অপেক্ষাই যদি করলেন তা হলে তো ওপরেই বসে থাকতে পারতেন।
পারতাম। কিন্তু অত কথায় কাজ কী?
দীপনাথ ঢোক গিলে সামনের সিটে মণিদীপার পাশে উঠে বসল।
গাড়ি ছেড়ে মণিদীপা দাঁতে দাঁত পিষে বলে, আমি অবলা? না আপনি অবলা?
আমিই বোধ হয়। যাক সে কথা। কী বলছিলেন?
মণিদীপা মোটেই দীপনাথের আস্তানার দিকে গাড়ি ঘোরাল না। সোজা এসপ্ল্যানেডের দিকে যেতে যেতে বলল, আই ওয়ান্ট টু নো অ্যাবাউট দি মানি।
দীপনাথ ভিতরে ভিতরে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। মৃদু স্বরে বলে, কিছু গোলমাল নেই মিসেস বোস। পরিষ্কার হোয়াইট মানি।
সে কথা নয়। টাকাটা কার?
তার মানে?
টাকাটা নিয়ে চলে আসতে আসতে আমি ভাবছিলাম মিস্টার বোসের অ্যাবসেন্সে তার অফিসের অ্যাকাউন্ট থেকে আর-কেউ টাকা তুলতে পারে কি না। ভেবে মনে হল, তা সম্ভব নয়। আমি অবশ্য আইনকানুন জানি না, তবু মনে হল। তাই ভাবলুম, এ টাকাটা কার? আপনার নয় তো!
আরে না। বোস সাহেবেরই টাকা। অফিসের আইন যেমন আছে তেমনি ফাঁকও আছে।
এ ক্ষেত্রে আমার অন্য রকম সন্দেহ হচ্ছে। ইউ আর জাস্ট হ্যাভিং পিটি অন মি।
মোটেই নয় মিসেস বোস।
আবার মিসেস বোস?
জিবে এসে যায়, কী করব?
ইউ আর এ স্লেভ।–মৃদু প্রশ্রয়ের হাসি হেসে মণিদীপা বলে।
তা-ই তো। একটু আগেই জানতে পারলাম যে আমি ব্যক্তিত্বহীনও।
আর আমিও জানতে পারলাম যে, আমি আপনার কাউন্টার-ইগো।
তাতে রাগ করেছেন?
না তো! বরং শুনে আমার পরম আহ্লাদ হয়েছে। আর বলব না।
মণিদীপা একবার ঘুরে তাকাল। চোখ হাসছে, মুখ হাসছে। সত্যিকারের আনন্দ দেখলেই বোঝা যায়। বলল, টাকাটা আপনার! আই অ্যাম সিয়োর।
সন্দেহ থাকলে কাল আমাদের অ্যাকাউন্ট্যান্টকে ফোনে জিজ্ঞেস করে দেখবেন।
তাতে লাভ নেই। আমি ফোন করার আগে আপনি অ্যাকাউন্ট্যান্টকে শিখিয়ে পড়িয়ে রাখবেন।
আপনি সন্দেহবাতিকগ্রস্ত।
সন্দেহের পিছনে কারণ আছে।
বোস সাহেবেরই টাকা। আমি তো জানি, আপনি স্বামীর অর্জিত টাকা ছাড়া অন্য টাকা ছোঁবেন। ইউ আর এ লয়াল ওয়াইফ।
এটা আবার কোন দেশি ইয়ারকি?
ইয়ারকি নয়।
ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট ধরে মণিদীপা গাড়িখানা আস্তে চালিয়ে ময়দানে এসে পড়ে। তারপর হুঁ হু করে চালাতে থাকে। কিছুক্ষণ কথা বলে না মণিদীপ। দীপনাথও চুপ করে থাকে। যদিও সে জানে, মণিদীপা তাকে কোথাও পোঁছে দিচ্ছে না। শুধু নিয়ে যাচ্ছে। কোথায়, তা হয়তো মণিদীপাও জানে না।
খুব মৃদু স্বরে, প্রায় নিজেকে শুনিয়ে দীপনাথ বলে, আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে…।
মৃদু হলেও মণিদীপা বোধহয় শোনে। মুখ না ঘুরিয়েই বলে, আমি কিন্তু সুন্দরী নই।
আপনি দারুণ সুন্দরী। কে বলে সুন্দরী নন?
হলেও আই ডোন্ট কেয়ার। সুন্দর ব্যাপারটাই স্কিন ডীপ!
তা হবে। আমি শুধু সত্যি কথাটা জানিয়ে দিলাম।
মণিদীপা আবার বহুক্ষণ জবাব দিল না। ময়দানের অন্ধকার চিরে ভেজা রাস্তায় চোখে ধাঁধা লাগিয়ে ছুটে আসছে গাড়ি। বৃষ্টির চিকন কাচে আলোর রেণু ছড়িয়ে পড়ছে। হেডলাইট ঘিরে অপ্রাকৃত আলোর বলয়। একরকম মন্দ লাগে না দীপনাথের। বিদেশি এক সেন্ট ছোট গাড়ির মধ্যে ভারী ঘন হয়ে এক মায়ার সৃষ্টি কবেছে। এত সুন্দর সব গন্ধ মাখে মণিদীপা!
এক-একবার গাড়ির অন্ধকার অভ্যন্তরে চলমান গাড়ির আলো এসে পড়ে, আর উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মণিদীপার মুখ। এখন মণিদীপার মূখে একটু আগেকার সেই ঝলমলে হাসির কোনও রেশ নেই।
মণিদীপা একবারও আর ফিরে তাকায় না তার দিকে। শুধু একবার বলে, আপনার মাথার চুলে বৃষ্টির জল লেগে আছে। গ্লাভস কমপার্টমেন্টে একটা পরিষ্কার ঝাড়ন আছে। মুছে নিন।
দরকার নেই। আপনা থেকেই শুকিয়ে যাবে।
আর কোনও কথা হল না অনেকক্ষণ।
দীপনাথ ভেবেছিল, মণিদীপা নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটেই নিয়ে যাচ্ছে তাকে। কিন্তু তা নয়। খিদিরপুরের ঘিঞ্জি ও নোংবা পাড়ায় একটা দু’নম্বরি চেহারার রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি দাড় করিয়ে মণিদীপা নামল। বলল, আসুন।
এখানে কোথায়?— বলতে বলতে দীপনাথ সন্দিহান ভাবভঙ্গি করে নামে।
গাড়ি লক করে মণিদীপা খুবই অভ্যস্ত পায়ে রেস্টুরেন্টে ঢোকে। পিছনে দীপনাথ।
ম্যাড়ম্যাড়ে হলুদ রঙের এবড়ো-খেবড়ো দেয়ালের লম্বা সরু একখানা ঘর। ঢোকার মুখেই মস্ত উনে শিক কাবাব সেঁকা হচ্ছে। কাচা পেঁয়াজ এবং মশলাদার রান্নার খুব চড়া গন্ধ। তন্দুরে রুটি হচ্ছে। ভিড় বেশি নেই। যারা এনামেলের প্লেট থেকে রগরগে মাংসের কাই মেখে মাংসের টুকরোয় জড়িয়ে হালুম হালুম খাচ্ছে তারা নিঃসন্দেহেই খালাসি শ্রেণির লোক। এদের জাত-টাত নেই। সব একাকার, একরকম। দরিদ্র, লোভী, ক্ষুধার্ত, হিংস্র এবং ক্রুদ্ধ। সেই সঙ্গে ওপরতলার লোক সম্পর্কে সন্দিহান, দ্বিধাগ্রস্ত এবং ভিতু। চোর-চোখে একটা আধবুড়ো পাঠানি চেহারার কালোলোক দু’জনকে খুব দেখছিল।
মণিদীপা অবশ্য খুবই সহজভাবে গিয়ে একটা টেবিলের দখল নেয়। কাঠের ময়লা আবরণহীন টেবিল। ভেজা স্যাতস্যাতে ভাব। মণিদীপা একটা রুমালে মুখ থেকে সামান্য বৃষ্টির ফেঁটা মুছে বলে, আমি মাঝে মাঝেই এখানে ডিনার সেরে যাই।
কেন?
এমনি। ভাল লাগে।
পাবলিক রিলেশন?
আই লাইক দিজ মেন। আই লাইক দিস এনভিরনমেন্ট।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
রেস্টুরেন্টটা খালাসি মার্কা হলেও খাবার খুব খারাপ নয়। রুটি আর চাপ মুখে দিয়ে সেটা টের পায় দীপনাথ। একটু সন্ত্রস্ত হয়ে বলে, মাংসটা কিসের?
