রাগের গলায় প্রীতম ডাকে, মা! মা!
ছবি দৌড়ে আসে। পরনে স্কুলের খয়েরি পাড় শাড়ি, চুল আঁচড়ানো, মুখে পাউডার। বলল, কী দাদা?
দেখ তো, কী বিচ্ছিরি তেল মাখিয়ে গেছে। গা-টা মুছিয়ে দেওয়ার কেউ নেই।
আমি দিচ্ছি, দাঁড়াও। মা গেছে কালীবাড়ি।
থাক গে, তুই স্কুলে যা।
কিছু হবে না, মুছে দিচ্ছি দাঁড়াও।–বলে দৌড়ে গিয়ে একটা গামছা আনে ছবি।
লজ্জা পেয়ে প্রীতম হাত বাড়িয়ে গামছাটা নিয়ে বলে, তুই যা, আমি পারব।
ছবি দ্বিধাভরে দাঁড়িয়ে থাকে একটু। আর চাপাচাপি করতে সাহস পায় না। দাদা হয়তো রেগে যাবে। বড় রেগে যায়।
আসছি তা হলে, দাদা!–বলে ছবি চলে যায়।
গামছাটা পায়ের কাছে মেঝেয় ফেলে দিয়ে চুপ করে বসে থাকে প্রীতম। বুকের মধ্যে এক অক্ষম রাগের মাথা খোঁড়াখুঁড়ি। অভিমানের বান ভাসিয়ে নিচ্ছে তাকে।
গাড়োয়ান যেমনভাবে তার দুই অবাধ্য গোরুকে সামলায়, চাবুক মারে, পাঁচনের গুঁতো দেয়, ঠিক তেমনিভাবে নিজেকে লক্ষ করে প্রীতম বলে, র’-র’! শক্ত হও। শক্ত হও। তুমি কখনও এরকম ছিলে না। তুমি এরকম নও। মনে করা, পৃথিবীতে তোমার কেউ নেই। ইউ আর এ লোন বাস্টার্ড।
কিন্তু এই মনের খেলা বেশিক্ষণ খেলতে পারে না প্রীতম। বড় ক্লান্তি আসে, হতাশা, ধৈর্যহীনতা আসে।
দুপুরে শতম খেতে আসে। একবার উঁকি মারে ঘরে।
দাদা!
আয়।
ঘুমোওনি?
না।
বড় বেশি রেস্টলেস দেখছি তোমাকে।
না, না, ভাল আছি।
ভালই তো আছ। তবে কেন মাকে বলছ, কলকাতা যাবে!
ভাবছিলাম, চেষ্টা করলে হয়তো এখনও অডিটের কাজ করতে পারি ঘরে বসে। সময়ও কাটবে, কিছু টাকাও আসবে।
করবে? তা তার জন্য কলকাতা কেন, এখানেই কাজ দেব।
দিবি? দে না!
শতম দুপুরেই একগাদা কাগজপত্র সমেত গোটা তিনেক ফাইল প্রীতমের চৌকির পাশে একটা টেবিল এনে রেখে গেল। সঙ্গে রেখে গেল একটা টেপ-রেকর্ডার আর অনেকগুলো গানের ক্যাসেট। বলল, হিসেব করতে করতে টায়ার্ড লাগলে একটু গান শুনো। তুমি তো একটু-আধটু গাইতেও পারতে। গাও না কেন?
দুর, বরং হিসেব করলেই ভাল থাকব।
যা খুশি করো। শুধু মরার কথা ভেবো না।
প্রীতম অনাবিল হেসে বলে, আচ্ছা, তুই যা তো।
শিলিগুড়িতে বেশ শীত পড়ে গেছে এই শরতের শুরুতেই। দুপুরেও গায়ে একটা কিছু দিতে হয়। পায়ের জানালাটা দিয়ে রোদ আসে।
প্রীতম নির্জন দুপুরে খানিকক্ষণ ফাইলের কাগজপত্র দেখল। ছক কেটে অনেকগুলো এন্ট্রি করল। আস্তে আস্তে অ্যাকাউন্টেন্সির পুরনো নেশা খুব পেয়ে বসল তাকে। বিলু হলে বাধা দিত। এখানে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। দরজা ভেজানো। একটানা অনেকক্ষণ কাজ করে গেল সে। শতমের ব্যাবসার কাগজপত্র থেকে সে জানতে পারল, বছরে কম করেও শতম ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা রোজগার করে। জেনে ভারী খুশি হল সে।
বিকেলের দিকে ক্লান্তি এল। চোখ বুজে শুয়ে বিশ্রাম নিতে গিয়ে হঠাৎ শতমের সেই কথাটা মনে পড়ল, অভ্যস্ত কাজ ছেড়ে অন্য কাজ করলে মানুষের বিশ্রাম হয়। ভেবে একটু অবিশ্বাসের হাসি হাসল সে। তবু এক্সপেরিমেন্ট করতে উঠেও বসল সে।
গান গাইবে? গাইত এক সময়। অল্পস্বল্প। কতকাল গায় না! ভুলে গেছে কথা সুর।
বালিশে ঠেস দিয়ে চোখ বুজে নিচু স্কেলে সে গুনগুন করল কিছুক্ষণ। অনেক বিস্মৃতি আর অনভ্যাসের পলিমাটি পড়েছে গলায়। তবু কিছুক্ষণ চেষ্টার পর সে মোটামুটি সুরের ওপর রেখে গাইতে লাগল, দোলাও দোলাও দোলাও আমার হৃদয়…।
আশ্চর্য! ক্লান্তিটা ধীরে ধীরে কেটে গেল।
শতম অনেক রাতে এসে হানা দিল ঘরে। বলল, দেখি, কী করলে সারাদিন!
কাগজপত্র উলটেপালটে দেখে বলল, বাঃ! এ যে অনেকটা হিসেব করে ফেলেছ। বলে খানিক চুপ করে শতম বলে, তোমাকে খাটাচ্ছি জানলে বউদি আমাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু না খাটালে যে হবে না। মানুষ নিজের ক্ষমতা টের পেলে বুঝত সে কতখানি। খাটতে খাটতে শরীর যখন ভেঙে পড়ে, হাত-পা চলতে চায় না, তখনও ইচ্ছে করলে জোর করে মানুষ ফ্যাটিগ লেয়ার পেরিয়ে যেতে পারে। তখন দেখা যায় ক্লান্তি ঝেড়ে সে আবার দ্বিগুণ কাজ করছে।
তোর অডিট আমিই করে দিতে পারব।
দিয়ো। তুমি থাকতে আমি অন্যের কাছে খামোখা যাব কেন?
আগের রিটার্নের রেকর্ডটা দেখলাম। সব কিছুই রিটার্নে দেখাস কেন? অনেকগুলো এন্ট্রি না দেখালেও চলত।
আমি কিছুই লুকোই না।
প্রীতম মাথা নাড়ল, বুঝেছে। শতম আর পাঁচজনের মতো নয়। সামান্য একটু অহংকার বুকের পালে এসে লাগে।
শতম বিছানায় বসে বলে, রোজ রাতে খাওয়ার পর আমি মা ছবি মরম রূপম পুঁচকি মিলে আড্ডা দিই। তা জানো?
তো! টের পাই না। তোমাকে কেউ ভয়ে আড্ডায় ডাকে না।
প্রীতমের অবশ্য এই পারিবারিক আড্ডা ভাল লাগার কথা নয়। একা ঘরে বসে ভবানীপুরের বাসার স্মৃতি আঁকড়ে গুমরে গুমরে উঠতেই সে বোধহয় আনন্দ পায় বেশি। তবু ভদ্রতাবশে সে বলল, ভয়ের কী? ডাকলেই পারতিস।
ডাকব না। মাঝে মাঝে সবাই মিলে তোমার ঘরেই চলে আসব।
বেশ তো।
আজ গান গেয়েছিলে? ছবি বলছিল, দাদার গলায় এখনও কী সুর!
ধ্যেত!
বউদির একটা চিঠি এসেছে আজ। দেখেছ?
না তো, কেউ দেয়নি আমাকে।
তোমাকে লেখা নয়। বাবাকে লেখা।
কী লিখেছে?
বউদি নভেম্বরের আগে আসতে পারবে না। ডিসেম্বরও হতে পারে।
ও।
এ মাসেই আসার কথা ছিল।
আর কোনও খবর নেই, না?
না।
প্রীতম বসে ছিল। আস্তে আস্তে শুয়ে চোখ বুজল।
৫২. দক্ষিণের খোলা বারান্দায়
সকালে দক্ষিণের খোলা বারান্দায় ইজিচেয়ারে নরম কাঁথা বিছিয়ে বসানো হয় প্রীতমকে। চনচনে শীত পড়ে গেছে এখানে। গলা পর্যন্ত শাল দিয়ে ঢাকা থাকে তার। পায়ে মোজা। সামনের এই বারান্দাটা চমৎকার। সামনে কাঁচা নর্দমা আর কিছু অসুন্দর কাঠের বাড়ি বাদ দিলে চেয়ে থাকতে খারাপ লাগে না। রোদ এসে কোমর পর্যন্ত তপ্ত করে রাখে। এদিকে পাহাড় দেখা যায় না বটে, কিন্তু অনেকখানি আকাশ দেখা যায়। খুব নীল, খুব গভীর। শুধু একটাই অসুবিধে। বারান্দায় বসলেই রাস্তা দিয়ে যত চেনা মানুষ যায় সবাই দাঁড়িয়ে কুশল প্রশ্ন করে, অসুখের ইতিবৃত্ত জানতে চায়। সেটা ভারী অস্বস্তিকর।
