কয়েক রাত ভাল ঘুম হচ্ছে না প্রীতমের। বিলু শিগগির আসবে না। লাবুকে অনেকদিন দেখতে পাবে না সে। এসব ভাবনা আছে। আর নতুন এক রহস্যময় প্রশ্ন তাকে বড় জ্বালাতন করে। বিলুকে এখনও সে এত গভীরভাবে ভালবাসে কী করে? কেন বাসে? বিলুকে ছেড়ে এসে কেন শিলিগুড়ি একদম ভাল লাগছে না তার?
সামনে একটু বাগান ছিল। শতম তার ব্যাবসার কাজে একগাদা পাথরকুচি এনে ফেলেছিল। এখন বাগানময় সেই পাথরকুচি ছড়িয়ে রয়েছে। গাছপালা নেই-ই বলতে গেলে। শুধু ফটকের দু’ধারে দাউ দাউ করে জ্বলছে লালচে বোগেনভেলিয়া। এই বাগান, বোগেনভেলিয়া, নর্দমা, রাস্তা, বাড়িঘর সবই প্রীতমের সত্তায় জড়িয়ে রয়েছে। তবু হায়, এই সকালের রোদে বারান্দায় বসে কোনও শৈশবস্মৃতিই আসে না তার মনে! বরং জায়গাটাকে অচেনা, অনভ্যস্ত লাগে কেবল।
বসে থাকতে থাকতে রোদে চোখ জ্বালা করে। চোখ বুজলে নিদ্রাহীন রাত্রির প্রতিশোধ নিতে অসময়ের আচমকা তন্দ্রা এসে চোখ এঁটে ধরে। প্রায় রোজই এইভাবে ঘুমিয়ে পড়ে প্রীতম। ভয়ে কেউ তাকে জাগায় না। অনেক বেলায় শতম যখন ফেরে তখন ডাকে।
সকাল বিকেল এক ডাক্তার এসে দেখে যায় তাকে। নতুন কোনও ডাক্তার নয়। বাবুপাড়ার সেই পুরনো বয়স্ক ডাক্তার সেনগুপ্ত। প্রায় ছেলেবেলা থেকেই এঁর চিকিৎসায় বড় হয়েছে তারা। লম্বা চওড়া ডিগ্রি নেই, সাদামাটা এম বি বি এস। কিন্তু ভাল বিচক্ষণ ডাক্তার।
কলকাতার ডাক্তার যে কেস-হিস্ট্রি লিখে দিয়েছিল সেইটে পড়ার পর প্রথম দিনই ডাক্তার সেনগুপ্ত বলেছিলেন, এ রোগ বাঁধালে কী করে?
উদ্বিগ্ন শতম জিজ্ঞেস করে, আপনি পারবেন তো?
কালীভক্ত ডাক্তার সেনগুপ্ত একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বললেন, সবই মায়ের ইচ্ছে। দেখি কী হয়!
তলে তলে শতম এক হোমিয়োপ্যাথের কাছ থেকেও ওষুধ আনে। মালিশের তেল তো আছেই।
শতম যে একাই চেষ্টা করছে তা নয়। মরম কোত্থেকে একটা মাদুলি এনে মা’র হাতে দিয়েছে। মা সেটা বেঁধে দিয়েছে ডান হাতে। বাবা বিদেশের বিভিন্ন হেলথ রিসার্চ সেন্টারে চিঠি লিখছে। সবাই তটস্থ, সক্রিয়।
শুধু প্রীতমেরই মাঝে মাঝে মনে হয়, এত চেষ্টা সব বৃথা। সে আর কোনওদিনই ভাল হবে না। শেষ ক’টা দিন যদি কলকাতায় গিয়ে থাকতে পারত।
পুজো এল, চলে গেল। চারদিকে ঢাকের বাদ্যি, লাউড স্পিকার, আলো, ভিড় একেবারেই স্পর্শ করল না প্রীতমকে। এ বাড়ির কাউকেই করল না তেমনভাবে। এমনকী এবার কারও জন্য জামাকাপড়ও কেনা হল না পুজোয়। পুজোর দিন ক’টা শুধু একটু ছটফট করল প্রীতম। বিলুর অফিস ছুটি ছিল, আসতে পারত। বিলুর বদলে অবশ্য তার চিঠি আসে। তাতে কী লেখে তার খোঁজ নেয় না প্রীতম। বাবাকে লেখে, বোনকে লেখে, ওরাই জবাব দিয়ে দেয়। আর চিৎকখনও আসে দীপনাথের চিঠি। খুব ব্যস্ত। উত্তরবাংলায় ট্যুরে আসার কথা ছিল, কিন্তু তা কেবলই স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। তার বদলে দীপনাথ বাংগালোর, রাঁচি, দিল্লি ঘুরে এল। বড্ড ব্যস্ত, সময় নেই। প্রীতম যেন ভাল থাকে। চিঠি পড়ে প্রীতম ম্লান হাসে। তারই কোনও ব্যস্ততা নেই।
তবে কাজ আছে। আজকাল শতম তাকে অনেক হিসেবপত্রের কাজ গুছিয়েছে। টুকটুক করে সেগুলো করেও ফেলছে প্রীতম। খুব খারাপ লাগছেনা। পেনসিল বা কলম ধরতে কিছুদিন আগেও আঙুলে কিছু জড়তা ছিল। ক্রমে সেটা কমে যাচ্ছে বা সয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ তো ঠিক কাজ নয়। কাজ-কাজ খেলা। শতম তাকে খেলনা দিয়ে মৃত্যুর কথা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
সবচেয়ে ছোট ভাই রূপম। বছর সতেরো-আঠারো বয়স হবে। ভাইদের মধ্যে বোধহয় সে-ই একটু বখা-গোছের ছেলে। অনেককাল খোঁজ রাখেনি প্রীতম, তাই কে কেমন হয়ে উঠেছে তা সঠিক জানে না। তবে বার কয়েক কথা বলার সময় ওর মুখে সিগারেটের গন্ধ পেয়েছে। প্রায়ই বেশ রাত করে ফেরে। মাঝে মাঝে যেসব ছেলে তাকে এসে ডেকে নিয়ে যায় তাদের চেহারা-ছবি অন্য ধরনের। বখা ইয়ারবাজ ছেলে বলে মনে হয়। তারা কেউ বাড়ির মধ্যে ঢোকে না কখনও। এসব মিলিয়ে দুইয়ে দুইয়ে চার করল প্রীতম।
তবে এতেও তো তার কিছু যায় আসেনা। সংসারের সঙ্গে যত না জড়িয়ে থাকা যায় সেই চেষ্টায় সে চোখ কান বন্ধ করে থাকে। যা ইচ্ছে তোক।
বিজয়াদশমীর রাতে বাড়িতে একটা চাপা গন্ডগোল শুনেছিল প্রীতম। কে কাকে বকছে। গলাটা মা’র। কাকে বকছে তা বোঝেনি প্রথমে। সম্ভবত তার ভয়েই এইসব গুজ-গুজ ফুসফুস চাপাচাপি।
ঘটনাটা আরও স্পষ্ট হল কালীপূজার দিন। চৌ-পহর রূপম বাড়িতে নেই। সন্ধেবেলা বাসাটা ফাঁকাই ছিল। বাবা গেছেন কালীবাড়িতে মাকে নিয়ে আরতি দেখতে। অন্য ভাইবোনরাও বেরিয়েছে একটু। প্রীতম নিজের ঘরে বসে খাতাপত্র খুলে হিসেব কষছিল। এমন সময় খুব জোরে কড়া নড়ে উঠল। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক জোরে ঘটাং ঘটাং করে সে কী আওয়াজ! রান্নার জন্য যে বয়স্কা বিধবাটিকে রাখা হয়েছে সে গিয়ে দরজা খুলে দিল। তারপর একটা চিঙ্কার।
প্রীতম হতচকিত হয়ে কিছুক্ষণ নড়তে পারেনি। বাড়িতে ডাকাত পড়ল নাকি? আজকাল শিলিগুড়িতে ভীষণ ডাকাতি হয়।
একটু বাদেই রূপম এসে তার ঘরের দরজায় দাঁড়াল, আকণ্ঠ মদ খেয়েছে, চোখে মোদো চাউনি। চৌকাঠে ভর রেখে দাঁড়িয়ে বলল, দাদা, আমার শরীরটা খারাপ, কিছু মনে কোরো না। মা কোথায় বলো তো?
প্রীতম সবই বুঝল। কিন্তু সেই চেঁচানিতে যে বুকে কঁপুনি উঠেছিল, সেটা তখনও রয়েছে। আড়ষ্ট শরীরে ভাইয়ের দিকে চেয়ে বলল, চেঁচিয়েছিল কে বল তো!
