মনটা খারাপ ছিলই তার। আরও একটু খারাপ হল মাত্র।
০৫. তৃষা বিছানা ছাড়ে শেষ রাতে
তৃষা বিছানা ছাড়ে শেষ রাতে। শীতকাল বলে এখন ঘুটঘুট্টি অন্ধকার থাকে। আকাশভরা জমকালো তারার ঝিকিমিকি। কখনও-সখনও ক্ষয়া চাঁদের ফ্যাকাসে জ্যোৎস্নাও। পাখি ডাকে কি ডাকে না। এত নিঃঝুম যে, নিজের শ্বাস বা হৃৎপিণ্ডের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়।
বৃন্দা ঘরের দরজা জানালা খুলে ঘর আর বারান্দা ঝাঁটাতে থাকে আর গুন গুন করে প্রভাতী গায়—ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম রে…। এমন পাষণ্ড কে আছে যার ভোরবেলার ছাঁকা নির্জনতায় ওই আপনভোলা নদীর মতো বয়ে যাওয়া সুরের প্রভাতী ভাল না লাগবে। যার ভক্তি নেই সেও ওই গান শুনে মাঝে মাঝে প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়। তৃষার কোনওকালে ভক্তি ছিল না, আজকাল হয়েছে কি একটু!
তামাক দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে তৃষা কলঘরে চলে যায়। প্রাতঃকৃত্য সেরে এই মারুনে শীতে লোহার মতো ঠান্ডা জলে আকণ্ঠ স্নান করে সে। তামাকের ধ্বক ওই স্নান পর্যন্ত গলায় আটকে থাকে তার। স্নান করতে করতেই শুনতে পায় বাগানে ফুলচোরদের আনাগোনার শব্দ। নিচু দেয়াল টপকে লাফিয়ে নামছে ছোট ছোট পা, ফুল ছিড়ছে পুট পুট করে, চাপা গলার কথা। কুয়োর ধারে স্থলপদ্ম গাছটার ওপরেই ওদের নজর বেশি।
এই ভোরবেলায় মনে কোনও রাগ সহজে ওঠে না। তৃষা কান পেতে শোনে একটু। বাড়াবাড়ি টের পেলে গম্ভীর গলাটা একটু উঁচুতে তুলে বলে, কে রে? বৃন্দা, দ্যাখ তো!
ওইতেই কাজ হয়ে যায়। ঝুপ ঝাপ করে ফুলচোরেরা পালাতে থাকে। খ্যাপা নিতাইয়ের কুকুরটা মাঝে মাঝে তাড়া করে উপর। ঝড় পাহারাদার অবশ্য ফুলচোরদের নিয়ে মাথা ঘামায় না। সারারাত পাহারা দিয়ে তৃষা উঠবার পর সে ঘুমোতে চলে যায়। এ সময়টায় তাই বাড়ির তেমন প্রতিরক্ষা নেই। কিন্তু তৃষা একাই একশো।
কলঘর থেকে বেরোতে একটু সময় লাগে তৃষার। নিজের যত্ন বলতে তার এই ভোরে স্নানটুকু। তাই সে সময় নেয়। এই সময়েই সে নিজের কথাও একটু ভাবে। দিনের মধ্যে বলতে গেলে এই একবারই।
কলঘর থেকে বেরোলেই দেখে পুব আকাশে ফিকে ফিরোজা রং ধরেছে। মিলিয়ে যাচ্ছে তারার আলো। ভোৱের হয়তো বা একটা সৌন্দর্য আছে। তৃষা তা কোনওদিনই তেমন টের পায় না। মস্ত দুই টিন-ভর্তি খেজুর রস বারান্দায় নামিয়ে রেখে যায় লক্ষ্মণ। হাঁস মুরগির ঘর থেকে ডিমের আঁকা এনেও বারান্দা-সই করে দিয়ে যায় সে। নিতাই কাঠকুটো কুড়িয়ে এনে উঠোনের পশ্চিম ধারে ডাই করে। রেলবাবুদের বাড়ি থেকে দুধ নিতে ছোট ছোট ঘটিবাটি হাতে নিয়ে কচি কাচা বুড়ো মন্দারা এসে জুটে যায়। ঢতুদিকে চোখ রাখতে হয় তৃষার।
গোটা সাতেক দুধেল গোরুর পনেরো-যোলো সের দুধ দুইয়ে মংলু গয়লা একটা মস্ত অ্যালুমিনিয়ামের ঘ্রামে ঢেলে দিয়ে যায়। ড্রামের মধ্যে তৃষার কিছু কারচুপি থাকে। দু’-তিন সের পরিষ্কার জল আগে থেকেই ড্রামে ভরে রাখে সে। অন্য গয়লারা যেমন গোরুকে আঁক দেয় বা দুধে মিল্ক পাউডার, চক খড়ির গুঁড়া বা হাবিজাবি মেশায় তৃষা তা কখনও করে না। তার বাড়ির দুধ খায় বহু বাড়ির আদর যত্নের বাচ্চারা। হিসেব করলে তিন টাকা সের দরে সে যথেষ্ট খাঁটি দুধই দেয়। অতটা দুধে এই সামান্য জল মেশানোটা ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। তৃষার অন্তত কিছু মনে হয় না। শ্রানাথ টের পেয়ে একদিন খুব রাগ দেখিয়েছিল, ভদ্রলোকের মেয়ে হয়ে কেমন করে যে তুমি এত নীচে নামতে পারলে! যদি এই কাজই করবে তবে সারাজীবন গয়লাদের সঙ্গে দুধে জল দেওয়ার জন্য। খিটিমিটি করে এলে কেন?
শ্রীনাথের রাগ অবশ্য বাওয়া ডিমের মতো। সারবস্তু নেই। সংসারে সে হচ্ছে বোঁটা আলগা ফল। যে-কোনওদিন খসে পড়বে। তৃষা বথটায় কানই দেয়নি। সামান্য মাইনের প্রুফ-রিডারের সংসার চালিয়ে সে জীবনের অনেক সত্য ও সারবস্তু চিনে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে তৃষার নিজের তেমন কোনও লোভ নেই। সে সোনার গয়নার জন্য হেঁদিয়ে মরে না, শাড়ি বা রূপটানের জন্য আকণ্ঠ কোনও অতৃপ্তি নেই। সে শুধু চায় একটা ছোটখাটো রাজত্বের ওপর নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব করতে।
বাড়ির জন্য আলাদাভাবে দু-তিন সের দুধ দোয়ানো হয়। ফেনিল, ঘন, ননী ওঠা সুস্বাদু বালতি ভরা সেই দুধ দেখে কোনওদিন এক চুমুকও খাওয়ার কথা মনে হয় না স্যার। দুধের গ্লাস মুখের কাছে আনার কথা ভাবলেও পেট গুলিয়ে ওঠে। কয়েকবার চেষ্টা করে পারেনি। সকালে সে তাই বড় পাথরের গ্লাস ভর্তি চা খায়। রোদ ভাল করে ফোটার আগেই বৃন্দা তার জন্য মাটির হাঁড়ি করে ফেনাভাত নামিয়ে দেয়। খাঁটি আঁঝালো সর্ষের তেল, ঝাল লঙ্কা আর ডিমসেদ্ধ দিয়ে তৃষা জলখাবার খায়। ভাত ছাড়া আর কিছু খাওয়ার আছে সংসারে, এ তার মনেই হয় না।
কুটনো কোটা বা রান্না করার মতো মেয়েলি কাজ তুষ আজকাল করে না। তার জন্য লোক আছে। সকালের দিকে রোদ উঠলে সে উঠোনে জলচৌকি পেতে বসে। কোলে থাকে তার নিজস্ব হিসাব-নিকাশের খাতা। কে কত পাবে, কার কাছে কত পাওনা, কাকে কোন কাজ দেওয়া হবে, কাকে রাখবে, কাকেই বা ছাড়াবে তা সব ওই খাতায় লেখা। বন্ধকি ঋণের একটা মস্ত হিসেবও রয়েছে তার। সোনা-রুপোর গয়না থেকে ঘটি-বাটি এমনকী গোরু পর্যন্ত বাঁধা রাখে সে। কখনও এক পয়সা ছাড়ে না।
ছেলেমেয়েরা কোনওদিনই খুব একটা ঘেঁষে না তার কাছে। তবে ওর মধ্যে সজলই তবু একটু সাহস রাখে। একটু মান্যাওটাও সে-ই। কিন্তু সজল যখন সুন্দর নধরকান্তি শিশু ছিল তখনও তাকে তৃষা কোনওদিন হামলে আদর করেনি। আজও এক কঠোর শীতল শাসনের দূরত্ব বজায় আছে।
