ওসব বুজরুকি দিয়ে কী হবে? তেলপড়ায় অসুখ সারলে এত লোক ডাক্তারের কাছে যেত না।
খুবই যুক্তিপূর্ণ জবাব। অবশ্য প্রীতম নিজেও তেলপড়ার গুণে খুব বিশ্বাসী নয়। কিন্তু তার মন বলত, আমি যদি তোমার প্রিয়জনই হয়ে থাকি, তবে আমার কঠিন অসুখের সময় তুমি লজিক মেনে চলতে পারো কী করে? মানুষ যাকে ভালবাসে তার একটু কিছু হলেই সে পাগল হন্যে হয়ে যায়। তখন যুক্তি থাকে না, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন থাকে না, সে তখন ডাক্তার বদ্যি, তাবিজ তাগা মাদুলি জলপড়া মাথাখোঁড়া ধরনা দেওয়া সব করে করে বেড়ায়। তাতে কাজ না হোক, উদ্বেগ আর ভালবাসার একটা জমজমাট প্রকাশ তো ঘটে। বিলুর ঠান্ডা মুখশ্রী আর ক্ষুরধার বুদ্ধির সামনে কচুকাটা হয়ে গেল প্রীতম। কিন্তু বিলু জানে না, সংসারে সব লড়াই জিততে নেই।
তেলের প্রথম শিশিটা কৌতূহলভরে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছিল লাবু। গৌরাঙ্গবাবু খবর পেয়ে আবার তেল এনেছিলেন। দ্বিতীয় শিশিটা আবার তাকে তোলা রইল। মাস দুই পরে একদিন শিশিটা নজরে পড়ায় গৌরাঙ্গবাবু প্রীতমকে একান্তে বললেন, আজকালকার ওয়াইফরা কেমন বলুন তো মশাই? এদের কাছে স্বামী কি কোনও ফ্যাক্টরই নয়? আমি বলে গেলাম আপনাকে, যদি বাঁচতে চান তা হলে নিজের মায়ের কাছে চলে যান।
এখন মা পায়ের গোছ থেকে ঊরু পর্যন্ত টান টান করে ভারী এবং দুর্গন্ধযুক্ত তেলটা মালিশ করে দিচ্ছে। মুখে কথা নেই। মা জানে, প্রীতমের মেজাজ এখানে এসে ভাল থাকছে না। এখানে মন বসতে সময় নেবে। এ জীবনে তো তার বহুকাল অভ্যাস নেই।
নিষ্ঠুর হোক, শীতল হোক তবু বিলুর প্রতি এক চোখভরা তীব্র আকর্ষণ আজও আছে প্রীতমের। শুধু আছে নয়, এখানে আসার পর তা আরও তীব্র হয়েছে। সব দাবি-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে এসেছিল, তবু মন থেকে বিসর্জন দেওয়া গেল না। তেমনি বুকে ঢেউ দেয় লাবুর কথা মনে হলে। সারাদিন ভবানীপুরের সেই ঘরটার ছবি চোখে ভাসে। নাকে আসে লাবুর গায়ের গন্ধ। বিলুর স্পর্শ টের পায় যেন শরীরে।
প্রীতম ডাকল, মা!
উঁ!
শতমকে বলো, আবার আমায় কলকাতায় দিয়ে আসুক।
ভাল হ, যাবি।
আমার এখানে খুব ভাল লাগছে। কিন্তু কলকাতায় থাকলে ঘরে বসেও আমি কিছু কাজ-টাজ পাই, রোজগার করতে পারি।
মা কথাটার কোনও জবাব দিল না, কিন্তু আপন মনে বলতে লাগল, বউ-মেয়ের জন্য মন তো কেমন করবেই। কিন্তু সেখানকার যা অবস্থা শুনি কে কাকে দেখে।
প্রীতমের এসব কথাও ভাল লাগে না। চোখ ফিরিয়ে সে জানালার বাইরে কলকে ফুলের গাছটার দিকে চেয়ে থাকে। ঘন সবুজ পাতায় ঝোপ ফেলেছে জানালাটাকে। তার ওপাশে শরতের নীল আকাশ জুড়ে অফুরন্ত রোদ।
প্রীতম চুপ করে থাকে। তেল মালিশ করা শেষ হলে মা আবার নিঃশব্দেই চলে যায়।
বাড়ির লোক এ ঘরে কমই আসে। প্রীতমের বিরক্তি ও বদমেজাজ সবাই লক্ষ করেছে। এমনিতেও প্রীতমকে সবাই বরাবর একটু সমঝে চলে। বাবা একদমই ঘরে ঢোকে না। মেজো বোনটার সঙ্গে ভাব ছিল খুব এক সময়ে। সে মাঝে মাঝে আসে, গল্প করে বসে বসে। কিন্তু অল্পেই ক্লান্তি আসে প্রীতমের। তার কেবল ভবানীপুরের বাসার কথা ভাবতে ইচ্ছে করে, চুপচাপ শুয়ে থাকে।
বিলুকে একটা পৌঁছ-সংবাদ দিয়েছিল প্রীতম। তারপর বিলুর তিন-চারখানা চিঠি এসেছে। প্রীতম জবাব দেয়নি। মেজো বোন ছবি এসে বহুবার বলেছে, বউদিকে চিঠি দেবে, দান? দিলে বলল, লিখে নিচ্ছি।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলেছে, তোরাই দে। আমার ইচ্ছে করছে না।
নিজে চিঠি না লিখলেও বিলুর চিঠির জন্য উৎকণ্ঠা থাকে সব সময়ে। আজকাল বিলু বাবাকে বা শতমকে বা ছবিকেই চিঠি দেয়। বেশ ঘন ঘন দেয়। প্রীতমের সব খবর খুঁটিয়ে জানতে চায়। ওরা কী জবাব দেয় তা জানে না প্রীতম! জিজ্ঞেস করে না। কিন্তু বিলুর চিঠি যখন আসে তখন বুকটা কেঁপে ওঠে উত্তেজনায়, আবেগে।
বিলুর প্রতি নিজের এই অন্ধ ভালবাসা দেখে অবাক মানে প্রীতম। ওই ঠান্ডা, নিরুত্তাপ যুক্তিবাদী নিষ্ঠুর মহিলাকে এতকাল ধরে কী করে ভালবাসছে সে?
নিজেকেই প্রশ্ন করে প্রীতম, ও যে অরুণের সঙ্গে… তোমার ঘেন্না করে না প্রীতম?
নিজেই জবাব দেয়, করে তো! শিউরে উঠি, কেঁপে উঠি ঘেন্নায় লজ্জায়। তবু অন্ধ অবাধ্য এক মমতা কেন যে মনের মধ্যে টলটল করে!
নিজেকে বিষিয়ে ফেলো, প্রীতম। অব্যাহত রাখো ঘৃণাকে। কখনও ক্ষমা কোরো না, নরম হোয়ো নাকো।
বিষিয়ে গেছি। জ্বলছি। টানটান রাখছি নিজেকে। তবু স্পঞ্জের মধ্যে যেমন লুকোনো জল নিংড়োলেই বেরিয়ে আসে এই ভালবাসাও তেমনি।
অবিশ্বাসী স্ত্রীকে ভালবাসা কি ঠিক, প্রীতম?
শোনো শোনো। আমার লাবু যদি শত অন্যায়ও করে তবু কি আমি তাকে না ভালবেসে পারি? বলো! যা-ই করুক তবু মনে হবে, ও যে আমার লাবু! আমার ছোট্ট লাবু! বিলুর প্রতি আমার ভালবাসাও অবিকল সেরকম। যা-ই করুক, যেমনই হোক, ও যে বিলু।
তোমার বিলু?
হতাশায় মাথা নেড়ে প্রীতম বলে, তা বলছি না। বিলু কার তা কী করে বলব? কিন্তু মন! মনকে কী করে মেরে ফেলা যায় বলো তো! বিলুকে আমি এক ফোটাও ক্ষমা করিনি, জানো? তবু বিলুকে মন থেকে তাড়াবই বা কী করে? যায় না যে!
কিন্তু বড় জঘন্য যে তার পাপ!
মানুষ কখনও পাপ থেকে মুক্তি পায় না, না? কিছুতেই শুদ্ধ হয় না? মুক্ত হয় না?
উত্তেজিত প্রীতম কাত হয়ে দু’হাত ভর দিয়ে উঠে বসে বিছানায়। সারা গায়ে ঘন তেলের প্রলেপ। পায়জামাটা তেলে ভিজে সপসপ করছে। গায়ের বুকখোলা শার্টটা নিংড়োলে বোধহয় এক-পো তেল বেরোবে।
