থাকুন না। উনি তত তোমাদের কাছেই এসেছেন।
তৃষা বলল, তা বটে। তবু তোমার একেবারে বেপাত্তা থাকা ভাল নয়। কিছু ভাববে।
ওরা অত ভাবে না।
তুমি তবে কী করবে এখন?
একা একা একটু ঘুরে বেড়াই।
আজ এখানে এসে তোমার ভাল লাগছে না!
না বউদি। মনটা ভাল নেই।
তোমার বউদির কপালটাই খারাপ।
কাল রাতে কারা এসে নাকি তোমাকে বোমা মেরেছিল! কই, বলোনি তো!
তৃষা মুখ টিপে হেসে বলল, মরলে তো বাঁচতাম।
গেঁয়ো মেয়েদের মতো কথা বোলোলা না। কী হয়েছিল?
কী করে বলব? কুকুরটা চেঁচাচ্ছিল শুনে উঠে দরজা খুলতেই ভীষণ কাণ্ড।
তোমার কোথাও লাগে-টাগেনি তো?
না। আমার কইমাছের প্রাণ। লাগলেও মরতাম না।
তুমি কাউকে সন্দেহ করো?
তৃষা চিন্তিত মুখ করে বলে, কাকে সন্দেহ করব? আমার শত্রুর অভাব তো নেই, কিন্তু এতটা কেউ করবে বলে ভাবিনি কখনও।
মেজদার কোনও হাত আছে বলে সন্দেহ হয়?
তৃষা বড় বড় চোখে দীপনাথের মুখের দিকে অকপটে চেয়ে বলে, হঠাৎ এ কথা কেন?
মেজদাই বলছিল, তুমি নাকি ওকে সন্দেহ করছ!
তৃষা মাথা নেড়ে ধীরে কেটে কেটে বলে, না। সে প্রথম একটু সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম, মেজবাবুও অতটা করবে না। তার সেই সাহস নেই। তবে ওর শুভাকাঙ্ক্ষী তো অনেক। তারা কেউ এ কাণ্ড করেছে কি না কে বলবে?
মেজদা লোক ভাল নয় বউদি, সবাই জানে। তবু বলি, আমাদের চার ভাইয়ের মধ্যে মেজদা আর সোমনাথের কোনও কিলার-ইনস্টিংক্ট নেই। ওরা রক্ত দেখতে ভয় পায়। বাকি দু’জন? বলে তৃষা চিকচিকে চোখে তাকায়। মুখ টিপে হাসে।
বড়দার ছিল। ইনফ্যাক্ট বড়দা এক-আধটা খুনখারাপি করেছে বলে শুনলেও আমি অবাক হব না।
আর তুমি?
আমার কথা আমি নিজে বলি কী করে? তবে আমাকে যদি কেউ কোণঠাসা করে ফেলে, যদি মরিয়া করে তোলে তা হলে কাউকে খুন করা আমার পক্ষে হয়তো তেমন অসম্ভব নয়।
মাগো! বোলো না, শুনলে ভয় করে।
দীপনাথ খুব কষ্ট করে মুখে হাসি টেনে বলল, ঢং কোরো না বউদি, আমি তোমাকে জানি। ভয়ডর তোমার কুষ্ঠিতে লেখা নেই। বোমা মারার ব্যাপারে তোমার মেজদাকে সত্যিই সন্দেহ হয় না তো?
বললাম তো, না।
তা হলে সজলকে মেজদার কাছে রেখে স্বস্তি পাও না কেন?
তৃষা একটু থমকে গিয়ে বলে, তুমি আজকাল বড় জেরা করো, দীপু। সব কথা তোমাকেও বলা যায় না। তবু জেনে রাখো, আক্রোশ মানুষকে অনেক দূরে টেনে নামাতে পারে।
দীপনাথ চিন্তিত মুখে বলে, তাই দেখছি।
আমার মতো বয়স হোক, আরও অনেক কিছু দেখবে।
দীপনাথ ভ্রুকুটি করে বলে, তোমার বয়স কত?
তোমার চেয়ে পাঁচ-ছ’ বছরের বড়।
ইয়ারকি কোরো না। বিয়ের সময় তুমি নিতান্ত ছুকরি ছিলে। খুব বেশি হলে তুমি আমার সমান বয়সি বা এক-আধ বছরের ছোটই হবে।
খুব টেক্কা মারার শখ, না?
তোমারই বা অত বুড়ো সাজার বাই কেন? এই সেদিনও রঙিন শাড়ি পরা নিয়ে ঝামেলা করছিলে।
বয়স হয়েছে গো। তুমি যতই আমাকে খুকি দেখতে চাও না কেন, বয়স বসে নেই। এখন ঘরে চলো তো!
তোমার ঘর খুব সুন্দর বউদি, কিন্তু আমার বাইরেটাই বেশি ভাল লাগছে।
তুমি কি মণিদীপাকে লজ্জা পাও, দীপু?
যাঃ, কী যে বলো! লজ্জার ব্যাপার নয়, তবে অনারেবল ডিসট্যান্স বজায় রাখি মাত্র।
আমার রিপ্রেজেনটেটিভ হয়ে একটু গিয়ে ওঁর কাছে বোসো। আমি গিয়ে তোমাদের খাবারদাবারের ব্যবস্থা দেখি।
খাওয়ার দরকার নেই। যত দূর জানি মিসেস বোস ডায়েটিং করছেন, আর আমার আজকাল খিদে পায় না।
তবু। বহুদুর থেকে এসেছ। এসো, গুরুজনদের কথা শুনতে হয়।
কিন্তু ঘরে মণিদীপা ছিল না। আশেপাশে কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না।
নিজের মস্ত ভ্যানিটি ব্যাগে লুকিয়ে দুটো জিনিস এনেছিল মণিদীপা। একটা ছোট ক্যামেরা আর একটা টেপ-রেকর্ডার।
তৃষা গৃহকর্মে গেলে সে ফাঁকা ঘরে একটুক্ষণ বসে ছিল। তারপর পায়ে পায়ে বেরিয়ে এল বাইরে।
আগেরবার এসে একটা ছোটখাটো আম্রকুঞ্জে বিস্তর মৌমাছির চাক দেখে গিয়েছিল। গাছের জড়াজড়ির মধ্যে নীচে ঘন ছায়া। সেই জায়গায় সারাক্ষণ সেতারের ঝালার মতো মৌমাছির গুঞ্জন। তা ছাড়া চারদিক থেকে আচমকা আচমকা অদ্ভুত পাখির ডাক চলে আসে। গাছের পাতার ভিতর দিয়ে দমকা বাতাস বয়ে যাওয়ার রহস্যময় শব্দ ওঠে।
জায়গাটা খুঁজে বের করতে কষ্ট হল না তার। বাড়ির পিছন দিকে একটু চোখের আড়াল জায়গা। কেউ তেমন নজর দেয়নি বলে এদিকটায় ঝোপঝাড় গজিয়ে উঠেছে। এখনও মাঝে মাঝে শরতের খেয়ালখুশির বৃষ্টি আসে বলে মাটি সঁতসেঁতে ভেজা।
কুঞ্জবনের মধ্যে বড় বড় ঘাস, ঘন ছায়া। জমজমাট শব্দের আসর বসেছে। নাক-মুখ ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে মৌমাছি। মণিদীপার গায়ে একটু কাটা দেয়। টেপ-রেকর্ডারটা বের করে ঘাসের ওপর রাখে সে। বোতাম টিপে যন্ত্রটা চালু করে সে সরে আসে বাইরে।
পঁয়ত্রিশ মিলিমিটারের ক্যামেরায় এলোপাথাড়ি ছবি তুলতে থাকে। চারদিকে শুধু গাছপালা। এই জঙ্গলের ছবি তুলে তেমন লাভ নেই ভেবে মণিদীপা একটা জুতসই পাখি খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির বিশাল সীমানার মধ্যে অনেকটা চলে গিয়েছিল। আচমকা কে ডাকল, সেলাম মেমসাহেব।
মণিদীপা তাকিয়ে দেখে একটা অত্যন্ত হতদরিদ্র কুটিরের দরজায় সাধুগোছের একটা লোক দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোচ্ছে।
গরিব দেখলেই মণিদীপার আবেগ জেগে ওঠে। সে বলে, তুমি কি এই বাড়ির কাজের লোক?
ঠিক কাজের লোক নই মেমসাহেব, আমি হচ্ছি যোগী নিত্যানন্দ। অনেকে নিতাই অবধূতও বলে। মারণ উচাটন বশীকরণ যা দরকার বলবেন, কাজ হয়ে যাবে।
