তৃষা একটু হেসে বলে, অত আলগা কথা বোলো না, দীপু। ও তোমার ওপর আরও একটু নির্ভর করে।
দীপনাথ এসব ঠাট্টায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে বলে লজ্জা পেল না। বলল, ইয়ারকি কোরো না। কারও ওপর নির্ভর করার মতো মেয়ে নয়।
তৃষা একটু গম্ভীর হয়ে বলে, কেন মেয়েটাকে ঝোলাচ্ছ বলো তো তুমি! পরস্ত্রীকে ভাগিয়ে নেওয়ার লোক তো নও। তবে ওকে পাগল করছ কেন?
পাগল করছি! হাসালে বউদি। আমাকে পাত্তাই দেয় না।
বরং খুব বেশি পাত্তা দেয়। তোমাকে মৌমাছি কামড়েছে বলে মুখের ভাবখানা কী রকম হয়েছিল দেখোনি?
আচমকাই এবার লাল হল দীপনাথ। একটা শ্বাস ফেলে বলল, ওর চেয়ে তুমিই বেশি পাগল করলে আমায়। এখন যাও তো, যা বলছি করো তো। ডেকে দাও।
যাচ্ছি বাবা।
বলে তৃষা যায়। দীপনাথ অধৈর্যের সঙ্গে পায়চারি করতে থাকে বাগানের রাস্তায়। মেয়েদের বিদায় নিতে অনেক সময় লাগে। শেষ কথার রেশ ছিঁড়তে পারে না সহজে। দীপনাথ বার কয়েক ঘড়ি দেখল। জুতো ঘষল রাস্তার মোরমে। আজকের মৌমাছির হুল বহুকাল মনে থাকবে। কী জ্বালা! কী সুখ! চোখের কোল এখনও বেলুনের মতো ফুলে আছে। ঘাড়ে মাথায় এখনও তিনটে ঢিবি। অল্প ব্যথা। কাল ফোলা মিলিয়ে যাবে, ব্যথা থাকবে না। শুধু স্মৃতি থাকবে।
যখন শেষ অবধি উঠোনের সীমানা ডিঙিয়ে মণিদীপা বেরিয়ে এল তখন সন্ধে হয়-হয়। চারদিকে লঘু ছায়া পড়ে গেছে। হাওয়া দিচ্ছে খুব। দুরে মেঘ ডাকল।
মঞ্জু বলল, আর-একটু দেখে যাওয়া ভাল মণিকাকিমা, বৃষ্টি আসবে বোধহয়।
স্বপ্ন মণিদীপার একটা হাত ধরেই ছিল। বলল, থেকে যাও না কাকিমা!
ওরা খুব জমিয়ে নিয়েছে, বুঝল দীপনাথ। অনায়াসে তুমি করে বলছে। মেয়েরা এসব পারে।
মণিদীপা একবার জিজ্ঞাসু চোখে দীপনাথের দিকে তাকায়। দীপনাথ অস্বস্তির সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিয়ে মণিদীপার পিছনে দাঁড়ানো তৃষার দিকে তাকায়। তৃষা তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। দীপনাথ চোখ নামিয়ে নেয়।
খুব সংকোচের সঙ্গে দীপনাথ মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি থাকতে চান?
ওরা ছাড়তে চাইছে না। আপনি কী বলেন?
স্বপ্না হাঁ করে কথা গিলছে। দীপনাথ কী বলবে? সে একবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ইচ্ছে হলে থাকুন।
আপনি?
আমি? আমাকে যেতেই হবে।
কেন খুব কাজ?
খুব কাজ। আপনি থাকতে পারেন। কাল সকালে বা যখন আপনার ইচ্ছে বউদি লোক দিয়ে পাঠিয়ে দেবে।
লোকের দরকার নেই। একাই পারব।
তা হলে থাকছেন?
ভাবছি।
ভাববার সময় নেই। আপনি থাকুন, আমি চলি।
থাকবে। থাকবে!–বলে স্বপ্না আর মঞ্জু প্রায় আঁকড়ে ধরে মণিদীপাকে।
দৃশ্যটা দেখতে ভালই লাগে দীপনাথের। তবু মনে একটা কাঁটা ফুটে আছে। বোস সাহেবের অনুমতি নেওয়া হয়নি। সে তৃষার দিকে সুপ্রশ্ন চোখে চেয়ে বলে, যাই বউদি?
এসো। মণিদীপা আমাদের কাছে যত্নেই থাকবে।
আসি তা হলো–বলে মণিদীপার দিকে একপলক চেয়ে দীপনাথ তার অভ্যস্ত বড় বড় পদক্ষেপে বেরিয়ে এল বাগানের ফটক খুলে।
স্টেশন অনেকটা পথ। দূরে মেঘ ডাকছে। শরতের দমকা বৃষ্টি এসে কখন ভিজিয়ে দেয় কে জানে। ছাতা নিয়ে কদাচিৎ পথে বেরোয় সে। ছাতা জিনিসটাই তার পছন্দ নয়।
চৌমাথা পেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে অনেকটা এসে হঠাৎ এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে গেল দীপনাথ। খুব নির্জন। একটা মস্ত অশ্বথের ঘন ছায়া জায়গাটাকে অন্ধকার কবে রেখেছে। চারদিকে অজস্র ঝোপঝাড়, বাড়িঘর নেই। এই জায়গাতেই সামনাথকে মেরেছিল না গুন্ডারা! কেউ চিনিয়ে দেয়নি দীপনাথকে, তবু তার মনে হল, এই সেই জায়গা। সোমনাথকে কারা মেরেছিল তা আজও সঠিক জানে না দীপনাথ। এর ওর তার কাছে নানা কথা শুনেছে। সোমনাথ বড় বেশি আদরে মানুষ। কখনও শাসন করা হত না বলেই কি একটু অন্যরকম হল সে? কে বলবে? আবার বউদির গুন্ডারাই যদি তাকে মেরে থাকে তবে তারা শমিতার ওপর অত্যাচার করবে কেন? বউদি নিশ্চয়ই ওরকম জঘন্য কাজ করার হুকুম ওদের দেয়নি। ঘটনাটা তাই আজও কিছুতেই বুঝতে পারে না দীপনাথ।
খানিকক্ষণ ঝুঝকো ছায়ায় সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবে। বিশ্লেষণ করে। কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারে না।
বৃষ্টি এল বলে। এখনও অনেকটা পথ। দীপনাথ খুব দ্রুত হাঁটতে থাকে। কখনও দৌড়পায়ে। স্টেশনের একেবারে কাছাকাছি তেমাথায় বৃষ্টি তার নাগাল পেয়ে গেল। দোকানে ঢোকা যেত, কিন্তু না ঢুকে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাকি পথটা দৌড়ে পার হল সে।
স্টেশনের চত্বরে উঠে ছাদের নীচে দাঁড়িয়ে রুমালে মাথা ঘাড় মুছল। কলকাতার একখানা টিকিট কাটল। তারপর দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল। স্টেশনে যাত্রী বলতে প্রায় কেউ নেই। সে একা। খবর নিয়ে জেনেছে কলকাতার ট্রেন আরও মিনিট দশেকের আগে নয়।
মণিদীপা রয়ে গেল। ঘটনায় স্বস্তি পাচ্ছে না দীপনাথ। আনমনে একবার চোখের কোলে ফোলা জায়গাটায় আঙুল রাখল। ফোলাটা অনেক কমে গেছে। ব্যথা নেই, জ্বালা নেই। তবু কী যেন একটু আছে। আঙুল ছোঁয়াতেই রোমাঞ্চ হল গায়ে।
বৃষ্টির মধ্যেই একটা রিকশা ঝড়েব বেগে ছুটে আসছে স্টেশনের দিকে। মোড়ের মাথায় ঘন্টি মারছিল ঘন ঘন। ফিরে দৃশ্যটা দেখছিল দীপনাথ।
কে আসে?
বুকের মধ্যে হঠাৎ দামামা বেজে ওঠে। এত বেসামাল বহুকাল লাগেনি দীপনাথের। অথচ সেই নিত্যদিনের মণিদীপাই তো! মহত্তর কিছু তো নয়, চমকপ্রদও তো কিছু নয়। বিরহ তো মাত্র আধ ঘন্টার।
রিকশাওলাই একটা ছাতা ধরে স্টেশনে তুলে দিয়ে গেল মণিদীপাকে। দীপনাথের দিকে চেয়ে বলল, আপনাকে না পেলে দিদিমণিকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
