তৃষা দীপনাথের দিকে চেয়ে দেখল। তার মুখে কোনও উদ্বেগ ফুটল না। শুধু বলল, মধু।
বলে নিজেই গিয়ে একটা বেঁটে জালের মিটসেফ খুলে ঢাকনা দেওয়া পাথরের বাটি বের করে আনল। তাতে টলটল করছে টাটকা মধু।
হুলের জায়গাগুলোতে আঙুল দিয়ে মধু ঘষে দিতে দিতে প্রায় কানে কানে তৃষা জিজ্ঞেস করে, কী করে কামড়াল?
গোপনে জিজ্ঞেস করার মতো ব্যাপার নয়। তব দীপনাথও মৃদু স্বরে বলল, গাছে উঠতে হল যে।
কেন?
টেপ-রেকর্ডার ঝোলাতে।
তৃষাকে বেশি বলতে হয় না। প্রখর বুদ্ধিবলে সে সব বুঝে নেয়। বলল, বসের বউ, তার ওপর আবার প্রেমেও পড়েছে, এটুকু জ্বালা-যন্ত্রণা কিছু নয়।
তোমাকে একদিন এমন গাঁট্টা দেব না!
মণিদীপা বিছানার ধারে বসে একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছে। কিছু দেখছে না, শুধু চোখটা সরিয়ে রাখছে মাত্র।
দীপনাথ বলল, টেপ-রেকর্ডারটা আবার নামাতে হবে কিছুক্ষণ বাদে। কিন্তু সেটা আর আমার কম্মো নয়।
তৃষা বলল, কম্মোটায় যাওয়ার দরকার কী ছিল? বাড়িভরতি কাজের লোক রয়েছে, যে কেউ ওটুকু করে আসতে পারত। তোমাকে ভাবতে হবে না, আমি লোক পাঠিয়ে নামিয়ে আনবখন।
মধু লাগানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্বালাযন্ত্রণা অনেক কমে গেল। শুধু ফোলাটা রইল। কিছুক্ষণ থাকবে। সে জিজ্ঞেস করে, মেজদা খেয়েছে বউদি?
না, অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
ঘুমোতে দাও। যত ঘুমোবে তত টেনশন কেটে যাবে।
তৃষা হাসল, বোমা মারল আমাকে আর টেনশন হল তোমার মেজদার। এসব পুরুষকে নিয়ে চলা যে কী মুশকিল!
কে পুরুষ? পুরুষ তো তুমি!
তৃষা মৃদু হেসে চাপা গলায় বলে, এখানকার লোকেরাও সেই কথা বলে। আহা, আমার কী গৌরবের ব্যাপার!
তুমিই আমাদের গৌরব।
যাঃ। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও তো। মেয়েরা মণিদীপার সঙ্গে গল্প করবে বলে বসে আছে। কেউ খেলতে পর্যন্ত যায়নি।
খাওয়ার সময়েও দীপনাথ লক্ষ করল মণিদীপা তার দিকে তাকাচ্ছে না, কথা বলছে না। দীপনাথ ঘটাল না। নিঃশব্দে খেয়ে নিল দু’জনে। বোস সাহেব দিল্লি থেকে আমেদাবাদ গেছেন। কবে ফিরবেন ঠিক নেই। মণিদীপা বোজ অফিসে ফোন করে দীপনাথকে জ্বালাচ্ছিল, কবে রতনপুর যাচ্ছেন বলুন! আমার যে কলকাতায় পাগল-পাগল লাগছে। দীপনাথ ঠিক করেছিল, এবার বোস সাহেবের অনুমতি ছাড়া মণিদীপাকে কোথাও নিয়ে যাবে না। বোস সাহেব অবশ্য প্রায়ই অফিসে ট্রাংকল করে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে। কিন্তু কোনওবারেই দীপনাথ কথাটা তুলতে পারেনি সংকোচের বশে। কিন্তু মণিদীপার তাড়ায় পরশুদিন সে কাজের কথা হয়ে যাওয়ার পর বোস সাহেবকে খুব বিনীতভাবে বলল, মিসেস বোস একটু রতনপুরে যেতে চাইছেন।
কোথায়?
রতনপুর। কাছে। সেখানে আমার মেজদার বাড়ি।
ওঃ, অফকোর্স। যাক না, কে আটকাচ্ছে?
আপনার একটা পারমিশান—
বোস সাহেব খুব হাসল। বলল, আজ পর্যন্ত কটা ব্যাপারে দীপা আমার পারমিশান নিয়েছে তা তো আমি জানি।
উনি না নিলেও আমাকে তো নিতেই হয়। আপনার পারমিশান ছাড়া আমি ওঁকে কোথাও নিয়ে যেতে পারি না।
বোস সাহেব বলে, ইটস অলরাইট, টেক হার এনিহোয়ার শি লাইক।
ধীর স্বরে তখন দীপনাথ বলল, ওভাবে বললে আমি সেটাকে পারমিশান বলে ধরতে পারি না মিস্টার বোস।
বোস সাহেব মেজাজ খারাপ করতে পারত। কিন্তু কোম্পানির বিজনেস খুব ভাল হওয়ায় বোসের মেজাজ শরিফ ছিল। খুব উদার গলায় বলল, এমনিতেও দীপা একাই বহু জায়গায় যাচ্ছে। এ তো আপনার মতো একজন চমৎকার গাইডের সঙ্গে যাবে। যাক না।
আমরা সকালে বা দুপুরে গিয়ে সন্ধেবেলাই ফিরে আসব।
ওঃ, আমি ভেবেছিলাম বুঝি উইক-এন্ড কাটাতে। তা হলে তো পারমিশনের দরকারই ছিল না চ্যাটার্জি। আপনি এত বেশি সংস্কার মেনে চলেন কেন বলুন তো! আচ্ছা ভদ্দরলোক মশাই আপনি! শুনলে দীপাও হাসবে।
আসার সময় হাওড়া স্টেশনে মণিদীপা বলেছিল, আমার যদি ভাল লাগে তা হলে আমি রতনপুরে দু’দিন থেকে যেতে পারি কিন্তু।
স্বচ্ছন্দে। কিন্তু আপনার ফ্ল্যাট পাহারা দেবে কে?
পাহারা দেওয়ার কিছু নেই। বেয়ারা বাবুর্চি আছে। আমি মানুষকে বিশ্বাস করতে ভালবাসি। আপনার দুশ্চিন্তা থাকলে আপনি গিয়ে পাহারা দিতে পারেন।
এখানে মণিদীপার কেমন লাগছে কিংবা সে থাকবে কি না তা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হলেও মুখের ভাব দেখে সাহস পেল না দীপনাথ। খেয়ে উঠে সে দীননাথের সঙ্গে দেখা করতে গেল। মঞ্জ আর স্বপ্না এসে ধরে নিয়ে গেল মণিদীপাকে।
দেখা হতেই দীননাথ বলেন, তোমরা কেউ বুলুর খবর নাও না। সে কেমন আছে, বউমার কী হল কেউ আমাকে বলে না।
সোমনাথের খবর দীপনাথ নেয়নি বহুদিন ঠিকই। তবে সোমনাথও তার সঙ্গে দেখা করে না। সে একটু লজ্জা পেয়ে বলে, খুব কাজ পড়েছে।
ভাইয়ের খবর নেওয়াটাও কাজ।
আপনি একটা চিঠি দিলেও তো পারেন।
চিঠি স্বপ্নকে দিয়ে বার দুই লেখালাম। আজকাল ডাকের পিয়নরা ঠিকমতো চিঠি দেয় না। বোধহয় পায়নি, তাই জবাবও দেয়নি।
আচ্ছা, আমি এবার গিয়ে খোঁজ নেব।
নিয়ো। বোলো, এখানে আমার ভাল লাগছে না।
কেন বাবা? এ জায়গা তো খুব ভাল।
ভাল আর কী? শ্রীনাথ খবরও নেয় না। তার কী সব খারাপ অভ্যাস হয়েছে শুনি। আমাদের বংশে এসব তো ছিল না। তার ওপর কাল বাতে নাকি ডাকাত পড়েছিল–এ ভারী গণ্ডগোলের জায়গা।
শীত পড়লে কলকাতায় যাবেন। এখন কিছুদিন থাকুন।
তুমি বিয়ে করলে আমার একটা আস্তানা হত। তিন ছেলের কাছে ঘুরেফিরে থাকতে পারতাম। বিলুও খোঁজ করে না। প্রীতম আছে কেমন?
