দীপ মুখ তুলে হাসে, বলো।
সজলের মুখশ্রীতে তার মায়ের আদল। কিন্তু লম্বাটে গড়ন আর চোখমুখে নির্ভীক এক দৃঢ়তার ভাব থাকায় তাকে ঠিক শ্রীনাথের ছেলে বলে মনে হয় না বটে। এটুকু মল্লিনাথের। বউদি কথাটা সেদিন স্বীকার করেনি। স্বীকার করার দরকারও নেই। সজল বড় হলে কথাটা আপনি স্বীকৃতি পেয়ে যাবে।
আগে দীপ, পিছনে সজল ভাবন-ঘরের বারান্দায় উঠে এল। দরজা ভেজানো। ঠেলে ঢুকবার মুখে বৃন্দা পথ আটকাল, কোথায় ঢুকেছ এসে বাবুরা? রুগির ঘর যে! অমন হুটহাট ঢুকলে হবে কেন?
দীপ মৃদু স্বরে বলে, রুগির ভালর জন্যই আসা।
পিছন থেকে সজল হুমকি দিয়ে ওঠে, তোমার সব তাতেই অত সর্দারি কেন বলল তো বৃন্দাদি! মারব একদিন ঝাপড়।
সজলের একখানা হাত নিঃশব্দে চেপে ধরে দীপনাথ এবং সজল চুপ করে যায়।
বৃন্দা বলে, বাবু এখন ঘুমোচ্ছে। একটু আগে ওষুধ দিয়েছি, কিন্তু খেল না।
কেন খেল না?—দীপনাথ জিজ্ঞেস করে।
ঠোঁট উলটে বৃন্দা বলে, ভগবান জানে। ঘুমের ঘোরে ভুল বকছিল না কী, বলল তো ওষুধে বিষ আছে।
সত্যিই ঘুমিয়েছে তো?
মটকা মেরে পড়ে থাকলে ঠিক বুঝতাম। তা নয়। নাক ডাকছে। পা টিপে টিপে এসে দেখে যাও।
দীপনাথ আর সজল নিঃসাড়ে ঘরে ঢোকে। শ্রীনাথ বাঁকাতে শুয়ে বাস্তবিকই ঘুমোচ্ছ। শিশুর মতো অসহায় গভীর ঘুম।
দু’জনে আবার নিঃসাড়ে বেরিয়ে আসে।
সজল বলে, বড়কাকা, তা হলে কী হবে?
তোমার বাবা যখন ঘুম থেকে উঠবেন তখন এসে সত্যি কথাটা এক ফাঁকে জানিয়ে যেয়ো ওঁকে।
আচ্ছা।
বাবাকে ভালবাসো তো সজল?
সজল হাসে। মাথা নিচু করে বলে, বাসি। তবে বাবা একটু কেমন যেন। আর সকলের মতো নয়।
তা হোক। সবাই তো সমান হয় না। বাবাকে একটু ভালবেসো। দুনিয়ায় খুব কম লোকই তোমার বাবাকে ভালবাসে। তুমি কিন্তু বেসো।
আচ্ছা।
আর-একটা কথা।
কী?
তোমার বাবা কাল রাতের ওই বোমার পর থেকে খুব ভয়ে ভয়ে আছে। ওঁর সন্দেহ কেউ ওঁকেও খুন করবে। তুমি এখন থেকে বাবার কাছে থেকো। পারবে?
মাকে রাজি করাও, পারব।
তোমার মাকে আমি বলে যাব।
কিন্তু মা রাজি হবে না।
কেন?
বাবা যে মদ খায়। মাতাল হলে যা-তা বিশ্রী গালাগাল দেয়।
সে অন্য সময়ে। এখন তোমার বাবা অসুস্থ। মদ খাওয়া বা গালাগাল দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
বলছি তো, মা বললে থাকব।
সজলকে ভিতরবাড়ি পর্যন্ত আর টেনে নিল না দীপ। মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে বলল, এবার খেলতে যাও।
সজল এক ছুটে ফটক পেরিয়ে পালাল।
দীপনাথকে খুঁজতে হল না। ভিতরবাড়িতে ঢুকবার মুখেই বউদির সঙ্গে দেখা। ট্রেতে তোয়লের ঢাকনা দেওয়া খাবার চাকরের হাতে সাজিয়ে নিয়ে তৃষা ভাবন-ঘরে যাচ্ছে।
দীপ বলল, দাদা ঘুমোচ্ছে। অঘোর ঘুম।
তৃষা একটু শুকনো মুখ করে বলল, দুপুরেও প্রায় কিছু খায়নি।
এখন জাগিয়ে খাবার দিতে যেয়ো না। জাগলে বরং দিয়ো। দীপনাথ সতর্কভাবে বলে। সে জানে বিষপ্রয়োগের ভয়ে শ্রীনাথ খাবার দেখলে ভয় পাবে, চেঁচামেচিও করতে পারে। দীপনাথ মণিদীপার উপস্থিতিতে ঘটনাটা ঘটতে দিতে চায় না।
তৃষা চাকরকে বলে তবু, ট্রে-টা বৃন্দাকে পৌঁছে দিয়ে আয়। বলিস বাবু জাগলে দুধটা যেন গরম করে দেয়।
শোনো বউদি।–দীপনাথ খুব সিরিয়াস মুখে বলে।
কী? বলল।
আজ থেকে দাদার কাছে রাত্রিবেলা সজলকে রেখো।
সজলকে! কেন বলো তো?
দাদা তো ভিতু মানুষ জানোই।
তা খুব জানি। কিন্তু তার জন্য সজল কেন? সরিৎ আছে, মংলা আছে, নিতাই আছে।
দাদার কাছে সজলের থাকাই ভাল।
সজল! না না। তা হয় না।
কেন হয় না?
সজল ছেলেমানুষ, সে কী করবে?
কিছু করতে হবে না, শুধু থাকবে।
রুগি পাহারা দেওয়া কি ছেলেমানুযের কাজ? বরং আমি নিজেই থাকবখন। আমার তো ভয়ভীতি বলতে কিছু নেই।
তবু সজলকে রাখবে না?
তুমি আচ্ছা এক ছেলেমানুষ। বলছি না যে, রুগি দেখাশোনা করতে হলে সজলকে দিয়ে হবে না।
তা অবশ্য ঠিক। তবু সজল যদি ঘরে থাকে তবে দোষ কী? দাদা যখন ভাল হয়ে উঠবে তখন প্রতি রাতেই যদি সজল ওঁর কাছে থাকে তবে বোধহয় ভালই হবে। মেজদাকে একটু বুঝতে দেওয়া দরকার যে ওর আপনজন কেউ আছে।
এ কথায় স্পষ্টতই তৃষার চোখেমুখে একটা দুর্ভাবনা ফুটে ওঠে। সে বলে, পাগল হয়েছ? বোজ রাতে গিয়ে ও-ঘরে থাকলে একদিন সজলের গলা টিপে ধরবে না!
অবাক দীপনাথ বলে, কে ধরবে? মেজদা?
তৃষা একটু লজ্জা পায়। বলে, সজল আমার একটামাত্র ছেলে, জানোই তো। ওকে কোনও রিস্কের মধ্যে ফেলতে চাই না।
রিস্ক কিসের?
আছে। সব তুমি বুঝবে না।
একটু বিরক্তির গলায় দীপনাথ বলে, রিস্কই যদি থাকবে তবে সজল সন্ধের পর মেজদার কাছে পড়া বুঝতে যায় কী করে?
যায়, কিন্তু কখনও একা যায় না। সজল নিজেও জানে না, ওর পিছনে লোক থাকে। ঘরের আশেপাশেও আমি পাহারা রাখি। চোখের আড়াল হতে দিই না।
এ কথাটার মধ্যে যেন মেজদাকে জড়িয়ে তাদের পুরো বংশের ওপরেই একটা কলঙ্ক আবোপ করা হল। অপমানে হঠাৎ দীপনাথ তেতে ওঠে, লাল হয়। কিন্তু মুখে জবাবও আসে না। শ্রীনাথ তাদের পুরো পরিবারকে এত দূর অধঃপাতে টেনে নামিয়েছে।
তৃষা মুখ তুলে ভিখিরির মতো গলায় বলে, দোষ নিয়ো না। ওকে বিশ্বাস করার উপায় আমার নেই। আমি অনেক ঠকে, অনেক ঠেকে অনেক শিখেছি।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল, ঠিক আছে।
তোমার মেজদা কি তোমাকে কোনও ভয়ের কথা বলেছে?
বলেছে।
কী বলেছে?
দীপনাথ আনমনে বলে, ওই ভয়টয়ের কথা।
তৃষা আর প্রসঙ্গটা বাড়ায় না। বলে, এসো। উনি বসে আছেন।
