শ্রীনাথ বা সজল টের পায় না, কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবন-ঘরের জানালা বা দরজার পাশটিতে ছায়ামূর্তির মতো এসে কিছুক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তৃষা। সজল যে তাকে তেমন পছন্দ করে না তা তৃষা বরাবর জানে। তার জন্য কোনও মাথাব্যথাও নেই তার। কিন্তু ইদানীং শ্রীনাথের ওপর সজলের টান দেখে তার মনে নানা সন্দেহ উঁকি দেয়। শ্রীনাথকে বিশ্বাস নেই। ছেলেকে হাত করে তৃষাকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করছে হয়তো।
করছেই। এতদিন বাইরের লোকের কাছে কুৎসা গেয়ে বেড়িয়েছে। তাতে কাজ হয়নি দেখে এখন নতুন করে কোনও ফন্দি আঁটছে নিশ্চয়ই।
দিন সাতেক বাদে একদিন নিশুত রাতে কুকুরের চিৎকারে ঘুম ভাঙল তৃষার। উঠোনে খুব চেঁচাচ্ছে কুকুরটা। তৃষার ভয়ডর বলে কিছু নেই। মেঝেয় বৃন্দা পড়ে ঘুমোচ্ছে। তাকে ঠেলে তুলে দিয়ে তৃষা টর্চ হাতে দরজা খুলল।
পাল্লা দুটো ভাল করে খোলবার আগেই অন্ধকার উঠোনে একটা নীলচে লাল আগুনের ঝলকানি, আর সেই সঙ্গে বুক কাঁপানো দুড়ুম শব্দ। বাতাসের ধাক্কা আগুনের হলকা আর সেই সঙ্গে বালির মতো গুঁড়ো গুঁড়ো কী যেন এসে সপাটে ধাক্কা মারল তৃষাকে। আচমকা এসব ঘটে যাওয়ায় হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল তৃষা! কিন্তু সেই অবস্থাতেই দু’জোড়া পায়ের দৌড়োনোর শব্দ তার কান এড়াল না।
দরজা খুলে তৃষা টর্চ জ্বেলে দেখে বারান্দার সিঁড়ির কাছে শানের ওপর অনেকখানি জায়গা জুড়ে সাদাটে দাগ। সিমেন্টে চিড় ধরেছে। একটা বোমার খোল পড়ে আছে উঠোনে। বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী।
শব্দে মারমার করে বাড়ির লোকজন উঠে এল। সরিৎ, ছেলেমেয়ে, চাকর-বাকর। বোমার শব্দে ইস্পাত কেঁউ কেউ করে পালিয়ে গিয়েছিল। লোকজন দেখে সেও এল আবার ঘেউ ঘেউ করতে করতে।
সরিৎ নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে বন্দুকটা নিয়ে এল। বলল, কোনদিকে গেল বলো তত মেজদি!
তৃষা টর্চ জ্বেলে সদর ফটকের দিকটায় আলো ফেলে বলল, তাড়া করে লাভ নেই।
তাদের দেখেছ?
না। তবে দু’জন ছিল। পায়ের শব্দ পেয়েছি।
কারা হতে পারে?
কী করে বলব? মংলার হাতে চিঠি দিয়ে একবার থানায় পাঠা।
খোকনকে সজাগ থাকতে বলে হঠিয়ে দিল তৃষা। তারপর টর্চ হাতে নিঃশব্দে চলল ভাবন-ঘরের দিকে।
গ্রীষ্মকাল বলে কয়েকটা জানালা খুলে রেখে শোয় শ্রীনাথ। আজও শুয়েছে। আগে অন্ধকার ঘরে শ্রীনাথের ঘুমন্ত শরীরটা তীক্ষ্ণ চোখে দেখে। ঘুমোচ্ছে! বোমার আওয়াজটা এতদূর এসে পৌঁছোয়নি নাকি?
সন্দেহ। তৃষা টর্চ জ্বেলে নাইলনের মশারির ভিতরে শ্রীনাথের ঘুমন্ত মুখটাকে বুঝবার চেষ্টা করে। ঘুমোচ্ছে তো? না কি মটকা মেরে পড়ে আছে। টর্চের আলোটা খানিকক্ষণ মুখের ওপর নাড়াচাড়া করেও দেখল, শ্রীনাথ জাগে কি না। জাগল না।
তৃষা ডাকল, শুনছ! ওঠো তো! বাড়িতে কারা এইমাত্র বোমা মেরে গেল।
অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর শ্রীনাথ উঠল।
কী হয়েছে?
দরজা খোলো, বলছি।
বিরক্ত শ্রীনাথ উঠে দরজা খোলে, এত রাতে! ডাকাত পড়েছে নাকি?
এখনও পড়েনি। তবে যে-কোনওদিন পড়বে।
কী হয়েছে তা হলে?
দুটো লোক এসে আমার শোওয়ার ঘরে বোমা মেরে গেল একটু আগে। শব্দ পাওনি?
বোমা!—বলে হাঁ করে চেয়ে থাকে শ্রীনাথ। বোমা মারে বটে লোকে, কিন্তু তৃষার শোওয়ার ঘরে বোমা মারার কী আছে তা সে ঘুমন্ত মাথায় সঠিক বুঝতে পারে না।
কারা জানো?–তৃষা জিজ্ঞেস কবে।
আমি কী করে জানব? বোমা কারও গায়ে লেগেছে?
না। মনে হচ্ছে আমাকেই মারতে এসেছিল। কিন্তু তাড়াহুড়োয় ঠিক মতো ছুড়তে পারেনি। বারান্দায় পড়ে ফেটে গেছে।
সর্বনাশ! —বলে সত্যিকারের সাদা হয়ে যায় শ্রীনাথ। তার মাথাটা ঘুম ছাড়িয়ে সম্পূর্ণ জেগে ওঠে। কাল রাতে একটু বেশি টেনে ফেলেছিল সে। জেগে শরীরের একটা প্রবল কষ্ট টের পায়! বলে, তোমাকে মারতে এসেছিল।
খুব তীক্ষ্ণ চোখে শ্রীনাথকে লক্ষ করে তৃষা। হয়তো অভিনয়। সে ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারে না। বলে, আমাকে ছাড়া আর কাকে? আমার তো শত্রুর অভাব নেই। কিন্তু এতটা আগে কখনও হয়নি। তুমি কিছু জানো না?
আমি জানব! আমি কী জানব?
তুমি তো রামলাখনের আড্ডায় যাও, বটতলায় মিটিং করো, ওসব জায়গায় যাৰা যায় তারাই হয়তো এই কাণ্ডটার পিছনে আছে।
তৃষা কী বলতে চাইছে তা সঠিক ধরতে পারল না শ্রীনাথ। তাই রেগেও গেল না। তোম্বা ঘাবড়ে যাওয়া মুখে মাথা নেড়ে বলল, না, আমি কিছু শুনিনি। কেউ তোমাকে মারতে চায় বলে জানি না।
এখন তো জানলে!
জানলাম। কিন্তু কী করা উচিত বুঝতে পারছি না।
তৃষা সামান্য হেসে বলল, তোমাকে কিছুই করতে হবে না। কোনওদিন কিছু কি করেছ আমাদের জন্য? আজও তোমাকে ছাড়াই চলবে।
শ্রীনাথ এ কথাটাও গায়ে মাখল না। চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ, তারপর একটা বিড়ি ধরাল। চোখেমুখে ভীষণ উদ্বেগ আর ভয় ফুটে রয়েছে তার।
তৃষা উঠে বাইরে গিয়ে চারদিকে টর্চটা ঘুরিয়ে দেখল। নিতাই একটা মশাল জ্বেলে জঙ্গলে-জঙ্গলে খুঁজছে। আরও কয়েকটা টর্চ জ্বলে উঠছে এখানে-সেখানে।
তৃষা উঁচু গলায় ডাকল, সরিৎ!
কী বলছ?—ফটকের ধার থেকে জবাব এল।
ছেলেমেয়েগুলোকে শুয়ে পড়তে বল। বৃন্দাকে বলিস ওদের ঘরে শুতে। নইলে ভয় পাবে।
যাচ্ছি।
বন্দুকটা রেখে আয়।–বলে তৃষা আবার ভাবন-ঘরে ঢুকে শ্রীনাথের মুখোমুখি হয়।
শ্রীনাথ আর-একটা বিড়ি ধরিয়ে বলে, পুলিসে যাওয়া উচিত।
লোক গেছে। ছেলে দুটো কাল-পরশুই ধরা পড়বে।
পড়লেই ভাল। কিন্তু আজকাল পুলিস অত রেসপনসিবল নয়।
