আর ঘুম!—বলে শ্রীনাথ আবার উঠে গিয়ে ছিপিতে ঢেলে ব্র্যান্ডি খায়।
তৃষা অন্ধকার বারান্দায় বেরিয়ে আসে। মস্ত বাগানের আনাচে-কানাচে এখনও টর্চ জ্বলছে।
তৃষা বারান্দা থেকেই চেঁচিয়ে বলল, তোদের আর খুঁজতে হবে না। ঘরে মা সবাই।
আনমনে রাস্তাটুকু পার হয়ে উঠোনে পা দিয়ে তৃষা দেখে, তার ঘরের সিঁড়িতে সরিৎ বসে আছে। হাতে একটা বেতের মোটা লাঠি। তার পাশে খ্যাপা নিতাই। নিতাইয়ের পায়ের কাছে ইস্পাত। তৃষাকে দেখে ইস্পাত উঠে এসে কুঁই কুঁই করে গায়ে পা তুলে আদর কাড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু কুকুরের আদরে বড় ঘেন্না তৃষার। বলল, যাঃ যাঃ।
সঙ্গে সঙ্গে ইস্পাত ভয় খেয়ে নিতাইয়ের কাছে ফিরে যায়।
তৃষা বলে, তোরা শুতে গেলি না?
সরিৎ হাই তুলে বলল, সাড়ে তিনটে বাজে, আর শুয়ে কী হবে?
তৃষা আর কিছু বলল না। বারান্দায় উঠে দরজার শিকল খুলল।
সরিৎ বলল, দরজাটা দিয়ে দাও। আমরা পাহারা দিচ্ছি।
তৃষা খুব অন্যমনস্ক। কথাটা শুনেও শুনল না। মশারি সরিয়ে বিছানার ধারে বসে রইল সে। স্ট্যান্ডে বন্দুকটা রেখে গেছে সরিৎ। তৃষার চোখ সেইদিকে। ভিতরে ভিতরে ফুঁসে উঠছে রাগ আর আক্রোশ। কিন্তু বাইরে খুব নিথর সে। মনে এখন আর কোনও ভয় বা বিভ্রান্তি নেই। তবে তীব্র জ্বালা আছে।
অনেকক্ষণ বসে থেকে তারপর উঠে স্টোভ জ্বেলে সে চায়ের জল চড়ায়। উঠোনে, বাগানে লোকজন জেগে পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু এই ভোরবেলা আর কোনও শত্রু এসে ঢুকবে না, এটা জানে। তৃষা। শত্রুরা জানে, এর পর তৃষা আরও সতর্ক হবে, নিষ্ঠুর হবে। তাই আর সহজে এ বাড়ির ছায়া মাড়াবে না তারা। কিন্তু মাড়ালেই যাও সুবিধে হত। হাতের মুঠোয় পেত তাদের।
পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক দিনের। তারা এনকোয়ারিতে এসে কী কী জিজ্ঞেস করবে তা সে জানে। তার কোনও শত্রু আছে কি না। কাকে তার সন্দেহ হয়। লোকগুলো কেমন দেখতে। ইত্যাদি।
তৃষা দরজা খুলেই বিস্ফোরণ দেখেছিল। আর কিছু মনে নেই। কিন্তু তৃষা জানে, দরজা খোলা এবং বোমা ফাটবার মধ্যে যে কয়েক সেকেন্ড সময় তার মধ্যেই তার চোখ অনেক কিছু দেখেছে। কিন্তু বোমার ধাক্কায় মাথাটা এতই গুলিয়ে আছে যে কিছুই মনে পড়ছে না! তবে মনটাকে শান্ত ও নিরুদ্বেগ করে যদি একাগ্রভাবে চিন্তা করে সে, তবে নিশ্চয়ই মনে পড়বে।
কিন্তু মনটাকে শান্ত করা কি সোজা! সংসারের এত জ্বালাপোড়া, এত ক্ষোভ রাগ হতাশা জমে আছে ভিতরে! মশারির মধ্যে বসে চোখ বুজে যতবার ভাববার চেষ্টা করল ততবারই অন্য সব বাজে চিন্তা হিজিবিজি কথা এসে লন্ডভন্ড করে দিল মাথা। ওই কয়েক সেকেন্ডের জরুরি স্মৃতি কিছুতেই মনে এল না।
উঠোনটা অন্ধকার ছিল। কুকুরটা দৌড়ে দৌড়ে ডাকছিল খুব। দরজা খুলে কী দেখেছিল সে? শুধু অন্ধকার? আর কিছুই নয়? কোনও অস্বাভাবিকতা নয়? কোনও গন্ধ বা শব্দ নয়? কোনও নড়াচড়া নয়? যে দু’জোড়া পায়ের শব্দ শুনেছিল তার আওয়াজ কেমন? চটির আওয়াজ না জুতোর? ভারী পা, না হালকা?
চারদিকে ফটফটে ভোরের আলো দেখা গেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল তৃষা। বহু কাজ।
বাকি রাতটুকু ভাল ঘুম হয়নি শ্রীনাথেরও। তৃষা চলে যাওয়ার পর একা ঘরে এক রক্ত-জল-করা ভয় তাকে পেয়ে বসল। এ কার ঘর সে করছে এতকাল? তৃষা অনেক কিছু করতে পারে, সে জানে। কিন্তু তা বলে খুন? মাথাটা গরম হয়ে উঠছিল, বুদ্ধি ঘুলিয়ে যাচ্ছে। বুকের মধ্যে উঠছে এক ধুকধুকনি। খুনখারাপি মারধর কোনওদিনই সহ্য করতে পারে না শ্রীনাথ। উঠে গিয়ে সে ব্র্যান্ডির বোতলটা বের করে আনল। জল মিশিয়ে অনেকক্ষণ খেল বসে বসে। তারপর শরীরে ঝিমঝিমনি উঠলে গিয়ে শুয়ে পড়ল। দুঃস্বপ্ন দেখল অনেক। উঃ আঃ শব্দ করল ঘুমের মধ্যেই।
একটু বেলায় ঘুম থেকে উঠল শ্রীনাথ। শরীর কাহিল, মন অবসন্ন। এত বিদঘুটে হ্যাংওভার বহুকাল হয়নি তার। প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সে গিয়ে মুখ-হাত ধুল। তারপর ইজিচেয়ারে পড়ে রইল মড়ার মতো। বাড়িতে বোমা পড়লেও যথাসময়ে চা এল ঠিকই। চেয়ে আরও এক পট দুধছাড়া চা আনিয়ে। খেল শ্রীনাথ। সঙ্গে অল্প ব্র্যান্ডি। কিন্তু মাথাটা অল্প অল্প ঘুরছে, শ্বাসের কষ্ট হচ্ছে বেশ।
সকালেই পুলিসের জিপ এসে ফটকের কাছে থেমে আছে। শ্রীনাথকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে অবশ্য কেউই এল না! এলে খুবই অস্বস্তিতে পড়বে সে। সে নিজেও জানে সত্যিকারের কাপুরুষ বলতে যা বোঝায় সে হচ্ছে তা-ই। তবে এখন আর সেজন্য কোনও লজ্জা নেই শ্রীনাথের। জীবনটাকে তো আর পালটানো যাবে না।
চোখ বুজেও সে দুঃস্বপ্নই দেখছিল এখন। চারদিকে শরতের উজ্জ্বল এক সকাল। চোখ বুজেই টের পেল দরজার আলোয় কে যেন এসে দাঁড়িয়ে ছায়া ফেলল।
চোখ চেয়ে অতি কষ্টে মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে শ্রীনাথ বলল, আয়। পুলিস কি চলে গেছে?
সজল ষড়যন্ত্রকারীর মতো বেড়াল-পায়ে ঘরে আসে! মুখ টিপে হেসে বলে, না। ডবল ডিমের ওমলেট খাচ্ছে বসে বসে। তবে খেয়েই চলে যাবে।
এনকোয়ারি হয়ে গেল?
হ্যাঁ।–সবাইকে ধরে ধরে অনেক কথা জিজ্ঞেস করল।
তোকেও করেছে?
হ্যাঁ।–বলে মাথা হেলায় সজল, আমি বলেছি বোমাবাজদের আমি চিনি।
সে কী?—বলে শ্রীনাথ চোখ বড় করে তাকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সকালের এই সাদা আলোটা সইতে পারে না একদম। চোখ কুঁচকে বলে, তুই আবার নাম-টাম বলিসনি তো?
বলেছি।
কার নাম বলেছিস?
রামলাখন আর কাটুমদা।
