দিতে নেই বুঝি? বসের ওয়াইফ বলে?
মণিদীপা ক্রুদ্ধ চোখে তাকায়। তারপর সামান্য চড়া গলায় বলে, আপনি আমাকে কখনও সিরিয়াসলি নেন না! না?
আপনার ব্যাপারে আমি এবং আমরা সবাই খুব সিরিয়াস।
আমরাটা আবার কে?
আমি বা বোস সাহেব, অর্থাৎ জনগণ আর কী।
আজ আমার ইয়ারকি ভাল লাগছে না। আই হ্যাভ লস্ট এ ফ্রেন্ড, ইউ নো!
শুধু ফ্রেন্ড নয় মিসেস বোস। স্নিগ্ধদেব ছিলেন আপনার আইডিয়া, আপনার ড্রিম, আপনার নেতা। কিন্তু লসটা আপনার একার নয়। আমারও, অর্থাৎ জনগণেরও। আমি তো ভাবতাম, উনিশশো নব্বই সালে স্নিগ্ধদেবই হবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
একটু আগেই আপনি স্নিগ্ধদেব সম্পর্কে খুব সিরিয়াস ছিলেন। আবার এক্ষুনি লাইট হয়ে গেলেন! আপনার পার্সোনালিটি এত ফ্লাকচুয়েট করে কেন বলুন তো?
করে?
নিশ্চয়ই করে।
দীপনাথ মুখখানা আঁশটে করে বলে, আমার পপুলারিটির পারদ নেমে যাচ্ছে দেখছি।
মণিদীপা আর-একবার সিগারেটের প্যাকেটের ঢাকনা খুলেও থামল। ভ্রু কুঁচকে বলল, আপনি হয়তো জানেন না, যাদের পার্সোনালিটি থাকে না তারাও পপুলার হতে পারে। পার্সোনালিটি নেই বলেই তারা অন্যের যে-কোনও কথায় অনায়াসে সায় দিয়ে যায়, অন্যের হয়ে খামোখা খাটে, চাটুকারিতা করে, খোশামোদ করে। ওভাবেও পপুলারিটি গেন করা সম্ভব। আপনি যেমন ভাবে করেছেন।
বহুকাল পর আবার কান-মাথা গরম হল দীপনাথের। মণিদীপার মার কোন দিক থেকে আসবে তা সে জানত না। খুব গভীরে আহত হয় দীপনাথ। আহত হয়, তার কারণ মণিদীপা খুব মিথ্যে বলেনি। কখনও কখনও তো সত্যিকারেরই চাটুকার, খোশামুদে। নিজের মতামত, ইচ্ছে-অনিচ্ছে প্রকাশে ভীরু।
ক্লিষ্ট মুখ তুলে দীপনাথ বলে, জনগণের কি কোনও পার্সোনালিটি থাকে?
মণিদীপা জয়ের গন্ধ পেয়ে একটু ঝুঁকে তীব্র স্বরে বলে, আপনি যে জনগণেরই একজন সেটা সৎভাবে একবারও বিশ্বাস করেন কি? জনগণের কেউই তা করে না। তারা ভাবে, আমি ছাড়া আর সবাই জনগণ, সাধারণ অ্যাভারেজ। যেদিন আপনি নিজেকে সত্যিই সাধারণ মানুষদের একজন ভাবতে পারবেন সেদিন লোকে আপনাকে অসাধারণ বলে স্বীকার করবে।
দীপনাথ মনে মনে তারিফ করল। এটাও নিখুঁত মার। সে পুনর্বার আহত।
তবে প্রত্যাঘাতের জন্য ব্যস্ত হল না দীপনাথ। নরম চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, আপনি কি আমার বিবেক, কাউন্টার-ইগো? যাত্রাদলের বিবেকের মতো এসে মাঝে মাঝে জীবনের সত্যগুলিকে চিনিয়ে দিয়ে যান!
মণিদীপার প্লেটে কাপ রাখার শব্দটা একটু জোরালো শোনাল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, টাকাটা দিন!
দীপনাথ কথা বাড়াতে সাহস করল না। টাকাটা টেবিলের ওপর নিঃশব্দে রাখল।
ভ্রু কুঁচকে মণিদীপা বলে, কোনও ভাউচারে সই করতে হবে না?
দীপনাথ মাথা নাড়ল, না।
অফিসের টাকা দিতে ভাউচার লাগে না?
লাগে। কিন্তু অত কথায় কাজ কী?
মণিদীপা ঠোঁট ওলটাল, কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর চটপটে পায়ে বেরিয়ে গেল একটিও কথা না বলে।
সারা অফিসটাই ফাঁকা, নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
দীপনাথ কিছুক্ষণ সামনে চেয়ে রইল। এ কথা সত্য, তার ব্যক্তিত্বের তেমন জোর নেই, না আছে স্বাধীন মত প্রকাশের সাহস। প্রায় সকলেই তাকে পছন্দ করে বটে, কিন্তু কেউই তাকে খুব ইম্পর্ট্যান্ট মনে করে না। শুধু এই সেদিন, মেজোবউদি বলেছিল, দীপনাথকে তার প্রয়োজন। ঠিক ওরকমভাবে দীপনাথকে আর-একজনও গুরুত্ব দিয়েছিল। সে হল বোস সাহেব। বাংগালোরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি।
কিন্তু এসব কথা ভেবে কী হবে? সে যা, সে ঠিক তাই। কেউ তো তাকে শেখায়নি কী করে ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে হয়। কেউ তো তাকে হাতে ধরে শেখায়নি জীবনযাপনের পদ্ধতি। আজ তার মনে হয়, যেভাবে ছেলেবেলায় তাকে এক দুই বা অ আ ক খ শেখানো হয়েছিল, ঠিক তেমনি করে আজ এই জীবনযাপনের পাঠ কেউ শিখিয়ে দিলে বড় ভাল হত।
আস্তে আস্তে রাত বাড়ছে। বাইরে ঝুম হয়ে এল বৃষ্টি। দীপনাথ আবার কাগজপত্র টেনে বসে বকেয়া কাজ সেরে রাখতে লাগল। মাঝে মাঝে অন্যমনস্কতা এল, ক্লান্তি লাগল, হাই উঠল। তবু ঠায় রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত টেবিলে রইল সে।
তারপর বোরাকে ডেকে অফিস বন্ধ করতে বলে ধীরে ধীরে নেমে এল নীচে। বৃষ্টির জোর কমে এসেছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। ইদানীং অফিসপাড়াটা রাতের দিকে খুব নিরাপদ নয়। নির্জন রাস্তায় একা মানুষকে পেলে একদল ছেলেছোকরা প্রায়ই চুরি ছিনতাই করে। তাই ঘড়িটা খুলে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল দীপনাথ।
চারদিকে দেখে রাস্তায় নেমে কয়েক পা হাঁটতেই পি করে একটা হর্নের শব্দ। দীপনাথ বেখেয়ালে ফিরে তাকাল। তাকিয়েই একটু চমকে উঠল।
কালো ছোট গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে মণিদীপা বসে আছে না! একটা সিগারেটের আগুন একটু ধিইয়ে উঠেই মিইয়ে গেল।
দীপনাথ এগিয়ে জানালায় ঝুঁকে বলে, কাজটা ভাল করেননি। এ পাড়াটা এত রাতে খুব বিপজ্জনক। সঙ্গে অতগুলো টাকা রয়েছে।
আই ক্যান লুক আফটার মিসেল।
ওটা বৃথা অহংকারের কথা মিসেস বোস। এই দেশে কোনও সক্ষম পুরুষও নিজের সিকিউরিটির গ্যারান্টি দিতে পারে না, মেয়েরা তো কোন ছার!
আপনি গাড়িতে উঠুন। পৌঁছে দিচ্ছি।
ও বাবা! আমি থাকি শেয়ালদার কাছে। সেখানে রোজ খুব সাংঘাতিক রকমের জ্যাম হয়। অবলা মেয়েমানুষ আপনি, গিয়ে মুশকিলে পড়বেন।
নাইনটিনথ সেঞ্চুরির ভাষায় কথা বলবেন না তো! আপনার সঙ্গে আমার একটা জরুরি দরকার আছে। উঠুন।
