তৃষা খুব খর দৃষ্টিতে শ্রীনাথের মুখের দিকে চেয়ে বলল, পুলিস পারুক বা না-পারুক ছেলে দুটো ধরা পড়বেই। মরা বা জ্যান্ত।
৪৬. মরা বা জ্যান্ত
মরা বা জ্যান্ত!—বলে শ্রীনাথ খুব অবাক চোখে তৃষার দিকে চায়। একটু তেলা জিভে জিজ্ঞেস করে, ধরতে পারলে তুমি ওদের মেরে ফেলবে নাকি?
না।—তৃষা ঠান্ডা গলায় বলে, জ্যান্ত ধরতে পারলে মারব কেন? যদি জ্যান্ত ধরা না যায় তা হলে দরকার হলে মেরে ফেলব।
তুমি!—বলে বিস্ফারিত চোখে অনেকক্ষণ পলক ফেলে না শ্রীনাথ। তারপর যেন চুপসে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বলে, তুমি সব পারো।
ভুলে যেয়ো না ওরা আমাকেই মেরে ফেলতে চেয়েছিল।
শ্রীনাথ আর-একটা বিড়ি ধরায়। খুব ঘন ঘন বিড়ি খাচ্ছে এখন সে। তৃষার কথাটা শুনে একটু ভেবে বলল, কথাটা শুনতে কিছু অদ্ভুত। তবু বলি, তোমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল বলেই যে ওরা বধের যোগ্য তা কিন্তু নয়।
আমিও তা বলিনি। যদি ধরা পড়ে তা হলে যা করার পুলিস বা আইন আদালত করবে। যদি তারা উপযুক্ত শাস্তি না দেয় বা খালাস দেয় তখন আইন আবার আমরা হাতে নেব। কিন্তু সে অন্য কথা। আমাকে মারতে চেয়েছিল বলেই যে আমি তাদের মারব তা আমি এখনও বলছি না।
শ্রীনাথের গলার স্বর থেকে আত্মবিশ্বাস বিদায় নিয়েছে। কেমন মিনমিনে শশানাচ্ছে তাকে। তেমনি এক ভেজা ভিতু গলায় সে বলে, তুমি আগে আর কাউকে খুন করিয়েছ তৃষা?
তৃষা আজ রাতে নানা কারণেই কিছু বিভ্রান্ত। তবু এখন শ্রীনাথের মুখের দিকে চেয়ে তার একটু করুণা হল। সে মাথা নেড়ে বলল, না। কিন্তু আমার সম্পর্কে তোমার জ্ঞান এত কম কেন?
শ্রীনাথ একটা ঢোক গিলে বলল, জ্ঞান? না, আমার আর জ্ঞানের দরকার নেই। আমি আর কিছু জানতে চাই না।
বলতে বলতে শ্রীনাথের দাঁতে একটু খটখটি হল। সে যে অত্যন্ত ঘাবড়ে গেছে তা বুঝতে তৃষার কোনও কষ্ট হচ্ছে না। এ লোক যে তৃষাকে খুন করানোর জন্য তোক লাগাতে পারে না, তা বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারছে তুষা। কিন্তু সন্দেহের একটা আলপিন তবু ফুটে থাকে তার মনের মধ্যে। সে শান্ত কিন্তু কঠিন এক গলায় বলে, লোককে ঘরের কথা বলে বেড়ানো তোমার স্বভাব। কিন্তু তা বলে লোককে বলতে যেয়ো না যে, আমি বোমাওলাদের মেরে ফেলার তালে আছি। যদি বলল তা হলে তোমার ভাল হবে না।
শ্রীনাথ ভয় পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা বলে তৃষার এই প্রচ্ছন্ন চোখরাঙানোটাও তার সহ্য হয় না। সে আবার বিড়ির আগুন থেকে নতুন বিডি ধরিয়ে নেয়। বলে, আমি বললেই যে লোকে বিশ্বাস করবে এমন নয়। মাতাল বদমাশদের কথা লোকে রেখে-ঢেকে অর্ধেক ধরে, অর্ধেক ফেলে দেয়। আজকাল তাই বলাবলি ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু লোকে যদি আমার কথা বিশ্বাস করত তবে বলতাম।
কথা বলতে বলতে শ্রীনাথের একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। সে উঠে গিয়ে কাঠের আলমারি থেকে একটা ব্র্যান্ডির বোতল বের করে ছিপিতে ঢেলে কয়েকবার খেয়ে নিল। একটা বিদঘুটে সেঁকুর তুলে মুখটা বিকৃত করে আবার ইজিচেয়ারে বসে পড়ল। মুখটা বোকাটে, ঘাবড়ানো এবং সন্ত্রস্ত।
তৃষা বলল, লোকে তোমাকে বিশ্বাস না করলেও কেচ্ছাকে বিশ্বাস করে। তাদের কাছে কে বলেছে সেটা বড় কথা নয়, কী বলছে সেটাই বড় কথা। তাই বলছি বোলো না। তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি।
অসহায় মুখে শ্রীনাথ বলে, খুন-টুন আমি সইতে পারি না।
তুমি পুরুষমানুষ হয়ে যখন পারো না, আমি মেয়েমানুষ হয়ে কি পারি?-তৃষা যেন বাচ্চা ছেলেকে ভোলাচ্ছে এমনভাবে কথাটা বলল। একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু অনেক ঠেকে শিখেছি, আমি বিপদে পড়লে বাঁচানোর মতো কেউ নেই। আমার দুঃখ হলে পাশে এসে কেউ দাঁড়াবে না। তাই বিপদ-আপদ বা দুঃখ-টুঃখকে আমি কাছে আসতে দিই না। তার আগেই নিকেশ করি। মাঝরাতে দুটো ছেলে এসে বাড়িতে ঢুকে বোমা মেরে আমাকে উড়িয়ে দিয়ে যাবে, এতকাল তো এত কষ্টের জীবন শুধু সেজন্য বয়ে বেড়াইনি! কাজেই যারা মারতে এসেছিল তাদের একটু সমঝে দেওয়া ভাল। যদি আর কারও মনে ওরকম ইচ্ছে থেকে থাকে তবে তারাও হুঁশিয়ার হবে।
হয়তো তোমাকে মারতে চায়নি। হয়তো অন্য কাউকে-–
কী করে বুঝলে?
সেদিন স্টেশনের কাছে দুটো ছেলেকে সরিৎ চেন দিয়ে মেরেছিল! তারাও হতে পাবে। হয়তো সরিতের ওপর শোধ নিতে এসেছিল।
সরিৎ আমার ভাই। তাকে মারতে এলেই বা আমি ছাড়ব কেন? সে আমার আশ্রয়ে আছে, তার দায়দায়িত্ব আমার, সেটা ভুললেও তো চলবে না।
শ্রীনাথের আর কিছু বলার থাকে না। সে চুপ করে রইল।
তৃষা জিজ্ঞেস করে, সরিৎ যাদের মেরেছিল তাদের তুমি চেনো?
না। মুখচেনা।
সোমনাথ বহুকাল এদিকে আসছে না। তবু আমাকে সব খবরই নিতে হবে।
সোমনাথ! সোমনাথ এর মধ্যে নেই তৃষা। আমি বলছি।–খানিকটা আতঙ্কের সঙ্গে বলে ওঠে শ্রীনাথ।
নেই কী করে জানলে? সোমনাথ নিজে না থাকলেও তার অনেক সিমপ্যাথাইজার আছে এখানে।
ওকে এখানে কেউ চেনেই না। তা ছাড়া বুলু এখন তার বউকে নিয়ে ব্যস্ত।
তুমি কোনও খবরই রাখো না। ওদের বাচ্চাটা পেটেই নষ্ট হয়ে গেছে সেই কবে! সোমনাথ বাবাকে একটা চিঠিতে লিখেছে, আমিই নাকি কোন তান্ত্রিককে ধরে বাণ মেরে ওই কাণ্ড করিয়েছি।
বুলু লিখেছে?
হ্যাঁ। বাবার তোষকের নীচে চিঠিটা ছিল। তোষক রোদে দিতে গিয়ে চিঠিটা বৃন্দার হাতে পড়ে। সে আমাকে দেয়।
বুলুটা পাগল।
তাই হবে।—বলে তৃষা ওঠে। চারদিকে চেয়ে বলে, তুমি ঘুমোও। রাত আর বেশি নেই।
