সজল কাউকে কিছু না বলে এক ছুটির দিনে সকালে পুরনো গোয়ালঘরটায় গিয়ে ঢুকল। সঙ্গে বেজি, হাতে লাঠি।
মাটির ভিটিতে এর মধ্যেই হরেকরকম গর্ত তৈরি হয়েছে, জঞ্জাল জমেছে। বাইরে থেকে লতানে গাছ এসে উকিঝুকি মারছে জানলা-দরজা দিয়ে। বিশ্রী একটা ভ্যাপসা গন্ধ আর পোকামাকড়ের ঘিনঘিনে আওয়াজ। সজল সিলিং-এর কাঠের বিমগুলো দেখছিল। বেশ মজবুত।
বেজিটা তড়াক করে একটা লাফ দেওয়ায় সজল চকিতে চোখ নামায়। একটা গর্তের মুখে সরু একটা মুখ উঁকি দিয়েই ড়ুব দিল। সাপ। সজল জানে, এ ঘরে সাপ থাকবেই। বেজিটা এখনও বাচ্চা, বোধহয় সাপের সঙ্গে লড়তে শেখেনি। সজল তাই উদ্যত বেজিটাকে হাতে তুলে নিয়ে ঘরের বাইরে ছেড়ে দরজা বন্ধ করে দিল ভিতর থেকে। তার লাঠির ডগায় একটা লোহার ফলা পরানো আছে। নিঃশব্দে সে গর্তটার কাছে গিয়ে উঁকি দিল ভিতরে। অন্ধকারে তেমন কিছু দেখা যায় না, সে ভুসভুসে মাটির মধ্যে ফলাটা চালিয়ে গর্তের মুখটা বড় করতে থাকে।
গর্তটা তেমন গভীর ছিল না। মুখটা বড় হতেই সে ভিতরে চিকরিমিকিরি দেখতে পেল। গোখরো। মাথা তুলছে না ভয়ে। ওরাও তো মরণ টের পায়।
সজল দাঁড়িয়ে একটু ঝুঁকে খুব সাবধানে গর্তের মধ্যে ফলাটা চালিয়ে দিল বার কয়েক। ভিতরে তর্জন-গর্জন চলল কিছুক্ষণ। তারপর নিথরতা। সাপটাকে গর্ত থেকে তুলল না সজল। ওপর থেকে মাটি চাপা দিয়ে বন্ধ করে দিল।
নিজেই একটা ঝাঁটা এনে ঘরটা যতদূর সম্ভব সাফ করল। একটা মস্ত বস্তায় বালি ভরে তৈরি রেখেছিল সে। খ্যাপা নিতাই আর সে ধরাধরি করে এনে সেটাকে সিলিং-এ দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দিল।
কাজ শেষ হলে নিতাই কপালের ঘাম মুছে বলে, কাণ্ড বাপু তোমার। গায়ের জোর করে হবেটা কি শুনি? জোর হল মন্তরের। এই দেখো না, আমার যে বোগা জিবজিবে শবীর, তবু সাতখানা গাঁয়ের লোক আমায় দেখলে পথ ছেড়ে দেয়। মন্তরের জোর বাড়াও, সব বশ হয়ে যাবে।
সজল ঝুলন্ত বস্তাটায় ঘুরে ঘুরে ঘুসি মারছিল। কর্কশ বস্তা আর বালিতে আঙুলের চামড়ার নুনছাল উঠে গেল। জ্বালা করছে। সে ধমক দিল, কেটে পড়ো তো নিতাইদা! আর, খবরদার মাকে বাতে যেয়ো না।
সজলখোকা, এই তো সেদিনও এটুকু ছিলে।
বলে একটু অবাক হয়ে নিতাই সজলকে আজ ভাল করে দেখে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, হবে না! কার ছেলে দেখতে হবে তো!
কথাটার মানে সজল জানে। একসময়ে সে নিজেকে জেঠামণির ছেলে বলে ভাবতে ভালবাসত। অজিকাল বাসে না! তার বাবা শ্রীনাথ যেমনই হোক, সে আজকাল বাবার পক্ষে। তাই বস্তা ছেড়ে কোমরে হাত দিয়ে সে রক্তচোখে তাকাল নিতাইয়ের দিকে।
নিতাই চোখ দেখেই ধরে ফেলে, মার আসছে। সজলখোকা ছোট বয়সে তাকে বড় কম মারেনি। কিন্তু সে ছিল ছোট হাতের মিঠে মার। কিন্তু ইদানীং সে বাচ্চাটা বেশ বুনো আর শক্তপোক্ত হয়ে উঠেছে। এখন এর হাতের মার খেলে হাড়ে গিয়ে লাগবে।
নিতাই চট করে সুর পালটে বলল, শ্রীনাথবাবুর কথাই বলছিলাম খোকাবাবু। তোমার বাবা। ভারী তেজি লোক। তুমি তারই ছেলে তো।
বেরোও তো এখন।
এই যাচ্ছি।-বলে নিতাই চোখের পলকে সবে পড়ে। দুনিয়াটা কেমনধারা হয়ে যাচ্ছে। কাউকে বিশ্বাস নেই। সেদিনকার খোকাটা কেমন মাতবরের মতো চোখ রাঙায়। ছোট কলকে দিয়ে যে সরিৎবাবুকে একসময়ে বশে রেখেছিল সেও এখন মোড়লমশাই। শুধু নিতাই বদলাল না, যে নিতাই সেই নিতাই-ই রয়ে গেল।
অবশ্য নিতাই আর বেশিদিন পুরনো নিতাই থাকবে না। ক’দিন আগে হিজলির শিষ্যবাড়ি থেকে একটা শোল মাছের বাচ্চা আর কিছু ডালের বড়ি গামছায় বেঁধে ফিরছিল নিতাই। হিজলির জেলেরা বোকাসোকা লোক। দুঘর তার কাছে মন্ত্র নিয়েছে হালে। এই এখন শিষ্যবাড়ি থেকে কিছু আদায় উশুল করতে পেবে মনে ভারী ফুর্তি ছিল। গুনগুন করছিল আপনমনে। পশ্চিমের জলার ধারের নির্জন রাস্তায় সাঁঝটি হল যেই অমনি নিতাই তারস্বরে কালী নাম করতে লাগল। কিন্তু তবু মেছে। পেতনিটা এলোচুল ফুঁপিয়ে জলা থেকে উঠে এসে পথ আটকে দাঁড়াল।
নিতাইয়ের হয়ে গিয়েছিল সেদিনই। ধাত ছাড়ে আর কী! হঠাৎ মনে পড়ল, এ জলার ধারেই বাঁশবনের আড়ালে কুঠে সামন্ত থাকত না! ব্যাটা মরেছে। চারটি ছেলেপুলে নিয়ে তার বউ এখন বিধবা। তা সেই বিধবাটাই নয় তো!
আন্দাজটা লেগেছিল ঠিকই। চোখ খুলে দেখল, সামন্তর সেই বিধবাই বটে। কালো হাকুচ, রোগা, বড় দাত, চোখ কোটরে। একেবারে মরি-মরি ছিরি।
তবু সেই বুঝকো সাঁঝে জলা থেকে আঁশটে গন্ধের একটা কু-বাতাস এসে বাঁশবানে মড়মড় শব্দ যখন তুলল, আর যখন রাঙা-ভাঙা একটা চাদও উঁকি দিল দিগন্তে, তখন আর বুক বশ মানল না। ভারী একটা কষ্ট ঘুলিয়ে উঠল বুকের মধ্যে। সামন্তর বেধবা বউটা! আহা!
কী খবর গো!
সামন্তর বিধবা স্ত্রী নিতাইকে বিলক্ষণ চেনে। রতনপুরের নামকরা চাটুজ্জেবাড়ির পোষা তান্ত্রিক। তাই সে জড়োসড়ো হয়ে বলল, কোনও গতিকে আছি বাবা।
তার আঁচলে বাঁধা কিছু গেঁড়িগুগলিই হবে। সামন্ত একসময়ে চমৎকার ঘরামির কাজ করত। কুষ্ঠ হয়ে বসে যায়। সেই থেকে অবস্থা পড়তির দিকে। সংসারটার কী অবস্থা তা আন্দাজ করতে অসুবিধে নেই। এদের মন্তর দেওয়া বৃথা। কিছুই আদায় উশুল হবে না। তবু নিতাইয়ের সেদিন ভারী কষ্টই হচ্ছিল। গরিবের জন্য গরিব না ভাবলে চলে?
সে বলেই ফেলল, চলো তোমার ঘরটা দেখে যাই। সামন্ত আমার বন্ধুলোক ছিল।
ঘর!–বলে বউটা হাঁ করে রইল, ঘর বলতে কি আর কিছু আছে বাবা! কোনওরকমে থাকা। যাবে তো এসো।
