ও তো রুমকির মা। আমি ভয় দেখাচ্ছিলাম। এমনি মজা করে বাঘের ডাক ডেকে উঠেছিলাম, হঠাৎ প্রায়ই করি ওরকম, কিছু হয়নি। তুমি আজ কেমন আছ দাদা, আমার মাথাটা বড্ড ধরেছে, এমন একটা জরদা পান খাওয়াল কিন্তু আমি জরদা খাই না তো, আজ খুব লেগে গেল, তুমি বরং শুয়ে পড়ো, আমি মাকে খুঁজে দেখি।
মা বাড়িতে নেই।
ও, তা আর কী করা যাবে, তা হলে আমি বরং খুঁজে দেখিগে কোথায় গেছে, কালীবাড়ি-টারি হবে ঠিক খুঁজে পেয়ে যাব। মেজদা বাড়ি ফেরেনি তো দাদা?
না। এখনও ফেরেনি।
তবে আমি যাই।— বলে পিছন ফিরল রূপম।
ভাই মদ খেয়েছে, এ ঘটনা তেমন স্পর্শ করে না প্রীতমকে। শুধু সে মনে মনে বলে, কলকাতায় আমি এর চেয়ে ঢের ভাল ছিলাম। সেখানে এই সব ঘটত না।
প্রীতমের যে প্রখর অনুভূতি কলকাতায় সক্রিয় ছিল তা এখানে আসার পর ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রীতম আজকাল চারদিকটাকে ভাল করে টের পায় না, লক্ষ করে না, পাত্তা দেয় না।
রূপম চলে গেলে সে আবার হিসেবে মন দিতে চেষ্টা করল।
রূপম সেই রাতে ফিরল না। খাওয়ার সময় প্রীতম খুব উদাস গলায় মাকে জানাল, রূপম সন্ধেবেলা এসেছিল। তোমাকে খুঁজছিল।
মা একটু কেমন ফ্যাকাসে গলায় বলে, তোর ঘরে ঢুকেছিল নাকি?
ঠিক ঢোকেনি। দরজা থেকে কথা বলে গেল।
রাঁধুনিও বলছিল, এসেছিল।
তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি?
না তো!
না হয়ে ভালই হয়েছে।
মা কোনও প্রশ্ন করল না। কাঁচুমাচু হয়ে চেয়ে রইল প্রীতমের দিকে। মার মুখের ভাব দেখেই প্রীতম বুঝতে পারে, রূপমের ব্যাপারটা মা খুব ভালই জানে। কিন্তু প্রীতম জেনে গেছে বলে ভয় পাচ্ছে।
প্রীতম অবশ্য কথা বাড়াল। এ বাড়ির সঙ্গে অলক্ষে তার একটা দুরত্ব রচিত হয়ে গেছে কবে থেকে যেন। এতকাল টের পায়নি। এখানে আসার পর থেকে পাচ্ছে। সেই দূরত্বটাকে প্রীতম আর পেরোতে চায় না। লাভ কী? কারও কোনও পরিণতিকেই তো আর সে ঠেকাতে পারবে না।
শোওয়ার পর প্রীতম অনেক রাত অবধি বাড়িতে একটা চাপা উত্তেজিত কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে চোখ বুজল সে। বাড়ির লোক হয়তো সবকিছু তাকে বলতে চাইছে না। সে তো ঠিক পুরোপুরি এ বাড়ির মানুষ নয়। তার খানিকটা গ্রাস করেছে কলকাতা, খানিকটা বিলু আর লাবু। এ বাড়িতে তার অধিকার সদরের চৌকাঠ অবধি। আর ভিতরে সে নিজেও ঢুকতে চায় না।
খুব ভোরবেলা, তার ঘুম ভাঙারও আগে, শতম এসে চুপ করে শিয়রে বসে তার মাথা স্পর্শ করে অনেকক্ষণ জপ করে যায়। কোনওদিন তা টের পায় প্রীতম, কোনওদিন পায় না। কিন্তু কে বলবে কেন, ওই জপটুকু তার আজকাল বড় জরুরি বলে মনে হয়। শরীরের মধ্যে, মনের মধ্যে কিছু একটা হয়। অনেক স্নিগ্ধ বোধ করে সে। সতেজ লাগে। বেলা বাড়লে আস্তে আস্তে অবশ্য সেই ভাবটুকু কেটে যায়।
আজও জপ করছিল শতম। প্রীতমের মনে কিছু অস্বস্তি ছিল কাল রাত থেকে, তাই ঘুম গভীর হয়নি। ভোররাতে শতমের জপের মাঝখানে সে চোখ চাইল। মশারির মধ্যে বালিশের পাশে সংকীর্ণ জায়গায় খুব কষ্ট করে মস্ত শরীরটাকে কুঁচকে শতম বসে আছে। শিরদাঁড়া সোজা, চোখ বন্ধ, মুখ গম্ভীর। সন্তের মতো এক উদাসীনতা আজকাল ছেয়ে থাকে শতমের মুখে। খুব গভীর ও শক্তিমান বলে মনে হয়। বোধহয় সেইজন্যই আজকাল প্রীতম একটু একটু নির্ভর করে ওর ওপর। নির্ভরতা আসছে। যদি সেই পথ বেয়ে নির্ভয়তাও আসে কোনও দিন!
চোখ চেয়ে শতমকে দেখে আবার চোখ বুজে থাকে প্রীতম। সে নাস্তিক না ঈশ্বরবিশ্বাসী তা সে নিজেও জানে না। কোনওদিন ওসব নিয়ে মাথাই ঘামায়নি। ভবানীপুরের বাসায় কোনও ঠাকুর-দেবতার ছবি পর্যন্ত নেই। এমনকী বিলু ভগবান মানে কি না তাও সে স্পষ্ট জানে না। সোজা কথা, এতকাল ভগবান নিয়ে ভাবার অবকাশই হয়নি তার। কঠিন এই অসুখে পড়েও ঈশ্বরের শরণ নেয়নি সে। কিন্তু তা নাস্তিক বলে নয়, নেহাত মনে পড়েনি বলে।
বিলু কি নাস্তিক? তার অসুখ হওয়ার পর বিলু একবার দক্ষিণেশ্বরে গিয়েছিল মনে পড়ে। তা ছাড়া আর কিছু মনে নেই। তবু বিলুর নাস্তিক হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ অরুণ ঘোর নাস্তিক, আর বিলু বরাবর অরুণেরই অনুগামী।
বুকের মধ্যে একটু জ্বালা করে ওঠে প্রীতমের। পুরুষের স্বাভাবিক অধিকারবোধ আর ঈর্ষা তাকে এখনও ছাড়েনি। কিন্তু ছাড়া উচিত ছিল। সে তো বিলুকে বলেই এসেছে, বিলু যেন অরুণকে বিয়ে করে। সেটা অবশ্য হয়ে উঠবে না। অরুণ বোধহয় এতদিনে বিয়ে করে ফেলেছে। তা হলে বিলু কী করবে? চিরকাল অরুণের উপপত্নী হয়ে থেকে যাবে না তো! ভেবে গা-টা একটু রি রি করে ওঠে তার।
আবার চোখ খোলে প্রীতম। ভোরের আলো আর-একটু স্পষ্ট হয়েছে। ধ্যানস্থ শতমকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে এই আলোয়। চলছে জপ, শব্দের তরঙ্গ। এইসব জিনিসের সঙ্গে কোনও যোগ নেই। তার। তবু মাথা স্থির রেখে শুয়ে থাকে সে। ভাল কিছু, সুন্দর কিছু ভাববার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই মনে পড়ে না। একমাত্র লাবুর মুখখানা হঠাৎ মনে পড়ে যায়। এই একমাত্র জন যার সঙ্গে তার সম্পর্ক শর্তহীন, জটিলতাহীন। লাবুর মুখখানাই মনে মনে আঁকড়ে থাকে সে।
জপ শেষ করে নিঃশব্দে চলে গেল শতম। আবার এল চায়ের কাপ হাতে অনেকক্ষণ বাদে। বলল, বেড়াতে যাবে দাদা?
আমি? আমি কী করে যাব?
খুব পারবে। আমরা তো সঙ্গেই থাকব।
কোথায়?
তুমি তো পাহাড় ভালবাসো না তেমন। পাহাড়ে এখন শীতও খুব। বীরপাড়ার কাছে আমার বন্ধু প্রত্যুষের এক চা-বাগান আছে। ভাল বাংলো। কদিন গিয়ে থেকে আসবে? সবাই যাব।
