দূর পাগল!
প্রীতম হাসছেই। এতটুকু সিরিয়াস ভাব নেই মুখে, বিষণ্ণতাও নেই। যেন ঠাট্টা-ইয়ারকি করছে এমনিভাবে বলে, ওখানে গেলেই সেই ছেলেবেলায় সব কথা এসে ঘিরে ধরবে। সে ভারী সুখের ব্যাপার, কিন্তু ওগুলো মনকে দুর্বল করে দেয়। তার ওপর সকলে বুক বুক করে যত্ন-আত্তি শুরু করবে, সিমপ্যাথি দেখাবে। ব্যস অমনি আমার লড়াইয়ের মনটাই যাবে নষ্ট হয়ে। এখানে তো তা নয়। এখানে প্রতি মুহূর্তেই রুক্ষ বাস্তবতার সঙ্গে লড়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু এটাই আমার পক্ষে ভাল কেন জানো? আমাকে প্রতি মুহূর্তে জাগিয়ে রাখছে, সাবধান রাখছে, হাল ছাড়তে দিচ্ছে না, জেদ ধরিয়ে দিচ্ছে। যদি আমাকে বাঁচাতে চাও, মেজদা, কখনও শিলিগুড়ির কথা বোলো না।
দীপের স্বভাব হল যখনই কেউ কোনও কথা আন্তরিকভাবে বলে তখনই সে তা গভীরভাবে বিশ্বাস করে ফেলে। শিলিগুড়িতে গেলে প্রীতম কেন মরে যাবে তার যুক্তিসিদ্ধ কারণ থাক বা না-থাক দীপ তা বিশ্বাস করল এবং শিউরে উঠে বলল, না না, ওসব আর বলব না প্রীতম। তোর যাওয়ার দরকার নেই।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে দু’জন। প্রীতম তার দুর্বল হাত চোখের সামনে ধরে চেয়ে থাকে, যেন আয়নায় নিজের মুখ দেখছে। অনেকক্ষণ বাদে বলে, তুমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছ না মেজদা?
দীপ একটু অবাক হয়ে বলে, হ্যাঁ। অনেকদিন।
বেশিদিন নয়। মাত্র দু’-তিন মাস বোধহয়।
তাই হবে। দীপ বলে, কেন বল তো!
আগে তুমি অনেক সিগারেট খেতে। দিনে অন্তত চল্লিশটা।
হুঁ।–দীপ বুঝতে পারে না প্রীতম কী বলতে চায়।
অত সাংঘাতিক নেশা ছাড়লে কী করে?
দীপ উদাস হয়ে বলে, ছেড়ে দিলাম।
কষ্ট হয়নি?
খুব। ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। পাগলের মতো লাগত।
প্রীতম তার সুন্দর হাসিটা মুখে মেখে বলে, তোমার ভীষণ রোখ আছে মেজদা। সাংঘাতিক রোখ।
দীপ ম্লান একটু হাসে। ছিল, কোনওদিন তার মধ্যে একটু ইস্পাতের মিশেল ছিল। একটু ছিল হয়তো বিলুর মধ্যেও। ছিল বড়দা মল্লিনাথেরও। কিন্তু দীপের ভিতরকার সেই ইস্পাত জীর্ণ হয়ে গেছে আজকাল। বিকেলেই মিসেস বোস তাকে বলেছিলেন, আপনার আত্মমর্যাদাবোধ নেই কেন?
প্রশ্নটা এখনও পাথরের মতো বুকের ভিতরে ঝুলে আছে।
দীপ ছটফট করে উঠে বলে, বিলু কোথায় গেল বল তো!
পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চাটার আজ জন্মদিন। এক্ষুনি এসে পড়বে। বোসো।
দীপ ঘড়ি দেখে। সাতটা। তার কোথাও যাওয়ার নেই। এখান থেকে সে সোজা মেসবাড়িতে ফিরে যাবে। কারও সঙ্গেই কোনও কথা বলবে না। চুপচাপ খেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়বে সিঙ্গল বেডের বিছানায়। জীবনে অনেককাল কিছু ঘটেনি।
সে উঠে দাঁড়ায়। বলে, না রে, অনেক রাত হয়ে গেল।
প্রীতম করুণ মুখ করে চেয়ে বলে, চলে যাবে? রাতে খেয়ে যাও না! মেসে তো বিচ্ছিরি খাবার খাও রোজ।
দীপ মাথা নেড়ে বলে, আজ নয়।
তুমি মাঝে মাঝে এসে আমাকে একটু জোর দিয়ে যেয়ো। তোমার মনের জোরটা আমাকে দিতে পারো না?
দীপ খুব গম্ভীর মুখে বলে, তোর মনের জোর আমার চেয়ে কিছু কম নয় রে প্রীতম।
প্রীতম মুখ তুলে বলে, শোনো, শতম কলকাতায় এলে যেন আমার সঙ্গে দেখা না করে। ওকে দেখলেই সেইসব পুরনো কথা, মায়াটায়া এসে পড়ে। আমার পক্ষে ওগুলো ভাল নয়। ও যেন ভুল না বোঝে। ওকে বারণ করে দিয়ে।
দীপ মাথা নেড়ে বলল, আচ্ছা।
প্রীতম এমন কাঙালের মতো চেয়ে আছে যে, দীপ চট করে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে পারছিল না। তার বড় মায়া, তার বড় ভালবাসা এই ছেলেটির প্রতি।
দীপ তাই নিঃশব্দে আবার বসে, মেজদা বা সোমনাথ তোকে দেখতে আসে?
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, না। সোমনাথ একবার এসেছিল বহুদিন আগে। শ্রীনাথদা আসেনি।
দীপ গম্ভীর হয়ে বলে, আসা উচিত ছিল।
প্রীতম ক্লান্ত স্বরে বলে, তুমি মাঝে মাঝে এসো, তা হলেই হবে। আর কেউ না এলেও ক্ষতি নেই। বরং আত্মীয়দের আহা-উহু শুনলে আমার খারাপ রি-অ্যাকশন হয়। সিমপ্যাথি দেখানোর লোক আমি চাই না।
দীপ একটু হেসে বলে, তবে কী চাস? সেই পুরু রাজার মতো বীরের প্রতি বীরের ব্যবহার?
প্রীতম ক্ষীণ হাসে। বলে, ঠিক তাই।
দীপ শ্বাস ছেড়ে বলে, আমার রোখের কথা বলছিলি প্রীতম, কিন্তু তুই রোখা কিছু কম নোস। তুই পারবি মনের জোরে এসব কাটিয়ে উঠতে।
প্রীতম চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, শিলিগুড়িতে নয়, কিন্তু অন্য কোথাও গাছপালার মধ্যে, নদীর ধারে আমাকে কিছুদিন নিয়ে যেতে পারো না? বিলুকে বলেছি, কিন্তু ও তেমন গা করে না। বলে, বাইরে চিকিৎসা হবে না।
দীপ গম্ভীর হয়ে বলে, মেজদার ওখানে গিয়েই তো অনায়াসে থাকতে পারিস।
শ্রীনাথদা? ও বাবা, শ্রীনাথদার বউ ভারী কড়া লোক শুনি। সোমনাথ বিলুকে বলেছিল, বউদিই নাকি গুন্ডা ভাড়া করে ওকে মার দিয়েছে।
বাজে কথা। বউদি তেমন লোক নয়। বরং মেজদাই কিছু কাছাছাড়া লোক, তাই বউদি সম্পত্তি আগলে রাখে। তুই গেলে কত যত্ন করবে দেখিস।
তুমি কখনও গেছ ওখানে?
অনেকবার। বড়দা তখন বেঁচে। আমি গেলেই মুরগি কাটা হত। শ্রীনাথদার আমলেও গেছি। আরও সম্পত্তি বেড়েছে। ওরা বেশ ভাল আছে। তুই যাবি?
প্রীতম ম্লান মুখে বলে, কিন্তু ওরা না ডাকলে যাই কী করে? বিলু চিঠি লিখেছিল, শ্রীনাথদা জবাব দেয়নি। এখানেই তো রোজ চাকরি করতে আসে, একবার দেখাও তো করতে আসতে পারত। সেধে যেচে যাওয়াটা কি ভাল দেখাবে?
দীপ গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ভাই কত পর হয়ে যায়! রক্তের সম্পর্ক কথাটাই কি তা হলে এক বিকট ভুল?
