হতাশ শ্রীনাথ চোখ বুজে বলে, তোরা অন্ধ। তোরা কোনওদিন টুথটাকে ধরতে পারবি না। ও তোদের জাদু করে রেখেছে।
বউদি যদি জাদু চালিয়ে থাকে তবে তুমিও কিছু পালটা জাদু চালাও না! কে বারণ করছে?
ও হচ্ছে লেডি ম্যাকবেথ। অ্যামবিশাস, ক্রুয়েল..
সব বুঝলাম। তবু বউদি তার কর্তব্য করে যাচ্ছে। এ বাড়ির দরজা এখনও আমাদের মুখের ওপর বন্ধ করে দেয়নি। বাবাকে আমরা কোনও ভাই-ই দেখিনি। বউদি দেখছে। তোমার লজ্জা করা উচিত, মেজদা।
শ্রীনাথ চুপ করে থাকে। দীপনাথ খানিকটা সময় ছাড় দিয়ে বলে, কাল রাতে বোমা কীভাবে ফাটল তা জানো?
না। তৃষা মাঝরাতে এসে ঘুম থেকে তুলে আমার কাছেই জানতে চেয়েছিল বোমাটা কে বা কারা মেরেছে।
তার মানে বউদি তোমাকে সন্দেহ করে!
কে জানে! হয়তো করে।
তুমি জানো কিছু?
কী জানব? সকালে সজলের কাছে শুনে বুঝলাম, সরিৎ বোমা বানায়। হয়তো রাতে গোপনে বানাচ্ছিল, অ্যাকসিডেন্টালি ফেটে গেছে।
তাই যদি হয় তবে বউদি পুলিসে খবর দেবে কেন? খবর দিলে তো নিজেদেরই ধরা পড়ার সম্ভাবনা। পুলিস বাড়িটা তন্ন তন্ন করে দেখবেই।
শ্রীনাথ যুক্তিটা বোঝে। তবু মিনমিন করে বলে, কাল রাতে কী হয়েছিল তা জানি না। তবে সরিৎ যে বোমা বানায়…
দীপনাথ একটু বিরক্ত হয়ে বলে, সজলের সব কথা বিশ্বাস কোরো না। ও বলে বেড়ায় আমি নাকি কুংফু জানি, পঞ্চাশটা লোককে একা ঘায়েল করতে পারি। আসলে সজল একটু রোমান্টিক, অনেক কিছু কল্পনা করতে ভালবাসে।
সরিৎ এক নম্বরের গুন্ডা, তুই জানিস না। স্টেশনের কাছে দুটো ছেলেকে চেন দিয়ে এমন মেরেছিল!
তুমি সব কিছুকে গুলিয়ে ফেলছ। সরিৎ গুন্ডা হলেই বা তোমার কী? আর বউদিকেই বা ওর সঙ্গে এক করছ কেন?
তোদের কিছুই বোঝানো যাবে না। তারা বুঝতে চাস না।
তোমারই বা বেশি বোঝার দরকার কী? দিব্যি খাচ্ছ, দাচ্ছ, চাকরি করছ, বউদিকে বেশি না ঘাটালেই হল।
তোরা তো তা বলবিই।
বোমাটা কোথায় পড়ল জানো?
না। আমি ভিতরবাড়িতে যাইনি। শুনছি, তৃষার শোওয়ার ঘরের বারান্দায়।
কী সর্বনাশ!
বোমা পড়া নিশ্চয়ই বিপজ্জনক। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ের কথা, তৃষা বলেছে বোমা যারা ফেলেছে তাদের জ্যান্ত ধরতে না পারলে মরা অবস্থায় ধরবে। তৃষা যা বলে তা করে।
জানি, মেজদা।
ও কেমনধারা মেয়েমানুষ?
দীপনাথের একবার বলতে ইচ্ছে হয়েছিল তুমি যেমনধারা পুরুষ। কিন্তু তা বলল না দীপনাথ। সে লক্ষ করল, অসুস্থ শ্রীনাথের চোখে-মুখে আতঙ্কের গভীর একটা ছাপ পড়েছে। তাই একটু কষ্ট হল দীপনাথের। সে বলল, তুমি মনে মনে বউদির একটা ভয়ংকর চেহারা বানিয়ে নিয়েছ বলে কষ্ট পাচ্ছ। আসলে হয়তো মানুষটা অত ভয়ংকর নয়।
তুই কিছু জানিস না।
তা হবে। কাল রাতে বউদিকে কেউ বোমা মেরেছিল এ খবর বউদি নিজে কিন্তু আমাকে বলেনি। লোকে খামোখা বউদিকে কেনই বা বোমা মারবে তাও আমি বুঝি না।
খামোখা নয়। ওকে এখানকার কেউই পছন্দ করে না।
পছন্দ যদি না করে, তবে সেটা বউদির দোষ নয়।
তোর মাথাটা তৃষা একেবারে চিবিয়ে খেয়েছে। তোরা তৃষার ভাল দেখ, আমার তাতে কী? শুধু আমার জন্য একটু আলাদা ব্যবস্থা করে দে। আমি ওর কাছ থেকে দূরে চলে যেতে চাই।
বিরক্ত দীপনাথ বলল, এখন একটু ঘুমোও, মেজদা।
শোন যাস না। রাতে আমার কাছে কে থাকবে?
তার মানে?
বাতে কারও আমার কাছে থাকা দরকার। আমি তৃষা আর সরিৎকে বিশ্বাস করি না।
তোমার মাথাটা গেছে, মেজদা। কী আবোল-তাবোল বকছ?
মোটেই আবোল-তাবোল নয়। যখন আমার ভালমন্দ একটা কিছু ঘটে যাবে তখন বুঝবি।
বলতে বলতে শ্রীনাথ কয়েকবার উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু ক্লান্তিতে পারল না। বালিশে আবার মাথা রেখে বলল, আমার কোনও অসুখ ছিল না। আজ সকালের চা-টা একটু তেতো তেতো লেগেছিল। চা খাওয়ার পর থেকেই–
দীপনাথ হাসল। বলল, তোমাকে মেরে বউদি বা সরিতের কী লাভ?
শত্রুর শেষ রাখতে নেই।
তুমি কি বউদির শত্রু?
ও তত তাই মনে করে।
কী করে বুঝলে?
আমি বুঝব না তো কে বুঝবে? কাল রাতে যখন তৃষা আমার কাছে এসেছিল তখন মাথাটা গোলমেলে ছিল বলে ওর কথার অর্থ ধরতে পারিনি। এখন ভেবে দেখলাম, আসলে বোমা মারার ব্যাপারে ও আমাকেই সন্দেহ করছিল।
দীপনাথ একটা মস্ত শ্বাস ছাড়ল। তারপর ঘড়ি দেখে বলল, তুমি আরও কয়েক ঘণ্টা ঘুমোও তো! ঘুমোলে উত্তেজনা, ভয় সবই কমে যাবে।
কিন্তু আজ রাতে আমার কাছে কে থাকবে?
খ্যাপা নিতাইকে ডেকে এনে মেঝেতে শুইয়ে রেখো, যদি একা নিতান্তই ভয় পাও।
নিতাই? নিতাই তো তৃষার লোক! এ বাড়িতে আমার লোক কেউ নেই, সবাই তৃষার। আমাকে তুই নিয়ে যা। তোর মেসে জায়গা হবে না?
দীপনাথ মেজদার মুখের ওপর কোনও কঠিন কথা বলতে পারল না। লোকটা ভয়ে সন্দেহে এত কাতর যে বেশি কিছু বললে আবার ভেঙে পড়বে।
দীপনাথ তাই মন-ভোলানো গলায় বলল, এ অবস্থায় তো যেতে পারবে না। শরীরটা সুস্থ হোক, আমি এসে নিয়ে যাব।
ঠিক বলছিস?
ঠিকই বলছি।
কিন্তু যদি স্লো পয়জন করে থাকে তবে সুস্থ হব কী করে? আর হয়তো বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারব না।
পারবে। একটু রেস্ট নাও, তা হলেই পারবে।
ওই কাঠের আলমারিতে একটা ব্র্যান্ডির বোতল আছে, এনে দে তো।
এই শরীরে ব্র্যান্ডি খাবে?
না খেলে যে ঘুম আসবে না। ডাক্তার একটা বোধহয় ঘুমের ওষুধ দিয়েছিল সকালে। তার এফেক্টটা কেটে গেছে। দুশ্চিন্তায় মাথাটাও গরম।
দীপনাথ উঠল। ইচ্ছে ছিল ব্র্যান্ডির বোতলটা বের করে ইচ্ছে করেই হাত থেকে ফেলে দিয়ে ভাঙবে। কিন্তু কাঠের আলমারিটা খুলে বোতলটা খুঁজে পেল না সে। বলল, কই? নেই তো!
