কাটুমদা কে?
শীতলাতলার ভটচায মশাইয়ের ছেলে, চেনো না?
সে বোমা মেরেছে?
মারতে পারে। মেজদিকে স্কুলের বাস্তায় রোজ ফলো করে। মেজদি একদিন চটি খুলে তাড়া করেছিল।
খুবই অবসাদ বোধ করে শ্রীনাথ। বলে, না জেনে পুলিসকে কোনও নাম বলা ঠিক নয়। বললি কেন?
এমনিই। পুলিস ধরে নিয়ে গিয়ে পেটালে ভাল হবে।
ধরবে নাকি ওদের? তোর কথায়?
না।–একটু হতাশার গলায় সজল বলে, মা যে সব নষ্ট করে দিল। মা পুলিসকে বলল, ওর কথা ধরবেন না। তোমার কথা মা কী বলেছে জানো?
কী বলেছে?
বলেছে আমার হাজব্যান্ড প্রকৃতিস্থ নন। ওঁকে জেরা করার দরকার নেই। তাই পুলিস তোমার কাছে আসেনি।
একটা নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলল শ্রীনাথ। মনে মনে তৃষাকে ধন্যবাদ দিল।
সজল জিজ্ঞেস করল, বোমার শব্দটা তুমি শোনোনি বাবা?
না।
জায়গাটা দেখেছ? যেখানে বোমাটা মেরেছিল?
না দেখিনি।
গিয়ে একবার দেখে এসো। দারুণ। বারান্দার শানে অনেকখানি চিড় ধরে গেছে। মা’র গায়ে লাগলে একদম উড়িয়ে দিত।
বিরক্ত শ্রীনাথ বলে, তুই হাসছিস কেন? এটা কি মজার ব্যাপার?
সজল যেন ধরা পড়ে গিয়ে একটু কাঁচুমাচু হল। বলল, লাগেনি তো।
লাগেনি, কিন্তু ব্যাপাবটা তা বলে হাসির নয়।
আমার স্কুলের একটা ছেলে পেটো বানাতে পারে! কিছু টাকা দিলে শিখিয়ে দেবে।
খবরদার!–বলে শ্রীনাথ ধমক দেয়।
সজল ফের একটু মিচকি হাসি হেসে বলে, তুমি কেবল শুধু শুধু আমার ওপর রাগ কবছ। ছোটমামা নিজেই পেটো বানায় তা জানো?
স্তম্ভিত শ্রীনাথ বলে তোকে কে বলল?
কে বলবে? সবাই জানে।
তোর মা জানে?
মা-ই তো মশলা কেনার লকা দেয়।
শ্রীনাথ হাঁ করে থাকে। মাথাটা একটু বেশি পাক খায় বলে তাকাতে কষ্ট হয় খুব। বড় করে শ্বাস ফেলছে বারবার। বলল, সরিৎ ওসব বানায় কেন?
কে জানে?–ঠোঁট উলটে সজল বলে।
আবার এক তীব্র আতঙ্কে বিহুল হতবুদ্ধি হয়ে যায় শ্রীনাথ। এ সে কাদের মধ্যে রয়েছে? এ কারা তার আত্মীয়স্বজন? উঠতে গিয়ে টাল খেয়ে বসে পড়ল শ্রীনাথ। আবার চেষ্টা করল। এ বাড়ির চৌহদ্দি ছেড়ে এক্ষুনি তার বেরিয়ে পড়া দরকার। কিন্তু উঠতে গিয়ে এবার আর বসে পড়ল না। চোখ অন্ধকার আর মাথা শূন্য হয়ে দড়াম করে পড়ে গেল মেঝেয়।
সজল চমকে উঠেছিল। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল মেঝেয় পড়ে থাকা তার বাবার দিকে। উপুড় হয়ে মুখের কাছে মুখ নিয়ে ডাকল, বাবা! বাবা!
শ্রীনাথ রক্তবর্ণ দুটো চোখ খুলে বলে, একটু হাওয়া। আমাকে খোলা হাওয়ায় নিয়ে চলো।
কী হয়েছে তোমার?
আমি মরে যাচ্ছি! শিগগির।
সজল ভিতরবাড়িতে দৌড়ে গেল।
একটু বাদেই বাড়ির লোকজন আর ডাক্তার-বদ্যিতে ভরে গেল ঘর।
শ্রীনাথের বহুকাল কোনও অসুখ-বিসুখ করেনি। বিছানায় এক ঘোরের মধ্যে শুয়ে থেকেও সে সবই টের পায়। বিছানায় তৃষা, মঞ্জু আর স্বপ্ন খুব কাছাকাছি বসে আছে। ডাক্তার তার প্রেশার নিচ্ছে। মাথার কাছে একটা টেবিল-ফ্যান থেকে স্নিগ্ধ হাওয়া এসে লাগছে। পাতালে তলিয়ে যেতে যেতে মাঝে মাঝে ভেসে উঠছে শ্রীনাথ। তারপর একটা ছুঁচের মুখ ঢুকে গেল হাতে। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।
ডাক্তার বলে গেল, ভয়ের কিছু নেই। একজহশন, ড্রিংক, ল্যাক অফ এক্সারসাইজ। মাইল্ড স্ট্রোকও বলা যায়। প্রেশারটা ভীষণ লো। এখন থেকে সাবধান হওয়া দরকার।
তৃষা ডাক্তারকে বিদায় দিয়ে ভাবন-ঘরের ইজিচেয়ারে এসে বসে।
শ্রীনাথের তেমন কিছু হয়নি জেনে ছেলেমেয়েরা নেয়েখেয়ে স্কুলে গেল। বাড়ির লোক সংসারের নানা কাজে লেগে পড়ল। সরিৎ গেল ওষুধ আনতে।
একা তৃষা শ্রীনাথের ঘুমন্ত মুখের দিকে জ্বালাভরা চোখে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল, অকৃতজ্ঞ! তোমার না হয়ে যদি আমার এ রকম হত, তবে তুমি আমার জন্য করতে এতটা?
পুরুষমানুষের মতো নিমকহারাম দুটো নেই দুনিয়ায়। তুমি বেশ্যাপাড়ায় গিয়ে মদ খেয়ে যত না নিন্দে কুড়িয়েছ, আমার একটা কলঙ্কের নিন্দে তার চেয়ে ঢের বেশি। বেশ আছ তোমরা কাপুরুষ মেরুদণ্ডহীন! মেয়েমানুষকে মারতে চোরের মতো মাঝরাতে এসে বোমা ছোড়া, তোমরা কেমন জন্তু?
পুরুষমানুষের ওপর আগ্রাসী রাগ খুব বেশিক্ষণ রইল না তুষার। বোমার খবর রটে গেছে। বহু লোক দেখা করতে আসছে। পাড়ার মাতব্বর, প্রাক্তন এক এম এল এ, সমাজকর্মী, কৌতূহলী গিন্নিবান্নিরা। বৃন্দাকে শ্রীনাথের ঘরে রেখে তৃষাকে উঠে যেতে হল।
ফাঁক পেতে পেতে সেই দুপুর। ঘুমন্ত শ্রীনাথকে আধোজাগা করে গরম দুধ খাইয়ে এল তৃষা। নিজে নেয়ে-খেয়ে একটা প্যাডের কাগজে লম্বা চিঠি লিখতে বসল দীপনাথকে।
দীপু, তোমাকে আমার গার্জিয়ান করতে চেয়েছিলাম। তুমি সেই ভয়ে সেই যে পালিয়ে গেলে আর এলে না। না হয় গার্জিয়ান না-ই হলে, তা বলে কি খোঁজ নিতে নেই! আমার কী বিপদ যাচ্ছে জানো না তো।…
অনেক অনেক কথা লিখল তৃষা। সচেতনভাবে যা সে কখনওই লিখতে পারত না। লজ্জা পেত।
চিঠিটা খামে এঁটে মংলাকে ডাকছিল ডাকে দেওয়ার জন্য। বারান্দা থেকেই হঠাৎ চোখে পড়ল, ফটক থেকে আলোছায়াময় আঁকাবাঁকা পথটি ধরে একজোড়া স্বামী-স্ত্রী আসছে। বোধ হয় পড়শিই কেউ হবে। তৃষা ঘরে গিয়ে চশমাটা চোখে দিয়ে বেরিয়ে এল।
বলল, ওমা!
উঠোনে দীপনাথ আর মণিদীপা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মৃদু মৃদু হাসছে।
দীপনাথ বলল, এলাম।
তৃষা নেমে গিয়ে মণিদীপার হাত ধরে বলল, তুমি বাপু আজ একদম সাজোনি!
মণিদীপা বড় বড় চোখে চেয়ে তৃষাকে দেখছিল। খুবই বুদ্ধিমতী। বলল, আমি না হয় সাজিনি। কিন্তু আপনার কী হয়েছে বলুন তো! ইউ লুক সো ক্রেস্টফলেন।
