প্রীতম মাথা নাড়ে, না রে। নড়াচড়া ভাল লাগে না।
কিছুদিন একটু অন্য পরিবেশে মনটা অন্যরকম লাগত।
মন! না, কোথাও মন ভাল লাগে না।
শতম একটু গম্ভীর হয়ে বলে, এই শিলিগুড়িতেই তোমার জন্ম। এখানেই বড় হয়েছ। এখানে তোমার কত চেনা মানুষ, বন্ধুবান্ধব। এই জায়গা তোমার ভাল লাগে না কেন বলো তো?
বন্ধুবান্ধব আর চেনা লোককে তার আসার খবর দিতে বারণ করে দিয়েছে প্রীতম। তাই তেমন কেউ আসে না। কিন্তু শিলিগুড়ি কেন ভাল লাগে না প্রীতম বলবে কী করে? সে মাথা নেড়ে বলল, ভাল লাগবে না কেন? তবে সেই শিলিগুড়ি তো আর নেই।
সে তো ঠিকই! বউদি বা লাবুর জন্য মন কেমন করে বলে এমন মনমরা হয়ে থাকো না তো?
না, না। ওসব নয়। এখানেও তো তোরা আছিস। শতম একটু অহংকারের সঙ্গে বলে, হ্যাঁ, আমরা আছি। যারা বরাবর তোমার পাশে থাকব। তুমি অত ভাবো কেন?
না, ভাবি না।
শোনো, রূপমটা বি কম পড়তে পড়তে পড়া ছেড়ে দিয়ে বদ বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে। মেরে পাট পাট করেছি কয়েকবার। এখনও ভূত ছাড়েনি। আমি বাইরে বাইরে কাজে থাকি, নজর দিতে পারি না। ওকে তুমি একটু দেখো না!
প্রীতম শঙ্কিত হয়ে বলে, আমি! আমি কী দেখব?
তুমি ইনভলভড় হতে চাইছ না। কেন? আমরা তোমার কেউ নই?
প্রীতম একটু লজ্জিত হয়। বলে, আমি ঠিক শাসন-টাসন করতে পারি না, তুই তো জানিস।
শাসন বলতে যদি বকাঝকা আর মারধর হয় তবে বলি, ওতে রুপুর কিছু হবে না। রাস্তায় ঘাটে ও বিস্তর মারপিট করে। মারে, মার খায়ও। ওসবে ওর ঘাঁটা পড়ে গেছে। আর সে রকম শাসনের জন্য তোমাকে দরকার কী? আমি আর বাবা ওকে কম আসুরিক শাসন তো করিনি। এখন ওকে অন্যরকমভাবে ট্রিট করতে হবে। কিন্তু রকমটা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি ওর বড়দা, একটু দুরের লোক। কলকাতায় থাকো বলে ও তোমাকে খুব ভাল করে জরিপ করতে পারেনি এখনও। একটু সমীহও করে বোধহয়। দায়িত্ব নিলে হয়তো তুমি পারবে।
কথাগুলোর যৌক্তিকতা মনে মনে স্বীকার করে প্রীতম। কিন্তু ভিতরে কোনও আগ্রহ জাগে না তার। ছোট ভাইয়ের জন্য যেটুকু উদ্বেগ থাকা উচিত ছিল তাও তার নেই। উপরন্তু সে একটু ভয় পায়, কুঁকড়ে যায় মনে মনে। তবু বলে, ঠিক আছে। ওকে মাঝে মাঝে আমার কাছে পাঠিয়ে দিস।
মাঝে মাঝে নয়। আমি ভাবছি তোমার ঘরেই ওকে স্থায়ীভাবে থাকতে বলব। ও তোমার দেখাশোনাও করতে পারবে। অবশ্য যদি করে।
প্রস্তাবটা পছন্দ না হলেও প্রীতম বলল, আচ্ছা।
রূপমের টিকির নাগাল পেতে অবশ্য আরও দিন তিন-চার পেরিয়ে গেল। তারপর একদিন সন্ধেবেলা একটু কুণ্ঠিত পায়ে সে এসে ঘরে ঢুকল।
দাদা, ডেকেছ?
প্রীতম চোখ তুলে ভাইটিকে খুব মন দিয়ে দেখে। সবচেয়ে ছোট। ছেলেবেলায় এ ভাইটাকে খুব বেশি ভালবাসত প্রীতম। তারপর স্বার্থপরের মতো সেইসব ভালবাসা প্রত্যাহার করে নিয়েছে কবে।
রূপমের চেহারা খুব মজবুত নয়। অন্য ভাইদের চেয়ে বরং প্রীতমের সঙ্গেই তার চেহারার মিল বেশি। লম্বাটে গড়ন, রোগা। তবে প্রীতমের মুখে যে লাবণ্য ছিল তা এর নেই। কর্কশ শ্রীহীন মুখ। বোঝা যায়, শরীরের ওপর নেশার অত্যাচার বড় কম নয়। চোখে একটা তীব্রতা আছে, যা সব সময় কু-চিন্তা করলে হয়।
তাড়াতাড়ি প্রীতম লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কী বলা উচিত, কী বললে ভাল হয় তা ঠিক করতে পারল না সে। একটু বিভ্রান্ত বোধ করে এবং একটু বিরক্ত হয়েও সে বলল, একটু বাদে আসিস। মিনিট পনেরো পরে।
আচ্ছা।–বলে চলে গেল রূপু।
ততক্ষণ একটু দম ধরে থাকে প্রীতম। খুব বেশি আদর দেখালেও সন্দেহ করবে, খুব বেশি কঠোর হলে ছিটকে যাবে। তার চেয়ে সহজ, অকপট ব্যবহার ভাল। মনে মনে তৈরি হয়ে নিল
প্রীতম।
মিনিট পনেরোর মধ্যেই আবার এল রূপু।
প্রীতম খুব সরলভাবে বলল, তুই তো অ্যাকাউন্টেন্সি একটু বুঝিস। আমাকে একটু হেলপ করবি তো!
রূপু একটু হাসল। বলল, অ্যাকাউটেন্সি তো শিখিনি।
শিখতে সময় লাগে না। পড়াশুনো ছেড়ে দিয়েছিস শুনলাম।
কী হবে পড়ে? চাকরি পাব?
তা অবশ্য ঠিক।
তোমার মতো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হব তেমন মাথা আমার নেই।
তা হলে কী করতে চাস?
আমার আর্ট পড়বার ইচ্ছে ছিল। বাবা, মেজদা বারণ করল। বলল, বি কম করে কস্টিং পড়। আমার মাথায় কমার্স ঢোকে না। অবশ্য আর্টস পড়েও কিছু হত না।
আমার পাশে এসে বোস।
রূপু বিছানায় এসে বসে। পরনে প্যান্ট আর খয়েরি রঙের একটা হাতকাটা সোয়েটার। শিলিগুড়ির এই ভয়ংকর শীতের পক্ষে নিতান্তই তুচ্ছ পোশাক।
এই পোশাকে বেরোচ্ছিলি?
এখানে যা শীত! আমার শীত লাগে না।
আমার একটা ভাল পুলওভার আছে। সুটকেসটা খোল গিয়ে, ওপরেই আছে। আমি তো পরি না, তুই পর।
থাক না। তোমার লাগবে।
লাগবে না। যা, বের করে গায়ে দে।
রূপু উঠে গিয়ে পুলওভারটা বের করে। ক্রিম রঙের নরম উলে বোনা! নিউ মার্কেট থেকে বছর দুই আগে কেনা। খুব বেশি গায়ে দেওয়ার সময় পায়নি প্রীতম।
গায়ে দিয়ে রূপু বলে, একটু লুজ হচ্ছে।
তখন আমার স্বাস্থ্য ভাল ছিল। তবু আমারও একটু বড় বড় হত। ভেবেছিলাম, মোটা তো হবই, বয়স হলে সবাই হয়। তাই একটু বড়ই কিনে রাখি।
এ কথায় হাসল রূপু। বলল, আমার মোটা হতে দেরি আছে। চাকরি না পেলে—
দূর বোকা! মোটা হওয়া কি ভাল! রোগা লোকেরাই চটপটে হয়। এটা কিন্তু তোকে মানিয়েছে।
আরম্ভটা এইভাবে মন্দ হল না। ঘুষ দেওয়ায় এবং নরম সুরে কথা বলায় রূপম বোধহয় তাকে অপছন্দ করল না তেমন। জানালার ধারে একটা দড়ির খাঁটিয়ায় বিছানা পেতে শুতেও লাগল রোজ রাতে। প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, দাদা তোমার কিছু লাগবে? কিছু করব তোমার জন্য?
