বাঁশবনের পিছনে সামন্তর ভিটেয় পা দিয়ে নিতাইয়ের চোখে জল এল। এমন গরিবও আছে! ঘর বলতে শুধু কয়েকটা মাটির দেয়াল খাড়া রয়েছে। চালে টিন বা খড় নেই, সে জায়গায় পুরনো চট, বাসি ক্যালেন্ডারের কাগজ, ক্যানেস্তারা এইসব দিয়ে জোড়াপট্টি লাগানো। বিছানা নেই, বাসন নেই, কাপড়চোপড় নেই। কীভাবে যে আছে! সামন্তর বউয়ের ট্যানাটা বোধহয় গায়ে গায়ে ভিজে গায়ে গায়েই শুকোয় রোজ। তাই চামসে তাঁশটে পেট-গোলানো গন্ধ ছাড়ছে গা থেকে। বড় মেয়েটা যুবতীই হবে। বুকে ন্যাকড়ার ঢাকনা, কোমর থেকে আর একটা আব্রু ঝুলছে। শরীরটা ঢ্যাঙা, কঙ্কালসার। বাকি কুঁচো কাচাগুলো উদোম ন্যাংটো।
সামন্তর বেধবা কান্নাকাটি করল না। বলল, এখনও ভিক্ষে শুরু করিনি বাবা। চাটুজ্জে-মাকে বলে ঘরের একটা কাজ দাও তো বাঁচি।
শোল মাছটা বেধবার হাতে দিয়ে নিতাই বলল, এটা সেদ্ধ করে আজ চালিয়ে দাও। আমি গিয়ে বউদিমণিকে বলবখন। হয়ে যাবে হিল্লে। বড় মেয়ে কতয় পড়ল?
বিয়ের যুগ্যি। নেবে?
ভেবে দেখি।
ভাবাভাবির অবশ্য কিছু নেই। এই বয়সে হাড়হাভাতে ছাড়া আর কে মেয়ে দেবে? তবু দর বাড়াতে একটু সময় নিয়ে রাখল। প্রথম দিন তো! বিয়ের কথা পাড়লেই হয়তো মেয়ের গায়ে এক কুড়ি কি দুকুড়ি দামের লেবেল বসে যাবে। দিনকাল ভাল না।
তৃষা বউদিকে পরদিন সব বলল নিতাই। বউদি শুনেটুনে বলল, চোর নয় তো?
না, সামন্ত লোক ভাল ছিল। কুষ্ঠরোগী ছিল বলে পরিবারটা কোথাও ঘরের কাজ পায় না।
তৃষা বউদি খুব চোখা নজরে নিতাইকে দেখে নিয়ে বলল, বড় মেয়ে-টেয়ে আছে?
নিতাই লজ্জায় মুখ নামিয়ে বলল, আছে একটা।
বউদিমণি আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি বটে, কিন্তু ওইটুকুতেই বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার চোখকে ফঁকি দেওয়া নিতাইয়ের বাপেরও সাধ্যি নয়।
সামন্তর বউ অবশ্য ধানকলে কাজ পেল। আগুরি শতখানেক টাকাও বউদি দিয়ে দিল ঘর মেরামতির জন্য। সামন্তর ঘরামি বন্ধুরা মজুরি না নিয়ে ছেয়ে দিল ঘর। এখন খেয়ে-পরে আছে। সামন্তর বড় মেয়ের শাড়ি জুটেছে, শরীরটাও ফিরছে আস্তে আস্তে। বিকেলের দিকটায় প্রায়ই গিয়ে ওদের উঠোনে থানা গাড়ে নিতাই।
মুশকিল হল, বিয়ে করে বউ তুলবে কোথায়! সে ভালমতোই জানে, এ বাড়িতে বউ নিয়ে নিতাইকে বাস করতে দেবে না বউদি। তার ওপর খোরাকির কথাও ফেলনা নয়। একা পেট চলে যায়, কিন্তু বউ হলে তার অনেক বায়নাক্কা। তাই খুব হিসেব নিকেশ করছে নিতাই। বিয়ের জন্য প্রাণটাও আঁকুপাঁকু করে। পুতুলরানি গিয়ে অবধি জীবনটা শুকিয়ে পাটকাঠি হয়ে গেছে।
নিতাই যাওয়ার পর অনেকক্ষণ বালির বস্তায় ঘুসি চালাল সজল। মুঠির চামড়া লাল, কবজি ছিড়ে পড়ছে ব্যথায়, সারা গায়ে জবজবে ঘাম।
দিন চারেকের মধ্যে গোয়ালঘরে দুটো বাচ্চা সমেত আরও দুটো গোখরো মারল সজল। দেখেশুনে নিতাই বলল, বাস্তুসাপ। মারলে তো, এখন দেখো কী না কী হয়! দোষের কাজ হয়ে গেল, একটা পুজো লাগালে হয়।
সজল বলল, ধ্যাত!
কিন্তু ব্যাপারটা ভাল লাগল না নিতাইয়ের। বাস্তুসাপ বলে কথা। সে গিয়ে বউদিমণিকে গোপনে জানাল, পুরনো গোয়ালঘরে তিনটে বাস্তুসাপ মেরে দিয়েছে সজলখোকা। কাজটা ভাল হয়নি। একটা পুজোটুজো লাগালে ভাল হয়।
তৃষা চোখ বড় করে বলে, সজল মেরেছে?
আজ্ঞে। বারণ শোনে না।
একটু ভাবল তুষা। সজল সাপ মেরেছে! ঘটনাটার মধ্যে একটু সাবালকত্বের আভাস আছে না?
সজলকে নিয়ে বরাবরই একটা ভাবনা ছিল তৃষার। সেটা আর-একটু বাড়ল। তা বলে ছেলেকে কিছু বলল না সে। গোপনে গিয়ে একদিন গোয়ালঘরে ঝুলন্ত বালির বস্তাটা দেখে এল। ফাঁসির মড়ার মতো ঝুলে আছে। অনেকক্ষণ ব্যাপারটা গুনগুন করল তার মনের মধ্যে।
সকালে বিকেলে দুইজন প্রাইভেট টিউটর সজলকে পড়ান। তবু আজকাল সজল প্রায়ই রাতের দিকে শ্রীনাথের কাছে পড়া বুঝতে আসে।
ব্যাপারটা যে শ্রীনাথের খুব ভাল লাগে তা নয়। কিন্তু সে খুব একটা বারণও করে না। শুধু যেদিন নেশাটা বেশি হয় সেদিন ফিরিয়ে দেয় ছেলেকে। কিংবা ফেরাতেও হয় না, দরজার বাইরে থেকেই বাবার অবস্থাটা দেখে সজল নিজেই ফিরে যায়।
যেদিন শ্রীনাথ ভাল থাকে, তেমন নেশা করে না, সেদিনই বই খাতা নিয়ে এসে সজল বসে যায়।
শ্রীনাথ যে খুব ভাল পড়াতে পারে তা নয়। চর্চা না থাকায় কত কী ভুলে গেছে। ভগ্নাংশ বা দশমিকের অঙ্কই পারে না। ভুগোলে কোন দেশের কী রাজধানী তা মনেই পড়ে না। ইতিহাস যেন আবছা এক নদীর মতো লাগে, হুমায়ুন আকবরের বাবা? না আকবর হুমায়ুনের?
অবশ্য এসবেও কিছু যায় আসে না। কিছুক্ষণ পড়া-পড়া খেলা সেরে নিয়ে সজল গল্প বলার জন্য শ্রীনাথকে নানারকম উসকানি দিতে থাকে। তাতে কাজও হয়।
সারাদিন কারও সঙ্গেই তো কথা বলার নেই শ্রীনাথের। শ্রোতা পেয়ে সে মনের আগল খুলে দেয়। বানানো গল্প নয়, ভূত প্রেত দত্যি দানোব গল্প নয়, শ্রীনাথ স্মৃতির ভাণ্ডার উজাড় করে দিতে থাকে সজলের কাছে। সজল হাঁ করে শোনে।
রাত বাড়ে। চারদিক নিঃঝুম হয়ে যায়। এক-একদিন ভিতরবাড়ি থেকে বৃন্দা বা অন্য কেউ এসে ডেকে নিয়ে যায় সজলকে। কোনওদিন সজলকে নিজেই ফেরত পাঠায় শ্রীনাথ।
একদিন শ্রীনাথ জিজ্ঞেস করল, রোজ আমার কাছে আসিস কেন রে?
সজল লাজুক মুখে বলে, তুমি খুব ভাল পড়াও যে!
শ্রীনাথ ছেলের দুষ্টুমি ধরতে পেরে বলে, আমি আর কী পড়াব? তুই তো আসিস গল্প শুনতে।
বড় মায়া হল শ্রীনাথের। ছেলেটা তো জানেও না যে, সে ওর বাবা নয়। কিন্তু তাতে তো ওর কোনও দোষ নেই। শ্রীনাথ ওর কাছে কোনওদিন ভুলটা ভাঙবে না। সজলকে তার ভালই লাগে। হয়তো ছেলের মতোই ভালও বাসছে আজকাল।
