ভাল। বিলু তো চাকরি করে।
শুনেছি। প্রীতম ভাল হয়ে গিয়ে থাকলে একবার যেন আসে। তার মুখটা তো ভুলতে বসেছি।
আসবে। এখানে আপনার আর কোনও অসুবিধে আছে?
এ আমার জুতের জায়গা নয়। কেমন সবই অচেনা অপরিচিত ঠেকছে। নিজের জায়গা বলে মনে হয় না।
দীননাথের সঙ্গে আর বেশিক্ষণ কথা বলল না দীপনাথ। মানিব্যাগ থেকে একশো টাকার নোট বের করে হাতে দিয়ে বলল, ইচ্ছেমতো খরচ করবেন।
দীননাথ সংকুচিত হয়ে বললেন, আমার আর খরচ কী? বরং বউমার হাতে দিয়ো।
না, আপনি রাখুন। কাউকে কিছু দিতে ইচ্ছে হলে দেবেন।
দীননাথ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, এই বিবেচনাটুকু অন্য ছেলেদের যদি থাকত।
দীপনাথ তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। ভাবন-ঘরে গিয়ে বৃন্দার কাছে খবর নিয়ে জানল, কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার এসে শ্রীনাথকে দেখে গেছে। আবার বোধহয় ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়েছে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে শ্রীনাথ।
দীপনাথ শ্রীনাথের সুন্দর বাগানটার ভিতরে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল। শরৎকাল আসতে না আসতেই শ্রীনাথের বাগানে শিউলি এসে গেছে। অনাদরে মাটিতে ঝরে পড়া অজস্র শিউলি বাসি হচ্ছে। একটা স্থলপদ্ম গাছে বেঁপে পদ্ম ফুটেছে। মৌমাছিরা গুঞ্জন তুলে উড়ছে। বউদি কি জানে শ্রীনাথের নিজের হাতে তৈরি করা ফুল থেকেই মৌমাছি কুঞ্জবনে গিয়ে চাক বাঁধে, আর সেই মধুই টলটল করছে তার পাথরের বাটিতে? কথাটা বউদিকে বললে কেমন হবে? ভেবে আপনমনেই মাথা নাড়ল দীপনাথ, লাভ নেই। কোনও কোনও স্বামী-স্ত্রী বোধহয় তাদের সম্পর্কের বিষকেই বেশি উপভোগ করে। মধুর কথা তারা কানে নেবে না।
বেল ঢলে পড়ল গাছগাছালির আড়ালে। চিকড়িমিকড়ি রোদ খেলছে বাগান জুড়ে।
দীপনাথ উঠে ভিতরবাড়িতে আসে।
বউদি, এবার যেতে হয়।
এক্ষুনি কী? আর-একটু থাকো। তোমার সঙ্গে কথাই তো হল না।
সঙ্গে বসের বউ, ফিরতে রাত হওয়া ঠিক নয়।
দীপু, তুমি কবে বুঝবে যে, আমি কত একা?
দীপনাথ একটু হেসে বলে, একদিন আমি আমার বসকে বলেছিলাম, বড় মানুষরা একটু একা একটু নিঃসঙ্গ হয়। তোমাকেও বলি বউদি, মহীয়সীরা চিরকাল একা। তাদের সঙ্গী হওয়ার মতো যোগ্যতা কজনের থাকে বলে?
আমি মহীয়সী? অবাক করলে দীপু!
কেন? লোকে বলে না?
তোমার মতো চাটুকার তো সবাই নয়! মহীয়সী হলে আমাকে লোকে মারতে চাইবে কেন বলো! কেনইবা আমার আপনজন বাজারে হাটে আমার কলঙ্ক রটিয়ে বেড়াবে?
লোকের কথা দিয়ে কী হবে বউদি! আমি যা মনে করি তা তো পালটে ফেলব না।
তৃষা একটু হাসল। মুখের বিষণ্ণতা তাতে কাটল না। খুব গম্ভীর গলায় বলল, কোনওদিন যেন আর না শুনি তোমার মুখে যে, আমি খারাপ, আমি ভাল নই।
শুনবে না বউদি।
তোমার কাছে যেন আমি চিরকাল ভাল থাকি।
থাকবে। যে ছেলে দুটো কাল বোমা মেরেছিল তারা ধরা পড়েছে?
না। তবে নাম জানা গেছে। দু’জনেই ভাড়াটে গুন্ডা। কাছাকাছি মাধবগঞ্জে থাকে।
কারা তাদের পাঠিয়েছিল? তোমার কাউকে সন্দেহ হয়?
কী করে বলব? তবে হয়তো একদিন এইভাবে আমার মরণ হবে, দীপু। তখন খুব কম লোকই কাঁদবে আমার জন্য। আর কেউ না কাঁদুক, তুমি একটু কেঁদো। কান্না এমনিতে না এলে নিজেকে চিমটি কেটো।
৫০. কথা শুনে একটু গম্ভীর হতে গিয়ে
কথা শুনে একটু গম্ভীর হতে গিয়েও অবশেষে একটু মুচকি হেসে ফেলে দীপনাথ। বলে, ওসব ছিচকাঁদুনে মেয়েলি সেন্টিমেন্টের কথা তোমার মুখে একদম মানায় না বউদি।
তৃষা চোখ বড় বড় করে বলে, তাই বুঝি? কাল রাতেই তো মাত্র বোমা মেরে গেল। তবু বলছ মেয়েলি সেন্টিমেন্ট? কাল রাতে কপালজোরে বেঁচে গেছি বলেই যে সব ক’টা ফাড়া কাটাতে পারব অত পুণ্যি তো করিনি।
প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দীপনাথ বলে, তুমি মরবে না। তুমি মরলে আমাদের চলবে কী করে?
চলবে কী করে তার আমি কী জানি! আমি অমর নই।
বিরক্ত হয়ে দীপনাথ বলে, বার বার মরার কথা বলে আবহাওয়া ভারী করতে চাইছ কেন বলো তো! এ রকম তো ছিলে না! বুড়ো হচ্ছ নাকি!
তোমার কাছে বুড়ো হব সাধ্য কী! এই না সেদিন রঙিন শাড়ি এনে পড়িয়ে ছাড়লে!
তবে? বুড়ো হওনি, শিগগির মরছও না। এখন যাও তো ভদ্রমহিলাকে ডেকে দাও। পরস্ত্রী ফেরত দিয়ে আসি।
কিন্তু পরস্ত্রীটি যে নড়তে চাইছে না!
কেন বলো তো?
আমার মেয়ে দুটোকে পলিটিকস শিখিয়ে মাথা খাচ্ছে।
তা হলে এক্ষুনি মাল ট্রান্সফার করো, নইলে সর্বনাশ। পলিটিকস অতি বিষাক্ত জিনিস।
নিজে থেকে না উঠলে তুলি কী করে?
ওর ওঠার তেমন ইচ্ছেও বোধহয় নেই। হাওড়া স্টেশনে আমাকে বলছিল দু-একদিন এখানে থেকেও যেতে পারে।
তা থাকুক না। ক্ষতি তো নেই। স্বপ্ন আর মঞ্জুর ঘরেই জায়গা হবে।
একটু ইতস্তত করে দীপনাথ বলে, কাজটা ঠিক হবে না বউদি। ওর হাজব্যান্ডের কাছে থাকার পারমিশান নেওয়া হয়নি।
হাজব্যান্ডকে কি ও মানে?
ও না মানুক, আমি তো ওর হাজব্যান্ড হিসেবে বোস সাহেবকে মানি!
হাজব্যান্ড তো এখানে নেইও শুনেছি।
তাতে কী? ফ্ল্যাটটা তো আছে।
সেখানে কি ও নিরাপদ, দীপু?
তার মানে?
মানে আবার কী? তোমার মরালিটির সেন্স দেখে হাসি পায়। একা ফ্ল্যাটে একটা ছুরি মেয়ে কতগুলো বয়-বাবুর্চির হেফাজতে থাকে, সেটাই বা কোন ভাল ব্যাপার? ওর হাজব্যান্ডের উচিত ছিল কোনও বয়স্কা আত্মীয়াকে ফ্ল্যাটে রেখে যাওয়া বা ওকে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া।
দীপনাথ ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখে নেয়। তারপর চিন্তিত মুখে বলে, আমি তোমার মতো করে ভাবিনি। তুমি হয়তো ঠিকই বলছ। তবু আমার দায়িত্ব তো ওকে রক্ষা করা নয়। আমার দায়িত্ব শুধু জায়গা মতো পৌঁছে দেওয়া।
