ভাল করে খুঁজে দেখ। ওপরের তাকে, ডানদিকে জামাকাপড়ের ভাঁজে ঢোকানো আছে।
দীপনাথ খুঁজল। পেল না। বলল, না নেই।
তাহলে সরিয়ে নিয়েছে। ওরা সব খোঁজ রাখে।
কেউ সরিয়ে নিলে তোমার ভালই করেছে। এ শরীরে খেলে তুমি বাঁচবে না।
এমনিতেও মরব। কথাটা তা নয়। ওরা আমার কিছুই গোপন বা ব্যক্তিগত থাকতে দেবে না। কেন যে আমার পিছনে লেগেছে! তুই মেসে আমার জন্য আজই একটা সিট বুক করবি গিয়ে।
করব। কিন্তু তোমার বাগান?
বাগান! —শ্রীনাথ হতাশায় চোখ বুজে বলে, সেই গিরিশবাবুর মতো বলতে হয়—আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল।
আবার কোটেশন শুনে দীপনাথ হাসল। বলল, বাগান শুকোবে কেন? তুমিই শুকিয়ে যাচ্ছ, মেজদা। এখন ঘুমোও।
বৃন্দা কোথাও গিয়েছিল। এখন ঘরে এসে ঢুকেই বলল, এ কী! বাবু জাগলেন কখন?
দীপনাথ একটু বিরক্তির সঙ্গে বলে, তুমি রুগির দেখাশুনো করছ নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কোথায় গিয়েছিলে? এরকম একা ঘরে ফেলে যাওয়া উচিত হয়নি।
বড় গোরুটা খোঁটা উপড়েছে শুনে ধরতে গিয়েছিলাম। বড় তেজি গাই। অন্য কাউকে মানে না।
আর যেয়ো না।
আচ্ছা। বাবু, একটু দুধ-টুধ কিছু আনি?
শ্রীনাথ আতঙ্কের সঙ্গে বলে, না, না। আমি কিছু খাব না। তুই কাজে যা, আমি ভাল আছি।
মা’ঠানকে একটা খবর দিই গে?
কোনও দরকার নেই। আমি এখন ঘুমোব।
বলে শ্রীনাথ পাশ ফিরে কোলবালিশ আঁকড়ে চোখ বোজে। আত্মরক্ষার এর চেয়ে ভাল পদ্ধতি সে আর খুঁজে পায় না।
দীপনাথ মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে বৃন্দাকে ঘরের বাইরে যেতে বলে। বৃন্দা চলে গেলে শ্রীনাথের কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলে, কোনও ভয় নেই। ঘুমোও।
ঘুম আসবে না। দেখ তো টেবিলে ঘুমের কোনও ওষুধ আছে কি না।
দীপনাথ টেবিলে একটা ট্রাংকুইলাইজারের ছোট শিশি পেয়ে গেল। একটা বড়ি শ্রীনাথকে গিলিয়ে দিয়ে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল সে। শ্রীনাথ খুবই অবসন্ন ছিল। সকালের ঘুমের ওষুধের ক্রিয়াও রয়েছে ভিতরে। ফলে দশ মিনিটের মধ্যে শান্তভাবে ঘুমিয়ে পড়ে।
দীপ বেরিয়ে এসে দরজাটা টেনে দেয়। তার ভ্রু কোঁচকানো, মনটা ভার। মানুষের এরকম ভয়ংকর মানসিক যন্ত্রণার চেহারা সে খুব কমই দেখেছে, যতটা শ্রীনাথের মধ্যে দেখা গেল। শ্রীনাথের আর যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেটুকু কুরে কুরে খেয়ে নেবে ওই অবিশ্বাস আর সন্দেহ।
ভেতরবাড়িতে যাওয়ার রাস্তার ধারে একটা গাছতলায় ঠেস মেরে বসে রইল দীপনাথ। সাড়ে চারটের সময় ফটক খুলে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে সজল ঢুকল।
সজল! —দীপনাথ কোমল স্বরে ডাকে।
বড়কাকা!-সজলের ক্লান্ত মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কখন এলে?
বেশিক্ষণ নয়।
সজল এসে তার হাত ধরে বলে, ভিতরে চলল! মা রোজ তোমার কথা বলে।
তোমার মার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
বাবার খুব অবস্থা খারাপ, জানো? আজ সকালে বাবার স্ট্রোক হয়েছে। ডাক্তার বলেছে, অবস্থা এখন-তখন।
তোমার বাবার সঙ্গে এইমাত্র কথা বলে এলাম।
সজল অবশ্য এ কথায় অপ্রতিভ হয় না। হাসে। বলে, বাবা ভীষণ ভিতু।
তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে, সজল। তোমার জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম।
কী কথা?
তুমি কি তোমার বাবাকে বলেছ যে, সরিৎ বোমা বানায়?
বোমা! কই, না তো!
বলোনি?—দীপনাথ একটু অবাক হয়।
সজল ঠিক বুঝতে পারছিল না, সত্য কথাটা বলা উচিত হবে কি না। কিন্তু বড়কাকা তার ভীষণ প্রিয়। এই কাকার কাছে তার সব সত্যি কথা বলে দিতে ইচ্ছে করে। সে চোখ নামিয়ে বলে, আমি
আসলে বাবাকে একটু ভয় খাওয়ানোর জন্য বানিয়ে বলেছিলাম।
কাজটা ভাল করোনি। তোমার বাবা খুবই ভয় পেয়েছেন। তা ছাড়া কথাটা পাঁচ কান হলে তোমার মা আর ছোটমামাও বিপদে পড়বেন। তুমি কি তা চাও?
আমি আর কাউকে বলিনি।
বোলো না। এখন যাও হাত-মুখ ধুয়ে বাবার কাছে গিয়ে একটু বোসো। বাবাকে বোলো, তুমি বোমা বানানোর কথাটা বানিয়ে বলেছ।
বাবা যদি রাগ করে?
করবে না। বরং খুব খুশি হবে। আমিও ও-ঘরেই থাকব’খন, ভয় নেই।
আচ্ছা।-বলে মাথা নেড়ে চলে গেল সজল।
দীপ উঠে বাগানের মধ্যে হেঁটে বেড়াতে লাগল খানিক এলোমেলো উদ্দেশ্যহীনভাবে। অভিশাপ বলে কিছু মানে না সে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, বড়দা মল্লিনাথের এই গোটা বাড়ি এবং সম্পত্তির ওপর একটা অভিশাপ ছায়া বিস্তার করে আছে শকুনের মতো। এখানে আসার আগে অবধি শ্রীনাথ বা তৃষা সুখেই ছিল তো! যেই এ বাড়ির মৌরসি পাট্টা পেল তখন থেকে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠল ওদের জীবন। দুর্বহ হল বেঁচে থাকা। এখন তার সন্দেহ হচ্ছে, শ্রীনাথ হয়তো খুব বেশিদিন বাঁচবেও না। বড়দা মল্লিনাথ গেছে, এখন শ্রীনাথও যদি যায় তবে সেটা বড় দুঃখের হবে।
৪৮. এ বাড়িটা অভিশপ্ত কি না
এ বাড়িটা অভিশপ্ত কি না তা অনেক ভেবেও স্থির করতে পারল না দীপনাথ। প্রকৃতপক্ষে অভিশাপ-টাপ গোছের কিছুকেই সে বিশ্বাস করে না। তার ঈশ্বরবিশ্বাস বলেও তেমন কিছু নেই। সে ভূত-প্রেতও মানে না বহুকাল। তবু বড়দা মল্লিনাথের এই শখের বাড়ির বাগানে বসে সে আজ এক দীর্ঘশ্বাস ও অভিশাপকে টের পায়।
যখন গরিব ছিল তখনই ভাল ছিল মেজদা। যেই বড়দার সম্পত্তি পেল অমনি সত্যিকারের গরিব হয়ে গেল। আজ শ্রীনাথ ও তৃষার সমস্যা বোধ হয় চিকিৎসার অতীত। দুটো মানুষের মধ্যে ফেনিয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত ও বিচিত্র শত্রুতার জটিলতা। তার মধ্যে তৃতীয় কোনও মানুষ ঢুকতেই পারবে না।
আজ মেজদার জন্য খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে দীপনাথ। মাথা নিচু করে ঘাস ছিড়ছিল সে। এমন সময় সজল খুব কাছ থেকে ডাকল, বড়কাকা!
