আবার টেপ করবেন নাকি?
আগেরটা যে ভাল হল না। এই ক্যাসেটটা দিয়ে দেখি। যন্ত্রটা গাছের ডালে বসালে বোধহয় ভাল হয়, তাই না? ওই নিচু মৌচাকটার কাছাকাছি টেপ-রেকর্ডারটাকে একটু সেট করে দেবেন?
আমাকে গাছে উঠতে বলছেন?
গাছে ওঠেননি কোনওদিন?
বিস্তর। তবে সে ছেলেবেলায়। এই বুড়োবয়সে পড়ে গিয়ে মাজা ভাঙলে আপনি দায়ী।
আপনি হাঁদারাম হলেও পড়ে যাওয়ার লোক নন। কেরিয়ারের গাছটিতে তো দিব্যি তরতরিয়ে উঠে যাচ্ছেন। আর এ তো সামান্য গাছ।
মুখ শুকনো করে দীপনাথ বলে, দুনিয়ার যত খারাপ কি কেবল আমি?
আপনি ভীষণ খারাপ। এখন জুতো খুলুন তো। নিচু গাছ, উঠতে কোনও অসুবিধে হবে না।
উঠছি বাবা। কেরিয়ারিস্ট হওয়াও যে কী কষ্টের তা যদি বুঝতেন!–জুতো খুলতে খুলতে দীপনাথ বলে, বসকে তেল দিতে হয়, বসের বউকে তেল দিতে হয়। আর তেল দেওয়ার ছিরিটাও দেখুক লোকে। বসের ছিটিয়াল বউ মৌমাছির গান টেপ করবে বলে এই বারবেলায় মধ্যবয়সে গাছেও উঠতে হচ্ছে।
কেরিয়ারিস্ট দুরকমের আছে। হাঁদারাম আর বুদ্ধিমান। বুদ্ধিমানদের খাটতে হয় না, কিন্তু হাঁদারামদের খাটা ছাড়া তো উপায় নেই।
দীপনাথ জুতো খুলে গাছে উঠল। খুবই সহজ গাছ। নিচুতেই অজস্র ডালপালা। দুটো ডাল ডিঙিয়ে একটু উপরে উঠতেই মণিদীপা বলল, বাঃ, বেশ পারেন তো। কিন্তু আরও ওপরে উঠে গেলে আমি টেপ-রেকর্ডারটা দেব কী করে? নাগাল পাব না যে! এইবেলা এটা ধরুন।–বলে দু’হাতে টেপ-রেকর্ডারটা উঁচু করে তুলে ধরল মণিদীপা।
ঝুঁকে যখন টেপ-রেকর্ডারটা নিতে হাত বাড়াল দীপনাথ তখন সন্দেহবাতিকগ্রস্ত একটা মৌমাছি ধেয়ে এল কোখেকে। বাঁ চোখের কোলে তার বিষাক্ত হুল কুট করে বিধল, টের পায় দীপনাথ। কিন্তু এ সময়ে নড়লে বা অসাবধান হলে দামি যন্ত্রটা পড়ে যেতে পারে। তাই সে একটুও শব্দ করল না । নীরবে টেপ-রেকর্ডার তুলে নিল।
মৌচাকটা খুব ওপরে নয়। আর দুটো ডাল উঠতেই সে প্রায় হাতের নাগালে পেয়ে গেল মৌমাছিতে বিড় বিড় করা চাকটাকে। বাঁ চোখের কোল মুহূর্তে ফুলে উঠছে। তীব্র জ্বালা। কিন্তু দীপনাথ শব্দ করল না। একটা মৌমাছির কামড় বই তো নয়! মৌচাকের কাছাকাছি যেতে হলে মুখ মাথা ঢেকে নিতে হয়, সে জানে। কিন্তু ঢাকনা দেওয়ার মতো কিছু নেই হাতের কাছে।
একটা ঘন পাতার চাপ ভেদ করে মাথা তুলতে-না-তুলতেই তার চুলের মধ্যে জেট প্লেনের মতো দুটো মৌমাছি এসে ঢুকল আর একটা হুল দিল কলারের নীচে, ঘাড়ে। প্রতিটি হুলই ইলেকট্রিক শকের মতো। দীপনাথ স্থির হয়ে রইল। নড়লে আবার কামড়াবে। খুব ধীরে ধীরে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে টেপ-রেকর্ডারটা ঝোলানোর অবলম্বন খুঁজে দেখল। পেয়েও গেল হাতের কাছে। একটা ভারবহনক্ষম ডাল বেরিয়ে আছে কাণ্ড থেকে। সে হাতলটা গলিয়ে দিল গাছের ডালে। তারপর সাবধানে রেকর্ডিং চালু করে দিল। টেপ ঘুরছে কি না তাও দেখে নিল ভাল করে। এখানে মৌমাছির শব্দ খুব ঝাঁঝালো। আশা করা যায় রেকর্ডিং ভালই হবে।
সাবধানে আবার নেমে আসে দীপনাথ। ভাগ্যে তার প্যান্টেব পকেটে একটা রোদচশমা ছিল। কালো চশমা পরতে তার ভাল লাগে না। সবকিছু মেঘলা দেখায় তাতে। তবু রোদের কথা ভেবে সঙ্গে এনেছিল। এতক্ষণ পরেনি। গাছ থেকে নেমেই সে মণিদীপার দিকে পিছন ফিরে চশমাটা পরে নিল।
মণিদীপা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ধন্যবাদ না, কোনও কথাও না।
দীপনাথ হাতটা ঝেড়ে নিয়ে হাসি মুখে বলল, চলুন। বউদি বসে আছে।
মণিদীপার ভ্রু কোঁচকানো, নতমুখ। শুধু বলল, হুঁ।
দীপনাথের বাঁ চোখ ক্রমে আরও ফুলে উঠেছে, চশমার ফ্রেমের তলা দিয়েও সেটা দেখতে পাওয়ার কথা। কিন্তু মণিদীপা তাকাচ্ছে না তার দিকে। মৃদু পায়ে হাঁটছে আগে আগে, ভিতরবাড়ির দিকে। দীপনাথের ঘাড়ে মাথায় আরও গোটা তিনেক জায়গা ফুলে উঠেছে। পাগল-পাগল জ্বালা। তবু সে পিছন থেকে হাসিমুখে বলল, ম্যাডাম এই কুঞ্জবনটা খুঁজে বের করলেন কীভাবে?
মণিদীপা জবাব দিল না।
দীপনাথ অবাক হল না। মণিদীপা একটু মুডি। কখন ভাল থাকে বা কখন খারাপ থাকে তার তত কোনও ঠিক নেই। তাই সে আর কথা বলে উত্ত্যক্ত করল না। জ্বালাভরা চুলকোনি সামাল দিতে একবার চশমাটা তুলে হুলের জায়গাটা কচলায় সে। নরম জায়গাটা তো তেড়েফুঁড়ে আরও ফুলে উঠতে থাকে। চশমাটা আর রাখাই যাচ্ছে না। তবু সেই জ্বালাধরা জায়গার ওপর চশমাটা জোর করে বসিয়ে রাখল সে। মৌমাছির হুল, তার চেয়ে বেশি কিছু তো নয়। মানুষ এর চেয়ে ঢের বেশি যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে। প্রীতম করেনি? মুমূর্ষ পঙ্গু ওই প্রীতম তাকে জীবনে অনেক বেশি প্রেরণা দেয়। চাঙ্গা করে তোলে।
ঘরে পৌঁছতে পৌঁছতেই শরীরের জ্বালা-যন্ত্রণা প্রায় ভুলেই গেল দীপনাথ।
বউদি, এই যে ধরে এনেছি। উনি মৌমাছির টেপ-রেকর্ডিং করছিলেন, খ্যাপা নিতাইয়ের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন।
তৃষা তার ঘরের টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিল। লুচি, ডিমের ডালনা, মিষ্টি আরও কী কী যেন। ফিরে না তাকিয়েই বলল, খুব ভাল। এ জায়গা যাদের কাছে ভাল লাগে আমি তাদের খুব পছন্দ।
করি।
মণিদীপা তৃষার কাছ বরাবর এগিয়ে গিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, মৌমাছি কামড়ালে কী লাগাতে হয় জানেন?
তৃষা চট করে মুখ তুলে বলে, তোমাকে কামড়েছে নাকি?
না।
মণিদীপা ইঙ্গিতে দীপনাথকে দেখিয়ে দিয়ে বলে, ওঁকে। দেখুন চোখ কেমন ফুলে আছে।
