দীপনাথ জবাব দিল না। নিঃশব্দে গিয়ে আর একখানা কলকাতার টিকিট কেটে আনল।
মণিদীপাও সামান্য ভিজেছে। হাত বাড়িয়ে বলল, আপনার রুমালটা দিন তো। মাথাটা বড্ড ভিজে গেছে।
দীপনাথ রুমাল দিল না। তার শুচিতায় বাধে। পরস্ত্রী কেন অন্য পুরুষের রুমাল ব্যবহার করবে? আর বুকের ভিতরকার সেই দামামা? হ্যাঁ, তাও সত্যি। আর এই দুইকে কখনও মেলাতে পারে না বলেই তো দীপনাথ আজ বড় একা বোধ করে।
কই, রুমালটা দিলেন না!–মণিদীপা হাত বাড়িয়ে আছে।
শাড়ির আঁচলে মুছে নিন। আমার রুমাল নোংরা।
মণিদীপা কোনও কথা বলল না। আঁচলটা ঘুরিয়ে মাথাটা যথাসাধ্য মোছার চেষ্টা করল।
আপনি জানতেন যে, আমি চলে আসব?
না তো! কী করে জানব?–দীপনাথ অবাক হয়ে বলে।
না জানলে এতক্ষণে চলে যাননি কেন?
যেতাম, গাড়ি পেলে। এখনও গাড়ি আসেনি।
চল্লিশ মিনিটেও ট্রেন পেলেন না!
না। আপনার কেন মনে হল আমি আপনার জন্যই যাইনি?
মণিদীপা কাঁধটা ঝাঁকিয়ে বলে, এমনিই। আপনি চলে আসার পরই জায়গাটা এত বোরিং মনে হল যে থাকতে ইচ্ছে করল না।
দীপনাথের সুস্পষ্টই শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। বুকের মধ্যে তোলপাড়। এত অকপট কোনওদিন ছিল না মণিদীপা। আজ এসব হচ্ছেটা কী?
দীপনাথ কথা বলল না। মণিদীপা খুব দীন ভঙ্গিতে গিয়ে একটা ফাঁকা বেঞ্চে বসল। মাথা নিচু, চোখ নত।
ঘনঘোর বৃষ্টির শব্দের ভিতর দিয়ে নিঃশব্দে অতিকায় ট্রেন চলে এল।
দীপনাথ বলল, ট্রেন।
মণিদীপা উঠল। বৃষ্টির ভিতর দিয়ে দু’জনে দৌড়ে এসে প্রথম যে কামরাটা পেল, উঠে পড়ল।
প্রায় ফাঁকা কামরা। আলো জ্বলছে। বাইরে ঘন অন্ধকারে অঝোর বৃষ্টি। কামরার মেঝেয় চিনেবাদামের খোসা, কাগজের ঠোঙা, বিড়ি-সিগারেটের টুকরো, দেশলাইয়ের কঁকা খোল। সব মিলিয়ে জনাপাঁচেক লোক এধারে সেধারে শুয়ে-বসে আছে। বেশির ভাগই চাষিবাসী শ্রেণির। মাঝপথেই কোথাও নেমে যাবে।
মুখোমুখি বসেও কেউ কারওর দিকে তাকাতে পারছিল না। আজ পরস্পরের কাছে তারা বড় বেশি ধরা পড়ে গেছে। লুকোনোর কিছু আর রইল না বোধহয়। না কি এখনও কিছু পরদার আড়ালে আছে?
বউদি কী বলল?— অনেকক্ষণ বাদে দীপনাথ আস্তে গলায় প্রশ্ন করে।
কী বলবে?
হঠাৎ চলে এলেন দেখে কিছুই বলল না?
না তো? কিছু বলার কথা নাকি?
কথাই তো। এভাবে চলে আসা ঠিক হয়নি। পাঁচজনে পাঁচ কথা ভেবে নেবে।
মণিদীপা অবাক হয়ে বলে, কী ভাববে?
আপনাকে নিয়ে আর পারি না।
বলুন না কী ভাববে!
দীপনাথ স্নান একটু হাসে। হাল ছেড়ে দিয়ে আপনমনে মাথা নাড়ে একটু। তারপর বলে, মানুষের মনে কতরকম যে প্যাঁচ আছে।
বাট উই আর ফ্রেন্ডস।–বলে মণিদীপা উঠে এসে পাশে বসে।
অফ কোর্স। কিন্তু সেটা কি সবাই বুঝবে?
মণিদীপা অতিশয় ফিচেল হাসি হাসছিল। বলল, সবার আগে দেখা দরকার আপনি বা আমি পরস্পরকে বন্ধু মনে করি কি না।
আমি আপনার অত্যন্ত শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু, বিশ্বাস করুন।
অবিশ্বাস একবারও করিনি।–মণিদীপার সুগন্ধি একটা শ্বাস এই কথার সঙ্গে দীপনাথের ঘাড় ছুঁয়ে গেল।
মণিদীপা এত কাছে ঘেঁষে বসে আছে যে, দীপনাথের অস্বস্তি হতে থাকে। সেই অস্বস্তির মধ্যে এক ধরনের তীব্র সুখ। তার শরীর শিউরে ওঠে।
দীপনাথ কিছু ভেবে না পেয়ে বলল, আমাকে অবিশ্বাস করার কিছু নেই।
আপনার কথাই ওঠে না। আপনি কখনও নিয়ম ভাঙতে ভালবাসেন না। সেই সাহস আপনার নেইও। কাওয়ার্ডদের থাকে না। তাই অধিকাংশ কাওয়ার্ডই হয় নীতিবাগীশ।
তাই নাকি? আপনি খুব নিয়ম ভাঙতে ভালবাসেন, তাই না?
ভীষণ। আর যারা নিয়ম ভাঙে তাদেরই আমার বেশি পছন্দ। নীতিবাগীশরা আমার দু চোখের বিষ।
বুঝলাম মিসেস বোস।
কিছুই বোঝেননি। নীতিবাগীশ আর আদর্শবাদীর মধ্যে অনেক তফাত। কিসের তফাত জানেন? নীতিবাগীশরা জীবনে কিছু করতে পারে না, আদর্শবাদীরা পারে।–মণিদীপার গলার স্বরে রাগের উত্তাপ বাড়ছে।
বুঝলাম। এক্ষেত্রে আপনিই বোধহয় সেই আদর্শবাদী?
নিশ্চয়ই। আর আদর্শবাদীদেরও কিছু শুচিতার বোধ থাকে। কিন্তু আপনি বা বোস সাহেব কোনওদিন আমাকে, সিরিয়াসলি নেননি। আপনারা শুধু জানেন আমি আপস্টার্ট, একস্ট্রাভ্যাগান্ট নটি। তার বেশি কিছু নয়। মণিদীপা ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে। নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে।
আমি ভাবি না।–গোমড়া মুখে দীপনাথ বলে।
টু অফ ইউ আর ইন এ লিগ এগেইনস্ট মি।
না মিসেস বোস।
এ কথায় কী হল কে জানে, মণিদীপার মুখ-চোখ রাগে ফেটে পড়ল। ঘনশ্বাসের ঝোড়ো আওয়াজের সঙ্গে চাপা আক্রোশ ভরা গলায় ‘আমি জানি, আমি জানি’ বলতে বলতে আচমকা অপ্রত্যাশিত, দু’হাত বাড়িয়ে সে খামচে ধরে দীপনাথের জামা টেনে প্রায় ছিড়ে দিতে দিতে বলে, কেন আপনারা ভালবাসেন না আমাকে? কেন বাসেন না? কেন?
শিলিগুড়ি গিয়ে অবধি দীপনাথকে চিঠি দেয়নি প্রীতম। তবে সে যে পৌঁছেছে সে খবর বিলুর কাছে শুনেছে দীপনাথ। আজ মেসে ফিরে প্রীতমের চিঠি পেল সে। বেশ দীর্ঘ চিঠি। হাতের লেখাটা অবশ্য প্রীতমের নয়। অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়েছে, আমি ভাল আছি। কিন্তু এ জায়গাটা কী বিচ্ছিরি হয়ে গেছে বলো তো! মদের দোকান, স্মাগলিং, মারপিট, হই-চই, আগে জানলে কিছুতেই আসতাম না। তুমি কখনও বলোনি তো আমাকে!… বলো তো, গোটা দেশে একটাও কি শান্ত, নিরিবিলি, সুন্দর জায়গা নেই? সব পচে গেছে? সব নষ্ট হয়ে গেছে? বেঁচে থেকে তবে আর কী হবে? কলকাতায় এতকাল বিছানায় শুয়ে শুয়ে কত ভেবেছি, আমার স্বপ্নের শিলিগুড়ি বুঝি গাছপালা পাহাড় নদী আর নির্জনতা সাজিয়ে নিয়ে বসে আছে আমার জন্য। কোথায় কী? নোংরা হাটুরে চেহারার এই বিকট শহর আগাপাশতলা কলকাতার নকল। আমাকে একটা জায়গার সন্ধান দাও মেজদা।…
