আমি ইডিয়ট নই। জানি, স্নিগ্ধকে কেউ ট্র্যাপে ফেলেনি। বরং ও নিজেই একটা সোনার খাঁচা খুঁজছিল। পেয়ে গেছে।
তা হলে আমাদের কী হবে, মিসেস বোস?
তার মানে?
দীপনাথ হতাশার গলায় বলল, আপনার কাছে শুনে শুনে আমিও যে মনে মনে স্নিগ্ধদেবকে আমার লিডার বানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এই দুর্ভাগা দেশে একদিন লেনিন, মাও বা হো চি মিনের মতোই স্নিগ্ধদেব উঠে দাঁড়াবেন।
আবার ইয়ারকি?
বলে মণিদীপা দীপনাথের দিকে চেয়ে নিজের ভুল বুঝতে পারল হয়তো। দীপনাথ ইয়ারকি করছে না। তার মুখে সত্যিকারের এক গভীর হতাশার কালিমা মাখানো। মণিদীপা ঝুঁকে বসে ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করে, আপনার কী হল বলুন তো হঠাৎ? আর ইউ সিরিয়াস!
দীপনাথ খানিকক্ষণ শুন্যচোখে মণিদীপার দিকে চেয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলে, অতটা না হলেও স্নিগ্ধদেব যে একজন মহৎ মানুষ ছিলেন তা আপনার ডিভোশন দেখেই মনে হয়েছিল। ওঁর যদি পতন হয়ে থাকে তবে সেটা আমাদের সকলের কাছেই দুঃখের ব্যাপার। বিশেষত আপনার কিছুই রইল না।
আমার কেন কিছুই থাকবে না! স্নিগ্ধ আমার কে?
হয়তো লিডার। হয়তো লিডারের চেয়েও বেশি কিছু। অন্তত ওই একটা জায়গায় আপনার ডিভোশনের কোনও খাঁকতি ছিল না।
ঠোঁট উলটে মণিদীপা বলল, আমরা ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী নই। এক স্নিগ্ধ মার্কিনদের দালাল হয়ে গেল তো কী! আরও হাজার স্নিগ্ধদেব আসবে।
মাথা নেড়ে দীপনাথ বলে, অত সোজা নয়। আপনিও সেটা জানেন।
বলেছি তো আমি ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী নই। ব্যক্তিগত মেধা বা ব্যক্তিত্বেরও কোনও মূল্য নেই যদি তা বিপ্লবের কাজে না লাগে। স্নিগ্ধদেব এখন আমার কাছে নন-এনটিটি।
উনি কবে রওনা হচ্ছেন?
আসছে সপ্তাহে।
ওঁর সঙ্গে একবার দেখা হতে পারে?
কী জানি! শুনেছি দিল্লি গেছে। সেখান থেকে ফিরে এসেই বউ-বাচ্চা নিয়ে পোঁটলা-পুঁটলি বেঁধে রওনা হবে।
স্নিগ্ধদেব কি ইদানীং আপনার কাছে টাকা চাইতেন?
একটু অবাক হয়ে মণিদীপা বলে, চাইত। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?
এমনি কৌতূহল।
মণিদীপা গম্ভীর হয়ে টেবিলের কাচে আঙুল দিয়ে নকশা আঁকার চেষ্টা করতে করতে বলে, চাইত অবশ্য ধার হিসেবে। ওর কিছু গরম জামাকাপড় দরকার বিদেশে যাওয়ার জন্য।
পার্টি-ফান্ডেও আপনার কিছু কনট্রিবিউশন আছে বোধ হয়?
হঠাৎ এ সব কথা কেন?
এমনি, মিসেস বোস।
আপনার কৌতূহল ঠিক মেয়েদের মতোই।
তা হবে। ইচ্ছে না হলে জবাব দেবেন না।
এ সব প্রসঙ্গ ভাল লাগে না। আই হেট টু টক অ্যাবাউট মানি। টাকা শুধু আমার কিছু পারপাস সারভ করবে, তা বলে আমার ইনটেলেক্টকে দখল করবে না!
তা ঠিক।
এবার বলুন বউদি কী বলেছেন?
বউদি বলেছে, আপনি একজন চমৎকার মানুষ।
মিথ্যে কথা।
বউদি বলেছে, আপনি তোক তত ভাল নন।
এটাও বাজে কথা।
দীপনাথ মুখ বিকৃত করে বলে, তা হলে একদিন বউদিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়!
কবে নিয়ে যাবেন বলুন? আমি এক্ষুনিই যেতে রাজি।–বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়েছিল মণিদীপা।
দীপনাথ অবাক হয়ে বলে, এক্ষুনি যাবেন? পাগল নাকি!
মণিদীপা আবার বসে পড়ে। হতাশার গলায় বলে, কলকাতায় এখন একা আমার অসহ্য লাগছে। ইট বার্নস। বিশেষত আফটার স্নিগ্ধ’জ বিট্রেয়াল।
আমেরিকায় গেলেই কি বিপ্লবী মরে যায়? বরং তার বেস অনেক ব্ৰড হয়।
কিন্তু স্নিগ্ধ সেভাবে যাচ্ছে না। হি হ্যাজ সোলড হিমসেলফ, আই নো। স্নিগ্ধর অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার ছিল অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট। ইচ্ছে করলে ও এমনিতেও সুখে জীবন কাটাতে পারত।
দীপনাথ একটা সত্যিকারের দুঃখের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারও কি মনে মনে আশা ছিল না, স্নিগ্ধদেবই একদিন সাধারণের অরণ্য থেকে মহীরূহের মতো মাথা তুলবে! সে বলল, আমরা আর-একজন স্নিগ্ধদেবকে বানিয়ে নেব মিসেস বোস। ভাববেন না।
মণিদীপা মাথা নত রেখেই বলল, সেটা আমি জানি।
তা হলে জ্বলছেন কেন?
মানুষ বিট্রে করলে রাগ হবে না?–বলে হঠাৎ একটু হেসে মণিদীপা বলে, আপনি এরকম অদ্ভুত লোক কেন বলুন তো!
কেন? কী করলাম?
আমার মুখে শুনে আপনি স্নিগ্ধকে আপনার লিডার বানিয়েছিলেন? সত্যি?
ভীষণ সত্যি।
যাঃ। প্লিজ আপনি আর কখনও ওরকম করবেন না।
কেন?
আপনাকে মানায় না। একটু মাথা উঁচু করে থাকতে শিখুন তো! যাকে-তাকে নেতা বানাবেন কেন?
স্নিগ্ধদেব কি যে-সে?
একদম যে-সে। আপনি আপনার মতো থাকবেন।
কেন? স্নিগ্ধকে নেতা বলে মানলে কি আমি ছোট হয়ে যাব মিসেস বোস?
হ্যাঁ, যাবেন।
আমি তো এমনিতেই ছোট। স্লেভ।
মোটেই না।
আপনিই তো বলতেন।
ঠাট্টা করতাম। আই নো ইউ টু বি এ ভেরি গুড ম্যান। বোস সাহেবকে আপনি ছাড়েননি কেবল মায়া করে।
এটা কি কমপ্লিমেন্ট?
তাই মনে করুন। বউদির কাছে কবে নিয়ে যাবেন?
বোস সাহেব আসুন, তারপর।
কেন?
ভারচুয়ালি আমিই এখন অফিস চালাচ্ছি। তা ছাড়া বোস সাহেবের অনুমতি না নিয়ে তার বউকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেলে লোকে কী বলবে?
আর-একদিনও তো নিয়ে গিয়েছিলেন। অনুমতি নিয়েছিলেন কি?
তখন ছিল অন্য রকম।–দীপনাথ হাসিমুখে বলে।
৪৪. বেয়ারাকে কিছু বলতে হয়নি
বেয়ারাকে কিছু বলতে হয়নি। বোস সাহেবের বউকে সে চেনে। নিঃশব্দে এসে এক পট কফি আর দুটো কাপ সমেত ট্রে টেবিলে রেখে কফি ঢেলে দিল। দুটো করে চিনির কিউব, গরম দুধ।
কফিটা আনমনে চামচে নাড়তে নাড়তে মণিদীপা বলে, বাইরে বৃষ্টি নামল।
হবে। বৃষ্টির সিজনই তো এটা।
তা জানি। আপনি আমার সব কথাতেই জবাব দেন কেন বলুন তো!
