গোরু নয়। খাসি।
গোরু কি না তা জিজ্ঞেস করিনি।
মণিদীপা মৃদু শ্লেষের হাসি হেসে বলে, আমার প্রেজুডিস নেই, কিন্তু আপনার তো থাকতে পারে।
দীপনাথের তেমন খিদে ছিল না। শ্লথভাবে গ্রাসটা মুখে নাড়াচাড়া করতে করতে বলে, আমার আছে। এ দেশের গোরুর মাংস খুব হাইজিনিক না হওয়ারই কথা।
এ দেশের কিছুই হাইজিনিক নয়। কিন্তু তাতে কী? গরিবরা তো বেঁচে আছে।
আপনি দেশের সব গরিবকে নিয়ে ভাবেন, শুধু একজন গরিব ছাড়া।
সে কে? আপনি?
মাথা নেড়ে দীপনাথ বলে, না। বোস সাহেব।
বোস সাহেব গরিব নাকি?
দীপনাথ আবার মাথা নেড়ে বলে, অ্যাপারেন্টলি নয়। কিন্তু আজ ওঁর ব্যাংকে ফোন করে যা জানলাম তাতে মনে হয় বোস সাহেব মানিটারিলি খুব ভাল অবস্থায় নেই।
উদাসভাবে মণিদীপা বলে, তার আমি কী করব?
কিছুই নয়। শুধু একজন গরিবের কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম।
মণিদীপাও তার খাবার নাড়াচাড়া করছিল মাত্র। ওইভাবে আরও কিছুক্ষণ বসে থেকে হঠাৎ রুমালে হাত মুছে উঠে পড়ল।
চলুন।
আবার কোথায়?
আঃ, অত প্রশ্ন করেন কেন?
মণিদীপার ভিতরকার ছটফটানি খুব স্পষ্ট টের পাচ্ছিল দীপনাথ। কিসের কামড় তা বুঝতে পারছিল না অবশ্য।
মণিদীপা আবার গাড়ি ছাড়ল। এবার নাক বরাবর সোজা এসে থামল নিজের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে। দীপনাথ নিশ্চিন্তির শ্বাস ছাড়ল।
মণিদীপা ঘরে ঢুকে ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেলে ডাইনিং হলে গিয়ে ঢুকল। দীপনাথ বসে রইল বাইরের ঘরের সোফায়। শুনতে পেল মণিদীপা দিল্লিতে ট্রাংক কল বুক করছে পাশের ঘরে।
তারপর খানিকক্ষণ নিস্তব্ধতা। তার মধ্যেই রাঁধুনি কফি দিয়ে গেছে, দীপনাথ একটা পুরনো ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকের সিকি ভাগ ছবি মুগ্ধ চোখে দেখে ফেলেছে, ‘
এ সময়ে ঘরোয়া ছাপা শাড়ি পরে মণিদীপা এসে সামনে বসল। বলল, আপনাকে একটু বসতে হবে। আমি দিল্লিতে বোস সাহেবকে কনট্যাক্ট করছি। অন্তত ততক্ষণ।
হঠাৎ গরিবকে মনে পড়ল যে!
আই ওয়ান্ট টু টিচ হিম এ লেসন।
ও বাবা! টেলিফোনেও ঝগড়া করবেন নাকি?
আমরা ঝগড়া-টগড়া করি না। নো শাউটিং বাট উই হ্যাভ আওয়ার ওয়ে অফ কমিউনিকেশন।
দীপনাথ মৃদু হাসে। মণিদীপা ভারী ছেলেমানুষ।
দিল্লির লাইন পেতে খুব একটা দেরি হয় না। টেলিফোন বেজে উঠতেই ছুটে যায় মণিদীপা। দীপনাথও নিঃশব্দে উঠে গিয়ে মণিদীপার পাশে দাঁড়াল।
মণিদীপা বোস সাহেবকে ফোনে ধরতে পেরেছে। একতরফা মণিদীপারই কথা শুনতে পাচ্ছিল দীপনাথ; শোনো, আমি মণি বলছি। আই অ্যাম সরি, ব্যাংকে টাকাগুলো সব তুলতে হয়েছে। আমার হাতে আর একদম টাকা নেই। …না, হারায়নি। তুমি এলে সব বলব। …আঃ, শোনো না! দেয়ার ইজ। এ সিরিয়াস ম্যাটার। আমি তোমার অফিস থেকে টাকা অ্যাডভান্স চেয়েছিলাম।… কী বললে? … হ্যাঁ, মিস্টার চ্যাটার্জির কাছেই। …আঁ? টাকাটা চাইতেই উনি দিয়ে দিলেন। কিন্তু বুঝতে পারছি না হাউ ইজ ইট পসিবল। … বলল। …বলছি তো সিরিয়াস ট্রাবলে না পড়লে অফিসে জানাতাম না। তুমি এলে সব বলব। ফোনে কি বলা যায!… ইজ ইট অলরাইট দেন?… ওঁকে আমি বাসায় ধরে এনেছি।
কিছু বলবে?… আচ্ছা, ছাড়ছি।
দীপনাথ নিঃশব্দে সরে এসে সোফায় বসে।
মণিদীপা যখন পরদা সরিয়ে বাইরের ঘরে এল তখন তার ভ্রু কোঁচকানো। মুখ গম্ভীর।
দীপনাথ মৃদু স্বরে বলে, কথা বললেন?
ইউ আর এ লায়ার।
কেন?
ও টাকা বোস সাহেবের নয়।
তাতে কী? টাকার গায়ে তো নাম লেখা থাকে না।
কিন্তু আপনিই না একটু আগে বলছিলেন, আমি অন্যের টাকা ছুঁতে ঘেন্না পাই!
দীপনাথ আন্তরিক দুঃখের গলায় বলে, আপনাকে শান্ত করার জন্য বলেছি। ওটা নিয়ে ভাববেন। স্টিল নাউ আই ও ইউ ফিফটি পয়সা।
বলতে বলতে দীপনাথ তার মানিব্যাগ বের করে একটা আধুলি সেন্টার টেবিলে রাখল। বলল, কুইটস।
নো কুইটস। আপনি আমাদের কাছে হাজার টাকা পান।
বলতে বলতে মণিদীপা তার এলো চুলগুলো একটা গার্ডারে আটকে সামনে বসল।
দীপনাথ মৃদু স্বরে বলল, এ সব প্রসঙ্গ থাক।
মণিদীপা মৃদু হেসে বলে, উড ইউ বিলিভ? আমি কিন্তু সত্যিই অন্যের টাকা ছুঁতে ঘেন্না পাই। আমি বোস সাহেব ছাড়া ম্যারেড লাইফে অন্য কারও টাকা নেওয়ার কথা ভাবতেই পারিনি। আপনার টাকাটা তাই ফেরত দিতাম। কিন্তু বোস সাহেব অ্যাপ্রুভ করেছে বলে নিচ্ছি।
দীপনাথের বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ ঠেলাঠেলি করতে থাকে। এতদিনে! অবশেষে। “হুররে” বলে তার চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে। সেই সঙ্গে একটা বিরহের জ্বালাও খামচে ধরে বুক। হরষে বিষাদ কথাটা বহুবার পেয়েছে। আজই প্রথম হরষে বিষাদ কাকে বলে তা বুঝল।
পরিপূর্ণ চোখে মণিদীপার দিকে চেয়ে দীপনাথ বলে, আজ তা হলে চলি মণিদীপা।
মণিদীপা একটু অবাক হয়ে বলে, তা হলে বোল ফুটল?
ফুটল। আজ জেনে গেলাম আপনি সুখী হবেন। আপনি মানে আপনারা।
মণিদীপা উঠে পিছনে আসতে আসতে বলে, একজিটটা একটু ড্রামাটিক হয়ে যাচ্ছে না কি?
হোক, হোক। জীবনে একটু নাটক থাকা ভাল।
ইয়ারকি হচ্ছে? বসুন, এখানে ডিনার খেয়ে যাবেন।
ডিনার খাওয়ালেন যে দোকানে! মনে নেই?
সে কি খাওয়া বলে?
তা হোক। আজ আর-একটা ভোজে দিল খুশ হয়ে আছে। অন্য ভোজের দরকার নেই।
৪৫. পুরনো গোয়ালঘরটা ফাঁকা পড়ে থাকে
পুরনো গোয়ালঘরটা ফাঁকা পড়ে থাকে। তৃষা ইদানীং কয়েকটা খুব ভাল জাতের গোরু কিনেছে। পাকা লম্বা ব্যারাক বাড়ির মতো নতুন গোয়ালঘর তুলেছে। সূক্ষ্ম জালের পাল্লা বসিয়ে জানলা-দরজা দিয়ে মশা ঢোকার পথ বন্ধ করা হয়েছে। গোরু দেখাশোনা করার জন্য আরও দুটো লোক এসেছে।
