একটা শ্বাস ফেলে খামে আবার চিঠিটা ভাঁজ করে ভরে রাখে দীপনাথ।
সুখেন বহুদিন পর বাড়ি গেছে. পড়ুয়া ছেলেটাও দিন-দুই হল দেশে। ঘরে আজ দীপনাথ একা। রাতে সে কিছুই খেলনা। বাতি নিভিয়ে অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে রইল। সে আর খুব বেশিদিন এই মেসে থাকবে না। আর-একটু ভালভাবে থাকার জন্য সে এবার একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নেবে। রান্নার লোক রাখবে।
ভাবতে ভাবতে টান টান হয়ে উঠে বসে সে। নিজেকেই প্রশ্ন করে, না হয় বাসা নিলাম, লোক রাখলাম, কিন্তু তারপর? তারপর কি জীবন আমুল পালটে যাবে? নতুন কিছু ঘটবে?
বুকের একটা জায়গায় অসাবধানে মণিদীপার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের তীক্ষ্ণ নখে সামান্য আঁচড় লেগেছিল। ঘামে ভিজে এখন সেই জায়গাটা সামান্য জ্বালা করছে। মৌমাছির হুলের জায়গাগুলো এখনও সামান্য ফুলে আছে। কী করবে দীপনাথ? কী করবে?
নিশিতে পাওয়ার মতো বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সে। দরজা খুলে রাস্তায় নেমে আসে। নিশুত রাতে ফুরফুরে হাওয়া ছেড়েছে। কুকুররা ঝগড়া করছে মোড়ে। গলির মুখে দাঁড়িয়ে দেখে এত রাতে ঠেলাগাড়িতে কাদের মাল যাচ্ছে কোথায়। আকাশভরা তারা ফুটে আছে। মাঝরাতে এইভাবে জেগে উঠে দীপনাথের কাছে আজ হঠাৎ আবার বহু দূরের এক মহাপর্বতের সংকেতবার্তা এসে পৌঁছোয়। মানুষের জীবন নানা পঙ্কিলতায় ভরা, যুক্তিহীন, পরিণতিহীন, আনন্দহীন— ওই জীবন ছেড়ে চলে এসো দীপু। আমি বহুকাল তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
যাবে দীপনাথ। বড় উচাটন হয়ে ওঠে মন। কোথায় কোন দুর্গম প্রান্তর, পাথুরে জমি, চড়াই-উতরাই ভেঙে যেতে হবে তার তো কোনও ঠিক নেই। কোন দিক থেকে সংকেত ভেসে আসছে, তা সে জানেও না ভাল মতো। শুধু তার পালে সেই পাহাড়-ছোয়া বাতাস এসে লাগে। বলে, উজানে যাও, উজানে যাও।
৫১. প্রীতম জিজ্ঞেস করে
প্রীতম জিজ্ঞেস করে, তুই কোত্থেকে শিখলি এসব?
শতম লজ্জা পায়, শিখেছি, শিখেছি। দেখো না তোমাকে ভাল করে তুলবই।
তোর মনের জোর আছে। আমার নেই।
জোর-টোর নয়, আসলে তোমার ইচ্ছে নেই। তুমি কি বিশ্বাস করো না, যার মনে যত প্যাঁচ-ঘোচ, যত কুটিলতা জটিলতা তার তত ব্যারাম? খামোখা কারও ব্যারাম হয় না। রোগের প্রথম অঙ্কুর গজায় মনে। তারপর তা শরীরে ফুটে বেরোয়।
ম্লান হেসে প্রীতম বলে, আমার মনে বোধহয় অনেক প্যাঁচ-ঘোঁচ, অনেক জটিলতা কুটিলতা। মাথা নেড়ে শতম বলে, তা নয়। তবে তোমার একটা রোগ-বোগ বাতিক ছিল দাদা। শরীর নিয়ে তুমি বড় বেশি ভেবেছ।
তা ভেবেছি।
তোমার কখনও ভাবতে ইচ্ছে করেনি যে, এই শরীর মানুষকে দেওয়া হয়েছে কাজ করার জন্য। বসিয়ে বাখার জন্য নয়! যত শরীর-শরীর করবে তত আজ চুলকুনি, কাল পাঁচড়া, পরশু আর একটা না একটা কিছু এসে ধরবেই।
শরীরকে ভুলে যেতে বলছিস?
একদম। গতর পুষে রাখার জন্য তো নয়। মনের ওপর শরীরের সব ভালমন্দ। মনটাকে তাজা রাখো, শরীর উজ্জ্বল হবে। আর বসে বসে মরণের চিন্তা করো, শরীরে তাব ছায়া পড়ে যাবে। শরীরকে কখনও বিশ্রাম দিয়ো না। খাটাও, কেবল খাঁটিয়ে যাও।
প্রীতম হেসে বলে, বিশ্রাম নেব না?
নেবে। কে নেবে না? তবে শরীরের বিশ্রাম কেমন জানো?
কেমন?
তুমি তো অ্যাকাউন্ট্যান্ট! রোজ হিসেব-নিকেশ করতে করতে যখন ক্লান্তি আসে তখন যদি হঠাৎ একটু টেবিল টেনিস খেলো বা কবিতা লেখো, কি একটু বাগান করলে, সেইটেই বিশ্রাম। রোজকার অভ্যস্ত কাজ ছেড়ে অন্য কাজ করলে শরীর বিশ্রাম পায়।
ঘুমোব না?
ঘুমোবে। দিনে রাতে চার ঘণ্টা।
বলিস কী? ডাক্তাররা যে আট ঘণ্টার কথা বলে।
বলে তোত কী? শরীরের জন্য চার ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট। দেখ না কুলি-লাইনের পশ্চিমারা সার। দিন মাল বয়, অসুরের মতো খাটে, আবার কত রাত অবধি জেগে ‘রামা হে’ গান গায়। আবার ভোররাতে কাজে বেরিয়ে পড়ে। ক’ঘন্টা ঘুমোয় বলো তো! তারা বেঁচে নেই? তোমার আমার চেয়ে ঢের ভালভাবে বেঁচে আছে। ওই যে চার ঘণ্টা ঘুমোয় সে ঘুম খুব গভীর, নিপাট, গায়ের ওপর দিয়ে মোষ হেঁটে গেলেও টের পাবে না তা জানো?
জানছি।
ভুল বললাম?
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, না। তবে এত সব ভাল করে কখনও লক্ষ করিনি।
এখন থেকে করো। শরীর নিয়ে ভেবো না।
রোজ সকালেই এরকম কিছু উজ্জীবক কথাবার্তা বলে শতম তার মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যায়। দুধের গ্লাস হাতে আসে। শরীর নিয়ে কখনও কিছু বলে না। কথাবার্তা অনেকটা কমে গেছে। দুধের মধ্যে অনেকটা সর তুলে নিয়ে আসে। পাশে বসে চামচ দিয়ে খুঁটে খুঁটে সরটাকে দুধের মধ্যে মেশাতে থাকে। এতে নাকি বেশি পোষ্টাই।
কিন্তু এ সবই অনভ্যস্ত অস্বাভাবিক লাগে প্রীতমের কাছে। বিলুর সঙ্গে থেকে থেকে ওই একরকম অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। বিলু কোনওদিন তার দিকে বিশেষ নজর দেয়নি, মনোেযোগী হয়নি। তবে মনকে সরিয়ে রেখে হৃদয়হীন কর্তব্য করে গেছে। আর তাইতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে প্রীতম। এখন তার প্রতি কেউ বেশি মনোযোগ দিলে, তাকে কেউ বেশি ভালবাসলে, ভারী অস্বস্তি বোধ করে সে। মাঝে মাঝে বাড়ির লোকের অতি আদরের অত্যাচারে সে বিরক্ত হয়। রেগেও যায়। মা বরাবরই তাকে খুব ভাল বোঝে। তার মুখ দেখেই মনের ভাব এঁচে নিতে পারে। তাই প্রীতমের জন্য আহা উহু সবচেয়ে কম করেছে মা।
সর ঘুঁটে দুধটা খাইয়ে নীরবে মা একটা তেল-পড়ার বোতল নিয়ে এসে হাতে পায়ে মালিশ করে দেয়। প্রথম-প্রথম বিচ্ছিরি লাগত, মাখতে চাইত না প্রীতম। আজকাল হাল ছেড়ে দিয়েছে। তার অসুখের প্রথম দিকে অফিসের এক কলিগ গৌরাঙ্গ বোস হাবড়ার এক ফকিরের কাছ থেকে বার দুই মন্ত্রপূত তেল এনে দিয়েছিলেন মালিশের জন্য। সে তেল আবার আগাগোড়া হাতে করে বয়ে আনতে হত, কোথাও রাখার নিয়ম ছিল না। গৌরাঙ্গবাবু ভিড়ের ট্রেনে ঘেমে চুপসে কষ্ট করে সে তেল আনতেন। বিলুকে পই পই করে বুঝিয়ে দিতেন, কী করে মালিশ করতে হবে। বিলু সে তেল রেখে দিত। কখনও মালিশ করেনি। একদিন প্রীতম বলেছিল, গৌরাঙ্গবাবু কষ্ট করে তেলটা আনলেন, ফেলে রাখবে?
