মণিদীপা সাধু-সন্তদের পাত্তা দেয় না। শুধু এ লোকটা গরিব বলেই তার যা কিছু কৌতূহল। সে দু’পা এগিয়ে গিয়ে বলে, এই ঘরে তুমি থাকো?
আজ্ঞে।–নিতাই এক পা পিছিয়ে যায়।
দেখি তো তোমার ঘরটা।
এই চোস্ত মেয়েটা তার ঘরে ঢুকবে ভেবে নিতাই একটু বিপদে পড়ল। এ বাড়িতে যারা আসে তাদের তো এ ঘরে ঢোকার কথা নয়। বউদি শুনলে আবার না তার বাপান্ত করে ছাড়ে। তাই সে বলল, আজ্ঞে ভিতরে ভয়ের জিনিস আছে। করোটি, কঙ্কাল আরও কত কী! মেয়েদের ঢোকা বারণ।
তুমি ওই সব বুজরুকি করে বেড়াও?
এসব কথা নিতাই অনেক শুনেছে। মাথা চুলকে বলল, বুজরুকি হবে কেন মেমসাহেব, খাঁটি জিনিস লোকে সহজে চিনতে চায় না। একটা কথা বলব, রাগ করবেন না?
না, রাগের কী? বলল।
আমার একটা ফোটো খিঁচে দেবেন?
মণিদীপা হাসে, দেব না কেন? এসো, আর একটু আলোর দিকে সরে এসো।
দাঁড়ান তা হলে, জিনিসপত্র সব নিয়ে আসি।
বলে নিতাই মুহূর্তে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। কয়েক মিনিট বাদে যখন বেরিয়ে এল তখন তাকে আর চেনা যায় না। সর্বাঙ্গে ধুনির ছাই মাখা, গলায় হাড়ের আর রুদ্রাক্ষের দু’গাছি মালা, এক হাতে নরকরোটি পানপাত্র, অন্য হাতে সিদুর মাখা ত্রিশুল।
মণিদীপা হেসে ফেলে বলে, তোমাকে একদম ক্লাউনের মতো দেখাচ্ছে।
খুব জুত করে তুলবেন। সবটা যেন ওঠে।
বলে খুব গম্ভীরভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় নিতাই।
মণিদীপা তার গোটা তিনেক ছবি তুলে নিয়ে বলে, তুমি তো সাধু মানুষ, ফোটো দিয়ে কী করবে?
যজমানদের দেব। তারা পুজো করবে।
বলো কী?
নিতাই খুব লজ্জার সঙ্গে হেসে বলে, আজ্ঞে তারা খুব মানে আমাকে।
ধর্মটর্ম সব নির্মাদের ব্যাপার। তুমি আর কোনও কাজটাজ করো না?
এই করেই বলে সময় পাই না। আর কাজ করব কখন?
মণিদীপা বলল, চলো তোমার ঘরটা দেখাবে আমাকে।
এবার নিতাই খাতির করে বলল, আসুন আজ্ঞে। সাধু-সন্নিসির ঘর আপনার হয়তো অসুবিধে হবে।
না, না, আমার কোনও অসুবিধে নেই।
সারা বাড়ি আর বাগান তোলপাড় করে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে যখন দীপনাথ নিতাইয়ের ঘরে উঁকি দিল তখন চোখ কপালে উঠল তার। নিতাইয়ের পঞ্চমুণ্ডীর আসনের ওপর মণিদীপা বাবু হয়ে আঁট করে বসে আছে। নিতাই তার সামনে মাটিতে ছক কেটে বাণ মারার কায়দা দেখাচ্ছে।
৪৯. ঝোপড়ার দরজায় দীপনাথ
ঝোপড়ার দরজায় দীপনাথ উঁকি দিতেই মণিদীপা মুখ তুলে চাইল। একটু হেসে ইঙ্গিতে নিতাইকে দেখিয়ে বলল, হি ইজ এ কমপ্লিট ফ্রড।
সো অ্যাম আই অ্যান্ড সো ইউ অল আর। এখন চলুন তো, বউদি আপনাকে ভীষণ খুঁজছেন।
দীপনাথ কথা বলতেই ঝোপড়ার ভেতরকার চিমসে কটু বদখত একটা গন্ধ পেয়ে নাক কুঁচকে বলে, এই বিকট গন্ধের মধ্যে বসে আছেন কী করে?
মণিদীপা উঠে আসছিল। বাইরে এসে মিষ্টি হেসে বলল, আমি এক সময়ে কলকাতায় বস্তিতে বস্তিতে সোশ্যাল ওয়ার্ক করেছি। নোংরা, বদগন্ধ, আব্রুর অভাব, পভার্টি যদি সহ্য করতে পারেন তবে দেখবেন লোকগুলো খারাপ নয়। দে আর অল লাইক ইউ অ্যান্ড মি।
অভিজ্ঞতাবলে দীপনাথ জানে, কথাটা সত্যি নয়। তবু সে তর্কে না গিয়ে বলল, আপনি অনেক কিছু পারেন দেখছি। আমি খ্যাপা নিতাইয়ের ঝোপড়ায় এর আগেও বার কয়েক হানা দিয়েছি। ভিতরে ঢুকতেই গা ঘিনঘিন করেছে।
মণিদীপা দীপনাথের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলে, বেচারার একটা বউ ছিল, আপনি জানেন?
কে না জানে? বউ পালানোতেই তো নিতাই পাগল হল।
হাসছেন? লোকটা যে বউকে অতটা ভালবাসত তার জন্য কষ্ট হয় না আপনার?
হয়। আই অ্যাম অলওয়েজ উইথ দা হাজব্যান্ডস।
জানি। ব্যাখ্যা করতে হবে না।
এতক্ষণ পালিয়ে পালিয়ে আর কী কী করলেন?
ওই যা!–বলে থমকে দাঁড়ায় মণিদীপা।–আমার টেপ-রেকর্ডারটা পড়ে আছে জঙ্গলের মধ্যে।
কী সর্বনাশ! টেপ-রেকর্ডারও সঙ্গে এনেছেন নাকি?
আনব না তো কী? কলকাতায় বসে মৌমাছির শব্দ শুনব বলে… দাঁড়ান দেখে আসি।
বলে মণিদীপা কুঞ্জবনের দিকে প্রায় দৌড়তে থাকে। পিছনে দীপনাথ।
খাস জঙ্গলের ওপর ক্যাসেট শেষ হওয়া টেপ-রেকর্ডারটা পড়েই ছিল। স্পিকারের ওপর পাখি ননাংরা ফেলে গেছে। মণিদীপা রি-উইনড করে একটু শুনল শব্দটা। মুখ গোমড়া করে বলল, একদম ভাল সাউন্ড আসেনি।
দীপনাথ হেসে বলে, টেপ-রেকর্ডারটা যে চুরি হয়ে যায়নি সেটাই ভাগ্য বলে জানবেন।
আপনার সঙ্গে আমার তফাত কোথায় জানেন?
কোথায়?
আপনি সবসময়ে জিনিসটার কথা ভাবেন, তার পারপাসটার কথা ভাবেন না। আমার কাছে অনেক বেশি জরুরি হল মৌমাছির শব্দ, পাখির ডাক। আপনার কাছে তার চেয়ে ঢের বেশি দামি জিনিস এই যন্ত্রটা। আপনি এত অ্যান্টি-রোমান্টিক কেন বলুন তো!
তার মানে আমি আপনার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী।
আমি যে বাস্তববাদীদেরই সবসময়ে পছন্দ করি তা কিন্তু নয়।
তা জানি। সেই জন্যই বোধহয় আপনি আমাকে কোনওদিনই পছন্দ করেননি।
মণিদীপা মৃদু একটু হাসল। তারপর বলল, আপনি বাস্তববাদী এ কথা কিন্তু আমি স্বীকার করিনি। আপনি রোমান্টিকও নন তা বলে।
তা হলে আমি কী?
আপনি ভীষণ হাঁদারাম।
দীপনাথ হাসল বটে, কিন্তু এই খুকি চেহারার এঁচোড়ে পাকা মেয়েটাকে একটা গাঁট্টা মারবার জন্য তার হাত একটু নিশপিশও করছিল। ঘাসজঙ্গলে মিষ্টি ছায়ায় দু’জন মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসে। মুখ নিচু করে মণিদীপা ক্যাসেটটা যন্ত্র থেকে খুলে আনল। নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আর-একটা নতুন দামি ক্যাসেট বের করে ভরল টেপ-রেকর্ডারে।
