওনা হয়, বলো?
ক’দিনের?
আপাতত দশ দিন।
অরুণের বিয়েটা হয়ে গেছে নাকি?
এ প্রশ্নটার জবাব দিতে কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় নিল বিলু। গলার স্বরও এক পরদা নেমে একটু মিয়োনো শোনাল। বলল, ঠিক হয়ে আছে। মাঝখানে অরুণ দু’মাসের জন্য বাইরে গিয়েছিল হঠাৎ, তাই ক’দিন পিছোতে হয়েছে।
প্রীতম নীরবে শুনল, কিছু বলল না। অরুণের বিয়ের ব্যাপারটা তার কাছে আজও গুরুতর। অরুণ মাঝে মাঝে বিদেশে যায়। বিদেশে যাওয়ার নানা সুযোগও আছে তার। কিন্তু তাই বলে বিয়ে পিছোবে এমন কোনও কথা নেই। প্রীতম একটু বড় করে শ্বাস ফেলে বলে, যাও, তোমরা একটু জিরিয়ে-টিরিয়ে নাও। এখানে খুব ঠান্ডা। লাবু সম্পর্কে সাবধান।
যাই। সারা রাত ভাল ঘুম হয়নি।–বলে বিলু উঠে গেল। বোধহয় পালালই।
বিলু চলে গেলে প্রীতম দীপনাথের দিকে তাকায়। দীপনাথ ছোট একটা নোটবইতে ডটপেন দিয়ে কী লিখছে খুব মন দিয়ে।
কী করছ ওটা?
চোখ না তুলেই দীপনাথ বিরক্তির শব্দ করে বলে, আর বলিস না। থাকব মোটে দু’দিন, চোদ্দোটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট। দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটক, জলপাইগুড়ি দৌড়াদৌড়ি।
বলতে বলতেই দীপনাথ ওঠে।
ও কী? চললে কোথায়?
পিসির বাড়িতে একবার দেখা করে বেলা দশটা সাড়ে দশটার মধ্যেই একটা জিপ নিয়ে দার্জিলিংটা আজ সেরে আসি।
আমি ভাবছিলাম, তুমি এবার আমাদের বাড়িতে থাকবে।
থাকার উপায় নেই। দার্জিলিং থেকেই আজ সোজা চলে যাব জলপাইগুড়ি। ওখান থেকেই কাল সকালে চলে যাব গ্যাংটক। পরশু কালিম্পং হয়ে ফিরব। পরদিনের ফ্লাইটে কলকাতা। তোর তো দুঃখের আর কিছু নেই রে, প্রীতম, বিলু তো এসেছে।
আমার দুঃখ কি শুধু বিলুর জন্য? তুমি যে পর হয়ে গেলে, বড় বেশি ইম্পর্ট্যান্ট হয়ে গেলে, স্কেয়ারস হয়ে গেলে!
আমি? দূর বোকা, কোম্পানি চাকরের মতো খাটায়। আমিও খাঁটি। তোর চিকিৎসা কে করছে রে প্রীতম?
আমাদের সেই পুরনো ডাক্তার। তা ছাড়া শতম হোমিয়োপ্যাথিও দিচ্ছে কোত্থেকে এনে।
ভ্রু কুঁচকে দীপনাথ কী একটু ভেবে বলল, নট ব্যাড, নট অ্যাট অল ব্যাড।
তুমি কি আমাকে ভাল দেখছ, সেজদা?
অনেক ভাল। এত ভাল তোকে বহুকাল দেখিনি।
নিভে যাওয়ার আগে এটা শেষবারের জ্বলে ওঠা নয় তো?
তুই সহজে নিভে যাবি বলে মনে হচ্ছে না।
ঠিক বলছ?
ঠিকই বলছি।
যদি বাঁচি মেজদা, তবে কী করব জানো? অনেক অনেক দূর পর্যন্ত শুধু হাঁটব। হেঁটে হেঁটে বহুদূর চলে যাব।
দীপনাথ ঘড়ি দেখল। বাস্তবিকই সময় নেই।
উঠি রে।
দীপনাথ অবশ্য প্রীতমের বাড়ি থেকে সহজে ছাড়া পেল না। ঘর থেকে বেরোতেই প্রীতমের বোন আর শতম এসে ধরে নিয়ে গেল ভিতরবাড়িতে। এত সকালে দীপনাথ কিছু খেতে পারে না। তবু লুচি, আলুভাজা, সন্দেশ আর চা অনিচ্ছের সঙ্গে কোঁত কোঁত করে গিলতে হল খানিক।
দশটার মধ্যে পিসির বাড়ির সামনে জিপ হাজির থাকবে। মোটোয়ানিকে খবর দেওয়া আছে। দেরি করা চলে না।
কলকাতা যাওয়ার আগে দেখা করে যেয়ো সেজদা।–বিলু রওনা হওয়ার মুখে বলল।
যাব।
কলকাতায় গিয়ে বাসাটায় একবার হানা দিয়ো। বিন্দু একা রয়েছে। অচলাকে তো সঙ্গে নিয়ে এলাম।
অন্যমনে একটা হুঁ দিয়ে দীপনাথ গিয়ে রিকশায় উঠে পড়ল।
বেলা সাড়ে দশটায় যখন উত্তরমুখো পাহাড়ের দিকে জিপ ছাড়ল তখনই সত্যিকারের একা হতে পারল দীপনাথ। সঙ্গে মোটোয়ানিরও আসার কথা ছিল। এভারেস্ট হোটেলে লাঞ্চ দিচ্ছে শিবরামন। কিন্তু মোটোয়ানিরও কাজ পড়ে যাওয়ায় এল না। ফলে জিপটার ড্রাইভার ছাড়া শুধু দীপনাথ। সৌভাগ্যই বলতে হবে।
গাড়িটা অবশ্য ঠিক জিপ নয়। জোংগা ডিজেল। তার রাখঢাক আছে। কোলা জিপ হলে তিনধারিয়ায় পৌঁছোতে পৌঁছোতেই শীতে নাক-কান অবশ হয়ে যেত। এই ঢাকাওলা জোংগাতেও সেটা কম হচ্ছিল না। কিন্তু অবিরল পাহাড়ের মধ্যে যেতে যেতে সব অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছিল দীপনাথের। সে একদিন একা মহাপ্রস্থানে বেরিয়ে পড়বে। একা নির্জন সাদা এক মহাপর্বত অপেক্ষা করে আছে তার জন্য। সেই সাদা মস্ত অপার্থিব পাহাড়ের কথা ভাবলে নিজের তুচ্ছতা ব্যর্থতা। কামনা-বাসনা আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বড় আবছা হয়ে আসে। এক নির্জনতা ঘিরে ধরে তাকে।
